আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বুমরাহর ইয়র্কার এক ধরনের মানসিক আতঙ্ক। অনেক ব্যাটসম্যান বল ছাড়ার আগেই পা নামিয়ে দেন। কারণ তাঁরা জানেন—বলটা ঠিক কোথায় পড়তে চলেছে… ব্যাট আর মাটির মাঝের সেই একচিলতে ফাঁকে!

জসপ্রীত বুমরাহ
শেষ আপডেট: 7 March 2026 18:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁর ঝুলিতে অস্ত্র অগুনতি৷ ব্রহ্মাস্ত্র একটাই: ইয়র্কার! নিঁখুত, সঠিক, লক্ষ্যভেদী। ঠিক পা আর ব্যাটের হাইফেন-তুল্য ফাঁকে আঘাত হানে। যা গলে ডেলিভারি বেরিয়ে যায় বিদ্যুৎগতিতে। ছিটকে দেয় উইকেট। মিডল স্ট্যাম্প নিমেষে ছত্রখান!
ক্রিকেটে অনেক ধরনের ডেলিভারি আছে—বাউন্সার, ইনসুইং, আউটসুইং, স্লোয়ার। কিন্তু ইয়র্কার (Yorker) এমন এক বল, যার সামনে যে কোনও ব্যাটার অসহায়। বলটা ঠিক সেই জায়গায় পড়ে, যেখানে ব্যাট নামানোর আগেই সব শেষ—পায়ের কাছে, ব্যাট আর মাটির মাঝের সরু ফাঁকে… ক্রিকেটের ভাষায় যার নাম ‘ব্লকহোল’(Blockhole)। ইতিহাসে অনেক বোলার এই ডেলিভারিকে মারাত্মক অস্ত্রে পরিণত করেছেন—ওয়াসিম আক্রম (Wasim Akram), ওয়াকার ইউনুস (Waqar Younis), ম্যালকম মার্শাল (Malcolm Marshall)। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটে এই ডেলিভারিকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah)। তিনি ইয়র্কারের আবিষ্কর্তা নন, কিন্তু একে এমন নিখুঁত অস্ত্রে পরিণত করেছেন, যা এখন তাঁর নামের সঙ্গে সমার্থক!
চলতি টি–২০ বিশ্বকাপ (T20 World Cup) সেমিফাইনালের সেই দৃশ্যের কথা ধরুন। মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম (Wankhede Stadium)। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড (England)। ম্যাচের শেষ তিন ওভারে দরকার ৪৫ রান। ক্রিজে জেকব বেথেল (Jacob Bethell) প্রায় শতরানের কাছাকাছি। ইংল্যান্ডের ডাগআউটে তখনও আশার আলো। কিন্তু মাঠে উপস্থিত দর্শক জানেন—এখনই বল হাতে আসবেন বুমরাহ। রান-আপ শুরু করার আগেই স্টেডিয়ামের বাতাস যায় বদলে। ক্রিকেট দুনিয়ায় আজ এক অলিখিত নিয়ম—ডেথ ওভারে বুমরাহর ইয়র্কার মানেই অমোঘ আঘাত!
‘ইয়র্কার’ শব্দটির ইতিহাস বেশ মজাদার। ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার (Yorkshire) অঞ্চলের কথ্য ভাষা থেকে এসেছে ‘ইয়ার্কড’বা ‘ইয়র্কড’। যার অর্থ আচমকা আঘাত পাওয়া বা ধোঁকা খাওয়া। ক্রিকেটে এই ডেলিভারির কাজও ঠিক সেটাই—ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করা। বল ব্যাটের গোড়ায় পড়ে, ব্যাট নামানোর আগেই স্টাম্প উড়ে যায়। কিন্তু বুমরাহর ক্ষেত্রে এই ডেলিভারির গল্প শুরু কোনও আন্তর্জাতিক মাঠে নয়, সূচনা গুজরাতের আমদাবাদ (Ahmedabad) শহরের এক ছোট ফ্ল্যাটের করিডরে।
ছোটবেলায় বাড়ির ভেতরেই ক্রিকেট খেলতেন বুমরাহ। কিন্তু সমস্যা ছিল—তাঁর মা দলজিৎ বুমরাহ (Daljit Bumrah) দুপুরে বিশ্রাম নিতেন। জোরে বল করলে শব্দ হত। তাই দামাল বুমরাহ খুঁজে বের করেন অন্য উপায়। তিনি লক্ষ্য করেন দেয়াল আর মেঝের সংযোগস্থল—যেখানে বল পড়লে আওয়াজ কম হয়। সেই সরু জায়গাটাকে টার্গেট করে বারবার বল ফেলতে শুরু করেন। লক্ষ্য মাত্র কয়েক ইঞ্চি।
দিনের পর দিন সেই একই জায়গায় বল ফেলতে ফেলতে তাঁর নিয়ন্ত্রণ অদ্ভুত রকম নিখুঁত হয়ে ওঠে। আজ যে ডেলিভারি বাঘা বাঘা ব্যাটারদের সন্ত্রস্ত করে তোলে, তার বীজ বোনা হয়েছিল সেই একফালি করিডরে!
বিশ্ব ক্রিকেট প্রথম এই রহস্যের মুখোমুখি হয় ২০১৩ সালে আইপিএলে (IPL)। ভেন্যু: বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম (M Chinnaswamy Stadium)। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের (Mumbai Indians) হয়ে অভিষেক ম্যাচে এক অচেনা তরুণ বল হাতে এলেন। প্রতিপক্ষ তারকা-খচিত আরসিবি (Royal Challengers Bangalore)। সামনে বিরাট কোহলি। প্রথম চার বলে স্বাগত জানিয়ে অনভিজ্ঞ বোলারকে তিনটি চার মারলেন বিরাট (Virat Kohli)। যা যে কারও আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু পঞ্চম বলেই ছবিটা বদলে গেল! ক্রিজের বাইরে থেকে করা ডেলিভারি কোহলির প্যাডে আঘাত করতেই আউট! ক্রিকেট দুনিয়া প্রথমবার সাক্ষী রইল সেই অদ্ভুত অ্যাকশনের—ছোট রানআপ, হাট্টাগাট্টা শরীর, আর হঠাৎ স্লিংশটের মতো কব্জির মোচড়। অনেকেই একে ‘অদ্ভুত’ বলে দেগে দেন। কিন্তু সেই আজব অ্যাকশনই হয়ে ওঠে বুমরাহর সবচেয়ে বড় শক্তি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতীয় পেসারের আসল অভিষেক ঘটে ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (Sydney Cricket Ground) একদিনের ম্যাচে শেষ ওভারে বল হাতে পান বুমরাহ। তখন অস্ট্রেলিয়ার স্কোর তিনশোর কাছাকাছি। সেই ওভারের প্রথম বলেই জেমস ফকনারকে (James Faulkner) এক নিখুঁত ইয়র্কারে বোল্ড করেন তিনি। ডেলিভারি এতটাই নিখুঁত ছিল, যে ব্যাট নামানোর আগেই স্টাম্প উড়ে যায়। সেই মুহূর্তে অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন—এই বোলার জাতে ও মানে আলাদা।
এমনটা হওয়ার পিছনে বেশ কিছু বড় কারণও আছে। প্রথমত, তাঁর অ্যাকশন। বুমরাহর হাত দেরিতে দেখা যায়, ফলে ব্যাটসম্যান বল ছাড়ার মুহূর্তটা ধরতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, তাঁর কোণ। ক্রিজের বিভিন্ন জায়গা থেকে বল করেন, ফলে বলের অ্যাঙ্গেল যায় বদলে। তৃতীয়ত, চাপের মুহূর্তে তাঁর নিয়ন্ত্রণ। ক্রিকেটে ডেথ ওভার এমন সময় যখন বোলাররা সাধারণত নার্ভাস হয়ে পড়েন। ইয়র্কার মিস হলে তা ফুলটস হয়ে যায়, যার ফায়দা নিয়ে ব্যাটসম্যান সহজেই ছয় মারতে পারেন। কিন্তু বুমরাহর ক্ষেত্রে কিছুই খাটে না। চাপ বাড়লে তাঁর নিয়ন্ত্রণ যেন আরও নিখুঁত হয়ে ওঠে।
এই কারণে অনেক কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানও তাঁর সামনে অসহায়! একবার পাকিস্তানের কিংবদন্তি ওয়াসিম আক্রম মজা করে বলেছিলেন—‘বুমরাহকে থামানোর একটাই উপায়, ম্যাচের আগে ওর বুট চুরি করে নাও।’রসিকতা হলেও কথাটার মধ্যে সত্য লুকিয়ে আছে। আজকের দিনে হকআই (Hawk-Eye), ডেটা অ্যানালিটিক্স, ভিডিও বিশ্লেষণ—সবই মজুত। ব্যাটসম্যানরা জানেন, বুমরাহ কোথা থেকে বল ছাড়বেন, কীভাবে বল সুইং করবে। তবু তাঁরা খেলতে নাজেহাল। কারণ একটাই: শেষ মুহূর্তে বুমরাহর বলের গতি, কোণ আর রিলিজ পয়েন্ট ব্যাটসম্যানের হিসেব নষ্ট করে দেয়।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের ম্যাচে আবার ফিরে আসা যাক। শেষ তিন ওভারে ইংল্যান্ডের দরকার ৪৫ রান। ক্রিজে বেথেল ও স্যাম কারেন (Sam Curran)। বুমরাহ রানআপ শুরু করেন। প্রথম বল—বুটে ইয়র্কার। দ্বিতীয় বল—আবার ব্লকহোল। ব্যাটসম্যান শুধু ঠেকিয়ে দেন। তৃতীয় বল—এক রান। চতুর্থ বলে—দুই। শেষ পর্যন্ত ওভার থেকে এল মাত্র ছয় রান। স্কোরবোর্ডে লেখা—০ ১ ১ ২ ১ ১। এই সংখ্যাগুলোই যেন বুমরাহর স্বাক্ষর। ছোট ছোট সংখ্যা, কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বিশ্লেষকদের নজরে, বুমরাহর ইয়র্কারের আসল শক্তি: তিনি শুধু উইকেট নেন না, ম্যাচের অঙ্কটাই দেন বদলে। অনেক সময় ব্যাটসম্যান আউট না হলেও ম্যাচের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। কারণ ইয়র্কার রান আটকায়। শেষ ওভারের হিসেব ভেঙে দেয়। ক্রিকেটের নিরিখে এটাকে বলা যেতে পারে ‘অঙ্কের মৃত্যু’!
আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বুমরাহর ইয়র্কার এক ধরনের মানসিক আতঙ্ক। অনেক ব্যাটসম্যান বল ছাড়ার আগেই পা নামিয়ে দেন। কারণ তাঁরা জানেন—বলটা ঠিক কোথায় পড়তে চলেছে… ব্যাট আর মাটির মাঝের সেই একচিলতে ফাঁকে! যেখানে লুকিয়ে জসপ্রীত বুমরাহর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সেই ছদ্মবেশী ডেলিভারি, যা ব্যাটসম্যানের পায়ে চুমু খেতে এগিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত সবাইকে হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করে।