অস্ট্রেলিয়ায় চোট-আঘাতের আশঙ্কা বুকে অভিষেক। ঘরের মাঠে জাদেজা চোট পেলে তৃতীয় স্পিনার হিসেবে প্রথম একাদশে নামেন। তখনই জানা যায়, তিনি স্রেফ বল হাতে নয়, ব্যাটার হিসেবেও দলকে প্রয়োজনে টানতে জানেন।

ওয়াশিংটন সুন্দর
শেষ আপডেট: 3 August 2025 17:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুণেতে অফ স্পিনে ১১ উইকেট তুলে নিতে পারেন।
আমদাবাদের টার্নারে লোয়ার অর্ডারের সঙ্গে ব্যাট করে প্রায় শতরান ছুঁতে জানেন।
ব্রিসবেনে প্যাট কামিন্সকে হুক করে ছয় কষানোর সাহস রাখেন।
লর্ডসে যখন উইকেট নিস্তেজ, তখন ড্রিফট করে ব্যাটসম্যানদের জালে ফেলেন।
আর এখন, দক্ষিণ লন্ডনের ওভালে ৩৯ বলে হাফসেঞ্চুরি করে ওয়াশিংটন সুন্দর বোঝালেন—তিনি যে কোনও ভূমিকায় সমানে লড়ে যান!
তৃতীয় দিনের বিকেলে ভারতের ইনিংসে হঠাৎ ধস নেমেছিল। জোশ টাং এক ওভারে দুই উইকেট তুলে আঘাত হানলেন। লিড তখন ৩৩৪। আরেকটা উইকেট গেলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারত। সেখান থেকেই ব্যাট হাতে প্রাচীর গড়লেন সুন্দর। ধাতস্থ হলেন। সময় নিলেন। তারপর প্রত্যাঘাত! ১৩ টেস্টের সংক্ষিপ্ত কেরিয়ারে এর আগেও টেল এন্ডকে সঙ্গে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রান তুলেছেন। তবে ওভালে যা করলেন, তাতে নতুন মেজাজ, নয়া অবতারে সুন্দর!
এর আগে কোনও টেস্ট ইনিংসে দুইয়ের বেশি ছয় মারেননি। ওভালে পাঁচ বলে তিনটি ছক্কা! বিভিন্ন লাইন-লেংথে চেষ্টা করেও ইংরেজ বোলাররা আটকাতে পারলেন না। ব্যাটে-বলের সাফসুতরো হিট। আত্মবিশ্বাসী ফ্রন্ট ফুট, ব্যাক ফুটে কৌশলী। পাঁচ বলেই ইংল্যান্ডের সমস্ত ঝাঁজ গেল উবে। টাং বাধ্য হলেন দূরে বল ফেলতে। গাস অ্যাটকিনসনের ডেলভারিতে চতুর্থ ছয় হাঁকিয়ে সেরে ফেললেন টেস্ট কেরিয়ারের সবচেয়ে ঝকঝকে অর্ধশতরান। কার্যকরীও বটে!
আজ থেকে আট বছর আগে আইপিএল অভিষেকের পর সুন্দর কখনও কখনও লং রেঞ্জ হিটিংয়ের আভাস দিয়েছেন। কিন্তু কোনওদিন এই কায়দায় স্টেজ কাঁপাননি। ওভাল ইনিংসের আগে কোনও ফরম্যাটেই এক ইনিংসে চারটি ছয় মারেননি। অথচ এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথমে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে আর্চার-স্টোকসের বিরুদ্ধে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো শতরান, তারপর ওভালে নয় নম্বরে নেমে ৩৯ বলে মারকাটারি ইনিংস! প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক: এমন কোন কাজটা তিনি ঠিকমতো করতে পারেন না?
এই প্রসঙ্গে তুলনার হিসেব মাথায় রাখা ভাল। ভারতের আট নম্বর বা তার নিচে ব্যাট করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে গড়ের হিসেব এক নজরে এরকম (ন্যূনতম ১০ ইনিংস):
১. মহেন্দ্র সিং ধোনি – গড় ৬৯.৭৭ (২ শতরান)
২. ঋদ্ধিমান সাহা – গড় ৪৩.২২ (১ শতরান)
৩. ওয়াশিংটন সুন্দর – গড় ৩৮.৯ (৩ হাফসেঞ্চুরি)
৪. অক্ষর প্যাটেল – গড় ৩৭.৮
৫. মনোজ প্রভাকর – গড় ৩৫.৬৬
টেস্টে ওয়াশিংটন সুন্দরের জার্নি বেশ আলাদা। বেশি গড় সমেত ৭৫০ রানের বেশি করেছেন, তুলেছেন তিরিশের বেশি উইকেট অলরাউন্ডার—এই লিস্টে ওয়াশিংটন সুন্দরের উপরে কেউ নেই। অথচ বিস্ময়কর হচ্ছে, কয়েকদিন আগেও দলে তাঁর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠত!
অস্ট্রেলিয়ায় চোট-আঘাতের আশঙ্কা বুকে অভিষেক। ঘরের মাঠে জাদেজা চোট পেলে তৃতীয় স্পিনার হিসেবে প্রথম একাদশে নামেন। তখনই জানা যায়, তিনি স্রেফ বল হাতে নয়, ব্যাটার হিসেবেও দলকে প্রয়োজনে টানতে জানেন। কিন্তু জাদেজা ফেরার পর আর অক্ষরের চমকপ্রদ উত্থানে দল থেকে সরে যান। পরে হঠাৎ ফিরিয়ে আনেন গৌতম গম্ভীর। প্রথম ম্যাচেই বল হাতে সাত উইকেট। বিদেশে দ্রুত রান তুলতে ব্যর্থ ফাস্ট বোলারদের বদলে ব্যাটিং গভীরতা জোগাতে সুযোগ পেলেন। ব্রাত্য রইলেন কুলদীপ যাদব। বোলার হিসেবে পরিচিতি পেলেও সেভাবে কাজে লাগানো হল না, যতক্ষণ পর্যন্ত না ড্রিফট দিয়ে ব্যাটসম্যান ভোলাতে শুরু করলেন। এখন, এক সপ্তাহে চরমপন্থী ও নরমপন্থী দুই আলাদা গোত্রের ব্যাটিং পারফরম্যান্স সুন্দরকে যেন নতুনভাবে সামনে প্রচারের আলোয় এনেছে।
ভারতের একাদশে তাঁর চেয়ে বড় ব্যাটসম্যান বা বোলার থাকলেও অনেক কাজ সমান দক্ষতায় করার অলরাউন্ডার রয়েছেন কি? এই বহুমুখীনতাই ওয়াশিংটনের আসল পরিচয়। তাঁকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা আসলে দলের ক্ষমতাকে সীমিত করার শামিল। একাধিক ভূমিকায় পারদর্শী ক্রিকেটার--আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে সফল হওয়ার হয়তো এটাই মূল মন্ত্র!