সিরাজের মুখের কথা কিংবা অনুরাগীদের তাঁকে বারবার মাঠে দেখতে চাওয়ার আবেগ নয়, সময় থাকতেই বুমরাহর ঢঙে সিরাজকেও ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনতে হবে। তিনি চান বা না চান, বোর্ডের কাছে সেটা বিবেচনার বিষয় হতে পারে না।

মহম্মদ সিরাজ
শেষ আপডেট: 7 August 2025 11:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওভালের পঞ্চম দিন দলকে অপ্রত্যাশিত জয় এনে দিয়ে সবে টিম বাসে চড়ে হোটেলে ফিরছেন। সেই সময় ফোনে দাদা ইসমাইল। সাবাশি-বাহবা শুনে, ধন্যবাদ-টন্যবাদ জানিয়ে সিরাজ বলেছিলেন, ‘এবার ফোনটা রাখি? আমি খুব ক্লান্ত রে!’
‘ক্লান্তি’ শব্দটার সঙ্গে দেশের ক্রিকেট সমর্থকরা আজকাল বেশ ভালভাবে পরিচিত। সৌজন্যে জসপ্রীত বুমরাহ এবং তাঁর চর্চিত ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’! তিনি টানা খেলছেন, তাই চোট পাচ্ছেন। শরীরে দিচ্ছে না। ফলে ফিটেনেস তলানিতে। সুতরাং, দায়িত্ব ভেঙে দেওয়া হোক। সিরিজে সব টেস্ট খেলবেন না। সর্বোচ্চ কতগুলো খেলবেন সেটা চিকিৎসক ও ফিজিওদের পরামর্শে ঠিক করা হবে। সংক্ষেপে এটাই ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের সংজ্ঞা।
কিন্তু যদি তাই হয়, তাহলে বুমরাহরও আগে যিনি এমন দায়িত্ব কাটছাঁটের আওয়াজ তুলতে পারেন, তিনি মহম্মদ সিরাজ। ইংল্যান্ড সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী দু’দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওভার বল করেছেন! এটা শুধু একটা সফরের গল্প নয়, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। টিম ইন্ডিয়ার পেসার এখন তিরিশের কোঠায়। বুমরাহর চোটপ্রবণতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিলম্বিত বোধোদয় এড়াতে বোর্ডের উচিত সিরাজকে রক্ষা করা, তাঁর ফিটনেস নিয়ে স্পষ্ট পরকল্পনা ছকে ফেলা। আর সেই কাজ যেন এখন থেকেই শুরু হয়!
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে না খেললেও গত ১০ মাসে ভারতের দুই প্রধান টেস্ট সিরিজ—অস্ট্রেলিয়ায় বর্ডার-গাভাসকর ও ইংল্যান্ডে অ্যান্ডারসন-তেন্ডুলকর ট্রফি—দু’টিতেই একমাত্র পেসার হিসেবে সমস্ত ম্যাচ খেলেছেন সিরাজ। বারবার লম্বা স্পেল করেছেন, দলকে এনে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু।
পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া—এই চার ‘সেনা’ দেশে ভারতের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে বেশিবার হাত ঘুরিয়েছেন সিরাজ। টেস্ট অভিষেকের পর থেকে তাঁর মোট ওভার: ৭৬৯.৫। এটা শুধু ভারতীয় পেসারদের মধ্যে নয়, দুনিয়ার একাধিক তারকা পেসারদের চেয়েও বেশি। তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে জস হেজেলউড (৬১১ ওভার), কাগিসো রাবাদা (৬১২.২) এবং জসপ্রীত বুমরাহ (৭৩৭.৪)। শুধু মিচেল স্টার্ক (৯২১.২ ওভার), প্যাট কামিন্স (৯৬০.৩) আর টিম সাউদি (৮২০.১) সিরাজের চেয়ে বেশি বল করেছেন!
অস্ট্রেলিয়ায় ২০২০ সালের বক্সিং ডে টেস্ট দিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর থেকে মাত্র ৪১ ম্যাচে করেছেন ১০৬৯.৫ ওভার। এই সময়ে স্টার্ক (১১৯৬.৩), কামিন্স (১২০৬.১) আর সাউদি (১১০৯.১) ছাড়া কেউ সিরাজের উপরে কেউ ছিলেন না। জিমি অ্যান্ডারসন, ব্রড বা বুমরাহ—সবাই অনেকটা পিছিয়ে।
হিসেব বলছে, ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর থেকে সিরাজ খেলেছেন ১০১ ম্যাচ। ওভার ১৪৫৭টি। এই সময়পর্বে ভারতীয় পেসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওভার করেছেন কেবল বুমরাহ (২২২৬.৫) ও মহম্মদ সামি (১৬৬৮.৫)।
সব মিলিয়ে, বিশ্বক্রিকেটের পেসারদের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত বোলারের তালিকায় সিরাজ এখন ষোলো নম্বরে। স্টার্ক, কামিন্স, রাবাদা, হ্যাজলউড, বুমরাহদের মতো অভিজ্ঞদের পেছনে ফেলে সিরাজ এই তালিকায় উপরে উঠে এসেছেন। যদিও তার পেছনে রয়েছে অক্লান্ত, কখনও কখনও মাত্রাছাড়া শ্রম। আগামীতে এর মূল্য চোকাতে হবে না তো? প্রশ্নটা আরও ঠোক্কর মারছে বুমরাহর দশা দেখে!
এই পরিস্থিতিতে সমস্যা জটিল করেছে আইপিএল। এ বছর গুজরাত টাইটানসের হয়ে ১৫টি ম্যাচে করেছেন ৫৭ ওভার। তাঁর চেয়ে বেশি বোলিংয়ের তালিকায় উপরে কেবল প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ (৫৯), অর্শদীপ সিংহ (৫৮.২) ও ট্রেন্ট বোল্ট (৫৭.৪)। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ময়দানের পাশপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটও সিরাজকে বিশ্রাম নিতে দেয়নি। অনেক বিদেশি তারকা, বিশেষ করে মিচেল স্টার্কের মতো পেসার, ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের জন্য আইপিএল এড়িয়ে চলেন। কিন্তু সিরাজকে সেই ধকলও নিতে হয়েছে, হচ্ছে!
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় যতই প্রশংসা করুন, যতই ‘ওর ওয়ার্কলোড আজকের তরুণ পেসারদের আদর্শ হওয়া উচিত’ বলুন না কেন, ভুলে গেলে চলবে না প্রাক্তন বোলার আরপি সিংয়ের সতর্কবার্তা। তাঁর আর্জি, সিরাজকেও বুমরাহর মতো রয়েসয়ে কাজে লাগানো হোক। তাঁরা দুজন মিলে ২০২৪ সাল থেকে দলের হয়ে ৬৯ শতাংশ ওভার করেছেন। এই প্রবল নির্ভরতা তাঁদের উপর চাপ তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার কারণ হতে পারে। ফলে সিরাজের মুখের কথা কিংবা অনুরাগীদের তাঁকে বারবার মাঠে দেখতে চাওয়ার আবেগ নয়, সময় থাকতেই বুমরাহর ঢঙে সিরাজকেও ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনতে হবে। তিনি চান বা না চান, বোর্ডের কাছে সেটা বিবেচনার বিষয় হতে পারে না।