ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর, তবু মুখে চওড়া হাসি। বললেন, ‘আজ সকালে ঘুম ভেঙে নিজেকেই বলেছিলাম, ম্যাচটা পাল্টে দেব।’ সেই বিশ্বাসই এদিন ওভালের ধূসর সকাল রাঙিয়ে দিল।

মহম্মদ সিরাজ
শেষ আপডেট: 5 August 2025 10:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘ক্রিকেট আমার প্রথম প্রেম। এর জন্য সবকিছু দিতে রাজি। যখন পারফর্ম করতে পারি না বা দল হারে, খুব কষ্ট পাই। ক্রিকেটকে ভালবাসি। ব্যর্থতা ব্রেক আপের মতো মনে হয়!’
থতমত ইংরেজিতে লাজুক হেসে কথাগুলো যিনি বলছেন, তিনি ৫৩ দিনের ম্যারাথন সফরে পাঁচ টেস্ট মিলিয়ে ১৮৭ ওভার বল করেছেন। নিয়েছেন সর্বোচ্চ উইকেট।
আবার তিনিই ছেড়েছেন দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষের সহজ ক্যাচ। ১৯ রানের মাথায়। জীবন ফিরে পেয়ে যে-ব্যাটার সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। আর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে দল দাঁড়িয়েছে খাদের কিনারায়।
লর্ডসে জান কবুল লড়াইয়ের পরেও নির্বিষ বল গায়ে লেগে স্ট্যাম্পের বেল ছিটকে দেয়। এক সর্বস্ব হারানো মানুষের মতো সামনে চেয়েছিলেন। বাক্যহর। অনুভূতি? সেটাও বুঝি উধাও। সবটুকু চলে গেলে কী-ই বা পড়ে থাকে?
টি-২০ বিশ্বকাপে ভাল খেলেও চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দলে সুযোগ জোটেনি। অধিনায়ক রোহিত শর্মা জানিয়েছিলেন, তিনি ভাল বোলার। কিন্তু পুরনো বলে তেমন দড় নন। তাই দরজা বন্ধ। এ ছাড়া বিশেষ কোনও কারণ নেই৷
ইংল্যান্ড সফরের শুরুতে ছিলেন জসপ্রীত বুমরাহর প্রচ্ছায়ায়। সবাই ধরেই নিয়েছিল, যে তিনটি টেস্ট খেলতে নামবেন বুমরাহ, সেখানেই ভারত জিততে পারে। বাকি ম্যাচে অসহায় আত্মসমর্পণ করবেন তরুণ বাহিনী৷ এটাই ভবিতব্য।
কেউ আন্দাজটুকু পাননি, মহম্মদ সিরাজ নামেও এক বোলার টিমে রয়েছেন, যিনি দেশের জন্য, দলের জন্য শেষ শক্তি দিয়ে লড়ে যেতে প্রস্তুত। বুমরাহ ‘স্পেশাল’, দলের ‘ট্রাম্প কার্ড’। কিন্তু লড়াই শুধুই বুদ্ধি আর স্কিল দিয়ে জেতা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন কসরত, মেহনত আর আত্মবিশ্বাস। সিরাজ সেই ফাঁকটুকু পূরণ করেছেন!
গতকাল ওভালের ধূসর সকাল। ঠাসা গ্যালারি। আর ৫৩টি বলের রুদ্ধশ্বাস নাটক। অন্তিম অঙ্কে ইতিহাস লিখলেন মহম্মদ সিরাজ-ই। ভারতের হয়ে সিরিজে সমতা আনা জয়। মাত্র ছয় রানে ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করা। শেষ বলের আগে পর্যন্ত দমবন্ধকর উত্তেজনা। যেখানে সবাইকে ছাপিয়ে নায়ক সেই সিরাজ, যাঁকে এতদিন ‘ওয়ার্কহর্স’ বলেই চেনানো হত।
পঞ্চম টেস্টের শেষ দিনে ইংল্যান্ডের দরকার ছিল মাত্র ৩৫ রান, হাতে ‘সাড়ে’ তিন উইকেট। ক্রিস ওকস কার্যত ব্যাট ধরতেই পারছিলেন না, বাঁ-হাত স্লিংয়ে বাঁধা। মাঠে নামার আগেই মনে হচ্ছিল, বাকি কাজটা হয়তো জেমি স্মিথ আর গাস অ্যাটকিনসন সারবেন। সকালেই প্রাসিদ্ধ কৃষ্ণর প্রথম দুই বলে বাউন্ডারি হাঁকালেন জেমি ওভারটন। টার্গেট এক ঝটকায় কমে এল। মনে হচ্ছিল, নাটক বুঝি মিনিটে শেষ!
কিন্তু সিরাজের মগজে তখন অন্য খেলা। আগের দিন হ্যারি ব্রুকের সহজ ক্যাচ বাউন্ডারি লাইনে পা দিয়ে মিস করেছেন। নিশ্চিত আউটের বদলে মূল্যবান ছ'রান ইংল্যান্ডের স্কোরবোর্ডে জুড়েছে। যেভাবে অবিশ্বাসী চোখে চেয়েছিলেন সিরাজ, লর্ডসের স্মৃতি উসকে উঠছিল! সেখানেও একই কায়দায় পরাজিত সৈনিকের মতো নতমস্তকে বাইশ গজে বসে পড়েন! সিরিজে বারবার হানা দিয়ে গেছে হতাশা। কিন্তু এদিন সেই অবসাদ বদলে গেল জেদে। শুরু করলেন আউটসুইং দিয়ে। ৭৮ ওভারের পুরোনো বল। অথচ তাতে মুভমেন্ট আর নিখুঁত সিমের খেলা। ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের মনে ভয় ধরে যায়: সিরাজের প্রতিটি ডেলিভারি মানেই বুঝি ভেতরে ঢোকা বল। নতুন বল আসার আগেই বিপদঘণ্টি বেজে ওঠে!
প্রথম সাফল্য স্মিথকে আউট করা। অফস্টাম্পের বাইরে হালকা এগিয়ে এসে খেলার চেষ্টা, আর তাতেই ধ্রুব জুরেলের হাতে ধরা পড়লেন ইংরেজ ব্যাটার। পরের ওভারে তীক্ষ্ম ইনসুইংয়ে ওভারটনের প্যাডে বল। জোরালো আবেদন! আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা শুরুতে চেপে রাখলেন আঙুল, তারপর ধীরে ধীরে তুললেন। রিভিউতে দেখা গেল আম্পায়ার্স কল। বল হালকা লেগস্টাম্প ছুঁয়ে যেত। অর্থাৎ, ধর্মসেনা আউট না দিলে সেটাই বজায় থাকত। ভাগ্যের চাকা অবশেষে সিরাজের দিকে ঘুরল।
এই সময় প্রসিদ্ধও হাত লাগালেন। জশ টাংকে এলবিডব্লিউর আর্জি নাকচ হলেও পরে দুরন্ত ইয়র্কারে ভেঙে দিলেন তার স্টাম্প। ৩৫৭-এ ৯ উইকেট। তখনই মাঠে নামলেন বাঁ-হাতে স্লিংজড়ানো কার্যত ‘একহাতি’ ক্রিস ওকস। ইতিহাস মনে করাল কলিন কাউড্রেকে। যিনি ১৯৬৩ সালে ভাঙা হাত নিয়েই নেমেছিলেন লর্ডসে।
শেষ লড়াইটা চালালেন অ্যাটকিনসন। বল একবার সীমানা পেরোল, একবার ওকসের সঙ্গে দৌড়ে নিলেন বাই। লক্ষ্য নেমে দাঁড়াল এক অঙ্কে। কিন্তু সিরাজ তখনও হাল ছাড়তে নারাজ। সাতসকালে রোনাল্ডোর ছবিখচিত ‘বিলিফ’ ডাউনলোড করে মোবাইলের ওয়ালপেপার করেছেন। নিজেকে বারবার বুঝিয়েছেন, তিনি পারবেন হিসেব উলটে দিতে, দলকে জেতাতে। নিজের শাপমুক্তি? সেটাও সম্ভব। আগের ওভারে হাফভলি ছেড়ে ছক্কা খেয়েছিলেন। টার্গেট যখন মাত্র সাত রান, আরেকটা ওভার বাউন্ডারিতেই খেল খতম হতে পারে, এটা জেনেও ঝুঁকি নিলেন সিরাজ৷ এবার আর হাফভলি নয়। হাত ফসকে ফুলটসও পড়ল না। নিখুঁত নিশানাভেদী ইয়র্কার। অ্যাটকিনসনের অফস্টাম্প ছিটকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ‘সিউ’ উদযাপন। সতীর্থরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন।
সিরাজ শেষ করলেন ৫/১০৪। প্রাসিদ্ধ নিলেন ৪ উইকেট। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস ৩৬৭-তেই খতম। ভারতের জয় মাত্র ছয় রানে—টেস্ট ইতিহাসে দেশের সবচেয়ে ছোট ব্যবধানের সাফল্য।
খেলার পালা চুকেবুকে যেতেই শুরু হল উদযাপন। পেলেন ল্যাপ অফ অনার। ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর, তবু মুখে চওড়া হাসি। বললেন, ‘আজ সকালে ঘুম ভেঙে নিজেকেই বলেছিলাম, ম্যাচটা পাল্টে দেব।’ সেই বিশ্বাসই এদিন ওভালের ধূসর সকাল রাঙিয়ে দিল।