সারা দুনিয়া এখন ভারতের পেসারের নাম জপছে। কিন্তু মহম্মদ সিরাজ যাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ, তিনি রোনাল্ডো। সিআরসেভেন। সিরাজের শক্তি। সিরাজের প্রেরণা।

মহম্মদ সিরাজ
শেষ আপডেট: 5 August 2025 13:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কবরস্থানে গিয়ে বাবার সমাধি দেখা, হাঁটু মুড়ে ‘দোয়া’ প্রার্থনা করা মহম্মদ সিরাজের রোজকার কৃত্য। যখন বাড়িতে থাকেন, তখন প্রতিদিন। বিদেশ সফরে যাওয়ার আগে এবং সফর শেষে বাড়িতে ঢোকার আগে একইভাবে প্রয়াত বাবাকে প্রণতি জানান এই মুহূর্তে টিম ইন্ডিয়ার সবচাইতে চর্চিত পেসার।
২০২১ সাল থেকে এমনটা হয়ে আসছে। এবার, ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগেও যার অন্যথা হয়নি। মহম্মদ ঘাউস, সিরাজের বাবা ছিলেন পেশায় অটোরিকশ চালক। ছেলে ক্রিকেটার হোক, আজীবন চেয়েছেন তিনি। এর জন্য প্রাণপণ খেটেছেন, রোজগার করেছেন, ট্রেনিংয়ের খরচ জুগিয়েছেন।
আজ থেকে চার বছর আগে, টিম ইন্ডিয়া যখন অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে নামবে, তখনই মারা যান ঘাউস। কোচ রবি শাস্ত্রী ও বিরাট কোহলি তরুণ বোলারকে এই মর্মান্তিক খবর দেন। কিন্তু ভেঙে পড়ার বদলে ঘুরে দাঁড়ান সিরাজ। সিরিজে সবচেয়ে বেশি উইকেট তুলে বাবার ইচ্ছেপূরণ করেন!
আজ বাবা নেই। কিন্তু মা আছেন। ইংল্যান্ড আসার আগে তাঁকে জড়িয়ে ধরে সিরাজ বলেছিলেন, ‘আম্মি, আমার জন্য প্রার্থনা কোরো। আমি যেন ভাল খেলে দলকে জেতাতে পারি!’
শাবানা বেগম চোখের জল আটকাতে পারেননি। ওভালের ময়দানে ইংরেজদের কুপোকাত করে ওভালে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নেওয়ার অন্যতম কাণ্ডারী তাঁর ছেলে। শাবানার কথায়, ‘আব্বুকে খুব ভালবাসে সিরাজ। ওঁর জন্য সবকিছু করতে তৈরি ছিল। আমার আশীর্বাদ সবসময় সিরাজের সঙ্গে। আল্লাহ যেন আমার ছেলেকে সফল করেন!’
ছেলের একটি ম্যাচও মিস করেন না শাবানা। সিরাজ যেমন আন্ডারসন-তেন্ডুলকর ট্রফির সমস্ত ম্যাচ খেলেছেন, তাঁর মা-ও প্রতিটি সেশনে বাড়ি বসেই টিভির পর্দায় চোখ রেখেছেন। কখনও হাততালি দিয়েছেন, চিৎকার করে উঠেছেন, কখনও বিষাদে মলিন হয়েছে মুখ। এজবাস্টন থেকে ওভাল—হাজির না থেকেও মনে মনে ইংল্যান্ডেই ৫৩ দিন কাটিয়েছেন শাবানা বেগম! বাড়িতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েছেন। একটিবারের জন্যও ভুলে যাননি!
ভাই মহম্মদ ইসমাইল এসবের সাক্ষী। দাদার সাফল্যে গর্বিত, মায়ের সুখে সুখী। বলেছেন, ‘আম্মি সব সময় দাদার জন্য প্রার্থনা করেন। তাঁর আরাধনার অনেক শক্তি। হয়তো মায়ের দোয়াভিক্ষাতেই আমরা দুই ভাই আজ ভাল জায়গায় রয়েছি, সুস্থ জীবনযাপন করছি। দাদা রোজ মাকে ভিডিও কল করে আশীর্বাদ চায়। মা প্রতিবার একই কথা বলেন: সবসময় উন্নতি কর! নাম উজ্জ্বল হোক!’
বাবার মৃত্যু সিরাজকে ভেঙেচুরে দেয়। মহম্মদ ঘাউসের অনেক ইচ্ছে অধরা রয়ে যায়। কিন্তু মা শাবানা সেসব ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, ‘যিনি চলে গেছেন, তিনি আর ফিরে আসবেন না। এবার খেলায় মন দে!’
ক্রিকেটে শুধু মন নয়, দেহ-আত্মা সবকিছু ঢেলে দিয়েছেন সিরাজ। এর জন্য একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট: ২০২০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোনও খেলোয়াড় দেশের হয়ে সিরাজের চাইতে বেশি ম্যাচ খেলেননি। না বিরাট, না রোহিত, না রাহুল! জসপ্রীত বুমরাহর ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে চতুর্দিকে জোর চর্চা, তখন তার পালটা প্রস্তাব পেশ করেছেন সর্বার্থে ‘ওয়ার্ক হর্স’ মহম্মদ সিরাজ! সদ্যসমাপ্ত ইংল্যান্ড সিরিজেও এর অন্যথা হয়নি। সাকুল্যে ১৮৫.৩ ওভার হাত ঘুরিয়েছেন। মোট ১,১১৩ বল। নিয়েছেন সর্বাধিক উইকেট। ওভালে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স এই ধারাবাহিকতারই অঙ্গ!
আগ্রাসন আর খিদে—বাকিদের থেকে সিরাজকে আলাদা করেছে। ইসমাইলের কথায়, ‘এই উন্মাদনা ও পেয়েছে বিরাটের থেকে। ফিটনেসে বাড়তি নজর দেওয়া… সেটাও কোহলিরই দান! ২০১৮ সালের আইপিএলে যখন ও ভাল খেলতে পারেনি, সবাই বাতিল করে দেয়, তখন বিরাট ওর পাশে দাঁড়ায়। আগে খুব বিরিয়ানি খেত, এখন অল্পস্বল্প খায়। এটাও বিরাট ভাইয়ের পেপ টকের ফল!’
শুধু বাবার মৃত্যু, মায়ের আশীর্বাদ কিংবা বিরাট কোহলির ভরসা জোগানো নয়, সিরাজকে বদলে দিয়েছে ব্যর্থতা, পালটে দিয়েছে বঞ্চনা। চব্বিশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দলে সুযোগ পাননি। ভেঙে পড়েন। গুটিয়ে যান। কিন্তু সে সব কিছুদিনের জন্য। তারপর ফের গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন। শুরু করেন অনুশীলন। আগের চাইতেও জোরদার ঢঙে। আইপিএল শুরুর আগে একটা দীর্ঘ বিরতি এভাবে কাজে লাগান। নিজেকে পরবর্তী জার্নির জন্য সুযোগ করে নেন। এ সবেরই নীরব সাক্ষী ভাই ইসমাইল।
সারা দুনিয়া এখন ভারতের পেসারের নাম জপছে। কিন্তু মহম্মদ সিরাজ যাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ, তিনি রোনাল্ডো। সিআরসেভেন। সিরাজের শক্তি। সিরাজের প্রেরণা। ‘ভক্ত’ বললেও বোধ হয় খুব কম বলা হয়। ঘরে আস্ত একটা স্টুডিও গোছের বানিয়েছেন। যেখানে জায়ান্ট স্ক্রিনে রোনাল্ডোর সমস্ত ম্যাচ দেখেন, একটিও মিস করেন না!
ওভালের শেষ দিন, যখন তুলতে হত চার উইকেট, সেটাও ৩৫ রানের আগে, তখন মোবাইলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর একটি ছবি ওয়ালপেপার হিসেবে ডাউনলোড করে রাখেন সিরাজ। উপরে লেখা: ‘বিলিভ’!
সিরাজ রোনাল্ডোয় আস্থা রেখেছিলেন, গোটা দেশ সিরাজে। দিনের শেষে দুজনেই নিজেদের প্রতিদান মিটিয়েছেন!