
সুনীল গাভাসকরকে কটাক্ষ বিরাটের, পাল্টা দিলেন গাভাসকরও।
শেষ আপডেট: 6 May 2024 16:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'স্ট্রাইক রেট' ব্যাপারটা ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছে আইপিএলে। একে তো রানের কোনও আগা-তলা নেই। একটু ক্রিজে জমে গেলেই বোলারদের দুরমুশ করে পিটছেন কখনও ট্র্যাভিস হেড, কখনও সুনীল নারাইন, কখনও রিঙ্কু সিংহরা। ধুমধড়াক্কা পেটানোই আইপিএলের মূলমন্ত্র। তার ওপর ইমপ্যাক্ট সাব নিয়ম এনে আরওই বোলারদের অবস্থা কাহিল হয়ে উঠেছে। রোহিত শর্মা থেকে মহম্মদ সিরাজ সকলেই ঠারেঠোরে নানাভাবে একে দুষছেন। রিকি পন্টিং অবধি একে 'দুঃস্বপ্নের মত' বলে তোপ দেগেছেন। এদিকে ব্যাটসম্যানদেরও দুর্গতি। বড় রান পেলেও মুশকিল, যথেষ্ট 'স্ট্রাইক রেট' না থাকলে ডেথ ওভারে ম্যাচ বেরিয়ে যাচ্ছে হাত থেকে।
এই নিয়ে এবার জোর লেগে গেল বিরাট কোহলির সঙ্গে কিংবদন্তী সুনীল গাভাসকরের। এবারের আইপিএলে বিরাট দারুণ ফর্মে আছেন। ১১ ম্যাচে ৫৪২ করে বিরাট আপাতত কমলা টুপি মাথায় মাঠে ঢুকছেন। ধারাবাহিকভাবে ভাল ছন্দে আছেন এবার। কিন্তু কথা উঠছে তাঁর স্ট্রাইক রেট নিয়ে। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের এবারের রান-বিপ্লবের পরে ২০০ স্কোরটাকে 'সাধারণ' ধরে নিয়েই খেলতে নামছে সবাই। আড়াইশোর বেশি রান উঠেছে আটবার। বিরাটের থেকে মাত্র ১ রান পেছনে আছেন চেন্নাইয়ের ঋতুরাজ গায়কোয়াড়। সেখানে বিশেষ করে স্পিনের বিরুদ্ধে বিরাটের স্ট্রাইক রেট বেশ চিন্তার। পরিসংখ্যান বলছে, স্পিনের বিরুদ্ধে এবারের আইপিএলে যাদের ১০০-এর ওপরে রান আছে, তাদের মধ্যে বিরাটের ১৩৫.৬৬ স্ট্রাইক রেট কমের দিক থেকে পাঁচ নম্বরে।
প্রশ্নটা অজিত আগরকরের কাছেও উঠেছিল। কিছুদিনের মধ্যেই নিউ ইয়র্কের বিমানে উঠবেন বিরাট-রোহিতরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেটে স্পিন যথেষ্ট ভোগায়। কোহলির স্ট্রাইক রেট কি আপনাকে চিন্তায় রাখছে? মুম্বইয়ের সাংবাদিক সম্মেলনে আগরকর অবশ্য আমল দিতে চাননি। বলেছেন, কোহলি ভাল ফর্মে আছেন, আইপিএলে ধারাবাহিক রান করছেন, অভিজ্ঞতাটাও একটা সম্পদ। কিন্তু সুনীল গাভাসকরের মত অনেকেরই মনে হয়েছে, কোহলির স্পিনের বিরুদ্ধে কম স্ট্রাইক রেট একটা চাপের জায়গা।
কিন্তু সমালোচকদের একহাত নেওয়ায় ভাল 'সুনাম' আছে বিরাটের। গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে গত ম্যাচে ৪৪ বলে ৭০ করার পর বিরাট কার্যত এইসব সমালোচনার বিরুদ্ধে তীব্র কটাক্ষ করেন। ম্যাচ শেষে বলেন, 'দ্যাখো, যারা আমার স্ট্রাইক রেট কম বা স্পিন ভাল খেলছি না বলে সমালোচনা করছেন, তাঁরা ওটাই করতে ভালবাসেন। আমার কাছে ম্যাচ জেতানোটাই আসল। ১৫ বছর ধরে সেটাই করে আসছি।'
এইটুকুতে থেমে গেলেও চলত। কিন্তু বিরাট আরও একধাপ সুর চড়িয়ে সরাসরি আক্রমণ করেন ধারাভাষ্যকারদের, 'দিনের পর দিন মাঠে গিয়ে দলকে যেতানো আর বক্সে বসে কথা বলা তো এক নয়। আমার কাছে এটা দলকে জেতানো। ওটাই আমার কাজ। লোকজন বসে বসে খেলা নিয়ে তাদের ধারণা বা আইডিয়া নিয়ে কথা বলতেই পারে। কিন্তু যারা কাজটা করে প্রতিদিন, তারা জানে তারা কী করছে। আমার কাছে এটা খানিক 'মাসল মেমোরি'-র মত।'
বিরাটের এই মন্তব্য চাউর হতেই বিতর্ক শুরু হয়। এই যুক্তিতে চললে তো সমালোচনা বস্তুটাই থাকে না। শুধু মাঠে গিয়ে খেললেই যদি খেলা নিয়ে কথা বলার অধিকার জন্মায়, তাহলে ক্রিকেট-সাংবাদিক হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক-স্তরে ক্রিকেট খেলা। সেই যুক্তিতে চললে খেলার পৃথিবীতে হাওয়ার্ড মার্শাল, নেভিল কার্ডাস বা আজকের হর্ষ ভোগলের নামও কেউ জানত না। ফুটবল মাঠে পিটার ড্রুরির মহাকাব্যিক ধারাভাষ্যের জন্য মুখিয়ে থাকত না তামাম বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা। সবচেয়ে বড় কথা, সাংবাদিক হলে তাও এই যুক্তি খানিক জায়গা পায়। কিন্তু আইপিএলে যুক্ত ধারাভাষ্যকাররা তো আর সাধারণ সাংবাদিক নন। বরং সকলেই স্বনামখ্যাত ক্রিকেটার। বিশেষ করে যদি আমরা তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নামটাকে ধরি...। তিনি, সুনীল গাভাসকর। ভারতীয় ক্রিকেট গ্রহের একসময়ের আহ্নিক গতি নিয়ন্ত্রিত হত যার অধীনে। যার হেলমেট ছাড়া অগ্নিযুগের ওয়েস্ট ইন্ডিজের অ্যান্ডি রবার্টস, ম্যালকম মার্শাল, মাইকেল হোল্ডিং-দের ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে ব্যাট হাতে দাঁড়ানো কার্যত গল্পকথায় মিশে রয়েছে আজও।
স্বাভাবিকভাবেই অতঃপর কোহলির মন্তব্যে বেজায় ক্ষুব্ধ হন গাভাসকর। ম্যাচ শেষে চ্যাট শোয়ে গাভাসকর বলেন, 'আমার মনে হয় ওর স্ট্রাইক রেট যখন ১১৮ ছিল তখনই ধারাভাষ্যকাররা সেটার সমালোচনা করেছেন। আমি তো সব ম্যাচ বসে দেখিনি, ফলে বাকিরা কী বলছেন জানিনা। কিন্তু তুমি যদি ওপেন করতে আসো, তারপর ১৪ বা ১৫ ওভারে যখন আউট হচ্ছো, তখন দেখা যায় তোমার স্ট্রাইক রেট ১১৮, কিন্তু তারপরেও যদি তুমি তার জন্য হাততালি আশা করো... আমার মনে হয় এটা বেশ আলাদা একটা ব্যাপার!'
কোহলির এই সমালোচকদের একহাত নেওয়ার অভ্যেসকেও তারপর ছাড় দেননি গাভাসকর। ২০১৮ সালের নভেম্বরে একবার তৎকালীন ট্যুইটারে জনৈক ভক্ত বিরাটের চাইতে ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং দেখতে ভাল লাগে বলে লেখেন। জবাবে বিরাট সটান লেখেন, 'তাহলে তো আমার মনে হয় তোমার ভারতে থাকাই উচিত নয়।' সেই বিতর্কের রেশ অনেকদিন চলেছিল। রাজনীতির ময়দানেও এসেছিল সেসব। গাভাসকর যদিও বলেন, 'এইসব ছেলেরা সবাই আজকাল দাবি করে, আমরা বাইরে কে কী বলল তাতে কান দিই না। আচ্ছা! তাহলে তোমরা বাইরে কে কী বলল তাতে এত জবাব দিচ্ছো কেন? আমরা সবাই অল্পস্বল্প ক্রিকেট খেলেছি। খুব বেশি নয়, অল্পই। কিন্তু আমাদের তো কোনও অ্যাজেন্ডা নেই। যা আমরা দেখি, সেটা নিয়েই বলি। আমাদের পছন্দ-অপছন্দের কিছুই থাকে না। যদিও থেকেও থাকে, তাহলেও, যা আমরা দেখি, সেটাই বলি।' তবে বিরাট তারপর আর কোনও পাল্টা মন্তব্য না করায় আপাতত জল পড়েছে বিতর্কে।