আপত্তি জানিয়েছেন অনেকে? তুলেছেন একগুচ্ছ প্রশ্ন। এভাবে ইতিহাসকে মুছে কালান্তরের পথে এগোনো যায়? নয়া প্রজন্মের কাছে এ কেমন বার্তা!

পতৌদি ট্রফি
শেষ আপডেট: 11 June 2025 14:40
নামে আসে যায়। নামবদলে আরও বেশি করে আসে যায়!
দ্বিতীয় বাক্যটি বলা ‘পতৌদি ট্রফি’র নাম পরিবর্তন নিয়ে। ২০০৭ সালে ভারতীয় দলের টেস্ট ক্রিকেটে ৭৫তম বর্ষপূর্তির আবহে নতুন এক প্রতিযোগিতার শুরুয়াত হয়। যেহেতু ১৯৩২ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লর্ডেসের ময়দানে প্রথমবারের জন্য লাল বলের ক্রিকেট খেলতে নেমেছিল টিম ইন্ডিয়া, তাই সেই স্মৃতিকে সম্মান জানাতে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় যে পাতৌদি পরিবার, তাদের নামেই ট্রফির নাম রাখা হয় ‘পতৌদি ট্রফি’।
জল্পনা শুরু হয়েছিল বিগত কয়েক মাস আগে। সম্প্রতি তাতে সরকারি সিলমোহর পড়ল। ঐতিহ্যশালী এই টুর্নামেন্টের নাম বদলে রাখা হল ‘তেন্ডুলকর-আন্ডারসন ট্রফি’। এই নামান্তর কি আয়োজক দেশ ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ডের খামখেয়ালিপনা? তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ? নাকি আলগোছে ইতিহাসকে মুছে দেওয়ার সুগভীর চক্রান্ত?
সংশয়ের নিরসনের আগে আরেকটু পিছনে তাকানো যাক। আগেই বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে এই প্রতিযোগিতার জার্নি শুরু। ভারত ইংল্যান্ডে গেলে পাখির চোখ ‘পতৌদি ট্রফি’-তে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড ভারত সফরে এলে প্রতিযোগিতার নাম দাঁড়াবে ‘অ্যান্থনি এস ডি’মেলো ট্রফি’। বিসিসিআইয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও একদা কর্ণধার অ্যান্থনি। ক্রিকেটের ময়দানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করতেই এই নামকরণ সেই সময় প্রশংসিত হয়। এহেন সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘বিচক্ষণ’, ‘সময়োপযোগী’ ও ‘জরুরি’ বলে কুর্নিশ জানিয়েছিলেন।
কিন্তু কেন এই বন্দনা? অহেতুক স্তুতি? বোধ হয় না। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে পতৌদি পরিবারের সুমহান ঐতিহ্য, প্রশ্নাতীত অবদান। একদিকে ইফতিকার আলি খান পতৌদি। যিনি ভারত, ইংল্যান্ড দু’দেশের হয়ে খেলেছেন। ১৪ বছরের কেরিয়ার। ঘটনাবহুলও বটে। অনেকেই জানেন ‘কুখ্যাত’ বর্ডারলাইন সিরিজের কথা। ১৯৩২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওই টেস্ট সিরিজে লেগ সাইডে ফিল্ডিংয়ের নির্দেশ এলে অধিনায়ক ডগলাস জার্ডাইনের মুখের উপর ‘না’ বলে দেন পতৌদি। এর জেরে ম্যানেজমেন্টের রোষে পড়েন। তারপর অবধারিতভাবে দল থেকে বাদ।
ফিরে আসেন স্বদেশে। ভারতের জার্সিতে খেলতে নামেন। তিনি অবসর নিলে ব্যাটন হাতে তুলে নেন ইফতিকার-পুত্র মনসুর আলি খান পতৌদি। লেখাপড়া ইংল্যান্ডে। সেই পাট চুকিয়ে পুরোদস্তুর ক্রিকেটের বলয়ে ঢুকে পড়া। মাত্র ২১ বছর বয়সে জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব লাভ। নান্দনিক ব্যাটিং এবং দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ের সৌজন্যে সুনাম কুড়োন এই সুদর্শন ক্রিকেটার।
কিন্তু এর ঊর্ধ্বেও উঠে আরও একটি জায়গায় ছাপ ফেলেছিলেন তরুণ অধিনায়ক। সেই সময় জাতীয় দল এখনকার মতোই প্রচুর প্রাদেশিক ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়ে উঠত। ভিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়, আলাদা ভাষিক ও রুচিগত পরিচিতি নিয়ে বিদেশ সফরে পা বাড়াতেন তাঁরা। কিন্তু কেউই সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার গণ্ডী ছাড়িয়ে উঠতে পারতেন না।
তাঁদের প্রথম এক সূত্রে বেঁধেছিলেন পতৌদি। ভৌগলিকতার স্বাতন্ত্র্য ও সৌন্দর্যকে স্বীকৃতি দিয়েও ঐক্যবদ্ধ টিম কাকে বলে—তার নমুনা পেশ করেন সুদক্ষ ‘অধিনায়ক’। শুধু সাদা জার্সি, উইলো কাঠের ব্যাট কিংবা ডিউক বলের খেলা নয়—ময়দানের সীমা ডিঙিয়ে, নিজে অভিজাত নবাব পরিবারের হলেও, সেই তকমার বেড়াজাল ডিঙিয়ে সাংস্কৃতিক বৃত্তে প্রভাব রেখেছিলেন যিনি, তাঁকে স্বীকৃতি দিতেই দ্বিদেশীয় সিরিজের নামকরণে কেউ কোনও আপত্তি তো করেনইনি, উলটে সাধুবাদ জানান।
তাহলে ট্রফির নাম আচমকা বদলে ফেলা হল কেন? ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছে, যেহেতু নয়া প্রজন্মের নায়কের মুখ পাল্টে গিয়েছে, তাই আপাতভাবে, কালের বিচারে তুলনামূলক নবীন দুই আইকনকে বেছেই প্রতিযোগিতার স্মারকের নামকরণ। একদিকে ভারতের শচীন তেন্ডুলকর। অন্যদিকে ইংরেজ শিবিরের জেমস অ্যান্ডারসন। সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের দুই সূত্র। মিলে যাবে আসন্ন সিরিজ থেকেই। যা শুরু হতে চলেছে ২০ জুন।
কিন্তু এখানেই আপত্তি জানিয়েছেন অনেকে? তুলেছেন একগুচ্ছ প্রশ্ন। এভাবে ইতিহাসকে মুছে কালান্তরের পথে এগোনো যায়? নয়া প্রজন্মের কাছে এ কেমন বার্তা! তাহলে আজ থেকে দু’দশক বাদে, যখন শচীন কিংবা অ্যান্ডারসন দুজনের স্মৃতি ঝাপসা হতে শুরু করবে, নায়কত্বের জেল্লা অল্প অল্প করে চটকে যাবে, মলিন হবে ছবি, ধূসর অনুভূতি—তখনও একইভাবে ফের একবার ট্রফির নাম বদলে দেওয়া হবে? ফের শুরু হবে সমসাময়িক তারকার খোঁজ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ড যখন অতীতের খেলোয়াড়দের স্বীকৃতি ধুলো ঝেড়ে উঠতি প্রজন্মের সামনে মেলে ধরার চেষ্টা করছে, তাতে যোগ দিচ্ছেন প্রাক্তন ক্রিকেটারদের বড় অংশ—সেখানে ইংল্যান্ড-ভারত দু’দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের এই পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত এককথায় বিপজ্জনক। বর্তমানে বিনিয়োগ মানেই অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়। মনে করিয়ে দিয়েছেন সুনীল গাভাসকারের মতো কিংবদন্তি। পাশাপাশি ছুড়ে দিয়েছেন কড়া বার্তা: নতুন নামকরণ হবে যে সমস্ত ক্রিকেটারদের নিয়ে, তাঁরা যেন বিনম্রভাবে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
শচীন তেন্ডুলকর এই নিয়ে কিছু ভেবেছেন কি?