যেভাবে হুশ করে উঠে এসছিলেন, সেভাবেই আচমকা ফুরিয়ে যান মুম্বইয়ের বিস্ময়কর ক্রিকেটার। কিন্তু কেন? এই নিয়ে অনেকেই তাঁর লাগামছাড়া, অসংযমী জীবনের তত্ত্ব দাঁড় করান।

বিনোদ কাম্বলি
শেষ আপডেট: 11 June 2025 18:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতিভা বিষম বস্তু। একে কাজে লাগাতে পারলে, পরিশ্রমে নিজেকে নিংড়ে দিলে কী হয়, তার দৃষ্টান্ত শচীন তেন্ডুলকর। আর প্রতিভাকে অপচয়ে করলে অন্তিম ফল কী দাঁড়ায়, সেই নমুনার নাম বিনোদ কাম্বলি।
সম্প্রতি মুম্বইয়ে শৈশবের শিক্ষাগুরু রমাকান্ত আচরেকরের মেমোরিয়াল উদ্বোধনী মঞ্চে হাজির হন কাম্বলি। হাজির হলেও শরীরের হালত যে স্বাভাবিক ছিল না, সেটা দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা দেখেই ধরে ফেলেন অনেকে। তারপর যখন টলমল পায়ে এগিয়ে যান বাল্যবন্ধু শচীনের দিকে, তখন সন্দেহ ঘনীভূত হয়।
পরে জানা যায়, মূত্রাশয়ের সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ ভারতীয় দলের এই প্রাক্তন ক্রিকেটার। খবর জানার পর সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসেন অনেক শুভানুধ্যায়ী। আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়ায় তিরাশির বিশ্বকাপজয়ী দল।
সে যাত্রা কোনওভাবে সেরে উঠলেও ফের একবার অসুস্থ হন কাম্বলি। এবার অবস্থা গুরুতর। ভর্তি হন থানের আক্রুতি হাসপাতালে। ছাড়া পান দিনকয়েক বাদে। কিন্তু তারপর কোথায়, কীভাবে আছেন—কেউ জানে না!
অথচ তরুণ ব্যাটসম্যান যে অমিত প্রতিভাধর, তাঁর সতীর্থ শচীনের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি—এই নিয়ে মুম্বইয়ের আনাচে-কানাচে কোনও দ্বিমত ছিল না। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে কায়দায় ব্যাটিং করে চলেছেন কাম্বলি, তাতে তাঁর জাতীয় দলের জার্সি পরাটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
আর সেটাই সত্যি হয়। তিরানব্বইয়ে দেশের মাঠে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অভিষেক। দ্বিতীয় টেস্টেই হাফ সেঞ্চুরি। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যায় পরের দুটো টেস্ট। পরপর দু’খানা দ্বিশতরান (২২৪, ২২৭) করেছিলেন বিনোদ কাম্বলি। প্রথমবার ঘরের মাঠ ওয়াংখেড়েতে। পরের বার দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে (তখন যার নাম ছিল ফিরোজ শাহ কোটলা)।
তখন সবে দৌড় শুরু হয়েছে। থামার কোনও লক্ষণই নেই। শ্রীলঙ্কা সিরিজে আগ্রাসী মেজাজে দেখা দেন। হাঁকান পরপর তিনটি সেঞ্চুরি। এক সময় ডন ব্র্যাডম্যানের ঐতিহাসিক ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়ের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলাও শুরু করেছিলেন কাম্বলি।
কিন্তু এরপর যেভাবে হুশ করে উঠে এসছিলেন, সেভাবেই আচমকা ফুরিয়ে যান মুম্বইয়ের বিস্ময়কর ক্রিকেটার। কিন্তু কেন? এই নিয়ে অনেকেই তাঁর লাগামছাড়া, অসংযমী জীবনের তত্ত্ব দাঁড় করান। আর এবার এই ধারণায় সিলমোহর দিলেন যুবরাজ সিংয়ের বাবা যোগরাজ সিং। কাম্বলির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তাঁকে কেরিয়ার ও জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসার পরামর্শও দেন তিনি। কিন্তু তারপর কী হল?
স্মৃতির পাতা উল্টে যোগরাজ বলেন, ‘আমি বিনোদকে একবার বলেছিলাম: পার্টিতে যেও না, ধূমপান কোরো না, উদ্দাম নারীসঙ্গ ছাড়ো। বন্ধ করো এসব। এভাবে এগলে তুমি শেষ হয়ে যাবে। একদিন কাঁদবে। ওকে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার কথা শুনে কাম্বলি বলেছিল: ‘এটাই গ্ল্যামার। আর আমি রাজা।‘ এই কারণেই আমি সবাইকে বলি: কেউ খেলার চেয়ে বড় নয়।‘
যোগরাজ আরও অনেকের মতো চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিনোদ কাম্বলির বল্গাহীন জীবনে রাশ টানতে পারেননি। হয়তো এটাই ভবতব্য। তাঁদের, যাঁদের প্রতিভা আছে, সংযম নেই। ক্ষমতা আছে, নিয়ন্ত্রণ নেই। গতি আছে, স্থৈর্য নেই। ধূমকেতুর মতো উত্থান আর আলোর রোশনাই দেখিয়ে এক লহমায় ফুরিয়ে যাওয়া তাঁদের ললাটলিখন। এই লিখন খণ্ডাবে কে?