এটা বলা অন্যায় হবে, যে সূর্যকুমারের ফর্ম অস্তাচলে। আইপিএল দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে তাঁর রেঞ্জ আর কল্পনা এখনও বিস্মিত করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিসংখ্যানে স্পষ্ট ইঙ্গিত—এটা আর শুধু ‘রানের বাইরে’ থাকার গল্প নয়।

সূর্যকুমার যাদব
শেষ আপডেট: 21 January 2026 17:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘আমি ফর্মে নেই বলা ভুল, শুধু রানের বাইরে আছি’—এই কথাটা শুধু ক্রিকেট কেন, যে কোনও খেলার মঞ্চেই বহুকথিত, বহুশ্রুত। ব্যাটাররা বিশ্বাস রাখতে চান, টেকনিক ঠিক আছে, শুধু প্রত্যাশিত ফল আসছে না। সাম্প্রতিক সময়ে সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) নিজেও ঠিক এই যুক্তিতে অনড়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফর্ম আর রানের তুল্যমূল্য বিচার সামনে এনেছেন। আদত সত্যিটা কী? গত দেড় বছরের পরিসংখ্যান খুঁটিয়ে দেখলে কিন্তু প্রশ্নটা ফিকে নয়… বরং, অনিবার্য শোনায়—এটা শুধু রানের খরা, নাকি এর চেয়েও গভীরতর কোনও সমস্যা?
কোথায় ছিলেন সূর্য, আর কোথায় দাঁড়িয়ে এখন?
২০২১ থেকে ২০২৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত টি–২০ ক্রিকেটে সূর্যকুমার যাদব একেবারে আলাদা প্রজাতির ব্যাটার। মাঠে ফিল্ডিং সাজানো থাকুক বা না থাকুক, তিনি নিজের খুশিমতো রান করতেন। পেসারদের বিরুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র ছিল লেগ সাইডে স্কোয়ারের পিছনের অঞ্চল—যেখানে সাধারণ ব্যাটাররা ঝুঁকি নিতে চান না। আবার অফ স্টাম্পের বাইরে বল মানেই এক্সট্রা কভার দিয়ে উড়ে যাওয়া চার বা ছয়। এই সূর্যই নন–স্ট্রাইকার এন্ডে দাঁড়িয়ে থাকা বিরাট কোহলির (Virat Kohli) মতো ব্যাটারকে মুগ্ধ করেছিলেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর থেকে ছবিটা দ্রুত বদলেছে। পেস বোলিংয়ের বিরুদ্ধে তাঁর রিটার্ন কার্যত ধসে পড়েছে। এই সময়কালে ১৯ বার আউট হয়েছেন সূর্য। তার মধ্যে ১৮ বারই পেসারদের হাতে। গড় মাত্র ৮-এর ঘরে রেখে, স্ট্রাইক রেটও ১১০-এর নিচে। সংখ্যার থেকেও বেশি চিন্তার, কীভাবে আউট হচ্ছেন? হিসেব বলছে, প্রায় সব ক’টিই ক্যাচ এবং বেশিরভাগই আকাশে তুলে মারা শট থেকে।
‘আউট অফ রান’ বনাম বাস্তব সমস্যা
‘রানের বাইরে’ থাকা ব্যাটার সাধারণত ভালো শট খেলেন, কিন্তু ফিল্ডার ঠিক জায়গায় থাকে। সূর্যকুমারের ক্ষেত্রে সমস্যা আলাদা। এখানে দেখা যাচ্ছে ‘ইনটেন্ট আছে, কিন্তু কন্ট্রোল নেই’। বিশেষ করে ইনিংসের শুরুর দিকে।
এই ১৮টি পেস–বোলিং আউটের মধ্যে ১৩টিই এসেছে প্রথম ১০ বলের মধ্যে। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে পেসাররাই আসল ঘাতক। অর্থাৎ, নিজের সবচেয়ে কঠিন ম্যাচ–আপের মুখে পড়ছেন ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে। আরও তাৎপর্যের, শট বাছাইয়ের ধরন। বদলে গিয়েছে আকস্মিকভাবে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ বলে পেসের বিরুদ্ধে সূর্যর এয়ারিয়াল শটের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। নভেম্বরের পর যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশের বেশি। তার সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল নেমে এসেছে ভয়ংকরভাবে—৮৬ শতাংশ থেকে প্রায় ৫২ শতাংশে!
সহজ কথায়, সূর্যকুমার এখন বেশি আকাশে মারছেন, কিন্তু অর্ধেকের বেশি শটেই হারাচ্ছেন নিয়ন্ত্রণ। টি–২০–তে এর ফল কী, সেটা বোঝাতে পরিসংখ্যানের দরকার পড়ে না!
আইপিএল বনাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট: আসল পার্থক্য কোথায়?
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ তুলনা উঠে আসে। গত আইপিএলে সূর্যকুমার একই ব্যাটিং পজিশনে খেলেও টানা ১৬ ম্যাচে ২৫–এর বেশি রান করেছেন। প্রথম ১০ বলে একবারও আউট হননি। কারণ কী? আইপিএলে তাঁর প্রথম ১০ বলে পেস আর স্পিন প্রায় সমান ছিল। ফলে ইনিংসে ঢোকার সময়টা একটু ‘শ্বাস নেওয়ার’ সুযোগ পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেটা হয়নি। ভারতের শেষ ২৫টি টি–২০–র মধ্যে ১৮টাই ছিল ‘সেনা’ দেশগুলোর বিরুদ্ধে—যেখানে পেস বোলিংই মূল অস্ত্র।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পেস–অফ ডেলিভারি। তাঁর ১৬টি ক্যাচ–আউটের মধ্যে ৫টিই এসেছে ৮০ মাইলের নিচের বল থেকে—কাটার, স্লোয়ার। বোলাররা বুঝে গিয়েছে, গতি দিলে সূর্য বিপজ্জনক। তাই গতি কমিয়ে ভুল শটে বাধ্য করা হচ্ছে। লেগ সাইডে স্কোয়ারের পিছনে যেখানে একসময় গড় ছিল ৫৮-এর বেশি, এখন সেটা নেমে এসেছে ৮-এর নিচে। ফ্লিক শট, যা ছিল সিগনেচার, সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি বিপদ ডেকে আনছে।
শেষ কথা
এটা বলা অন্যায় হবে, যে সূর্যকুমারের ফর্ম অস্তাচলে। আইপিএল দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে তাঁর রেঞ্জ আর কল্পনা এখনও বিস্মিত করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিসংখ্যানে স্পষ্ট ইঙ্গিত—এটা আর শুধু ‘রানের বাইরে’ থাকার গল্প নয়। নিউজিল্যান্ড সিরিজ আর টি–২০ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব বড় পরীক্ষা। যদি শুরুতে শট বাছাই আর টেম্পো সামলাতে পারেন, পুরনো সূর্য ফিরে আসবেন। না পারলে, ‘আউট অফ রান’ আর ‘আউট অফ ফর্ম’—এই দুইয়ের মধ্যের সীমারেখাটা আরও ঝাপসা হয়ে যাবে।