যারা একদিন বলেছিল ‘হবে না’, তাদের সামনে আজ দেশের মেয়েরা বলছে—‘হয়ে গেছে, এবার নিয়ম বদলান।’ আর ইতিহাস জানে, অচলায়তনের নীতি শেষমেশ পাল্টাবেই!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 November 2025 14:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের মেয়েদের বিশ্বকাপ (Women’s ODI World Cup 2025) জয়ের পর পুরোনো ক্ষত আবার জেগে উঠেছে। ডায়ানা এডুলজির (Diana Edulji) ২০১৭ সালের সেই অভিযোগ—‘এন শ্রীনিবাসন (N Srinivasan) বলেছিলেন, আমার হাতে থাকলে আমি মেয়েদের ক্রিকেটই হতে দিতাম না’—ফের ঘুরেফিরে আলোচনায়।
৫২ বছর আগে প্রথম মহিলা ওয়ানডে বিশ্বকাপ (Women’s ODI World Cup 1973); ৫২ বছর পরে ভারত প্রথমবার ট্রফি জিতল; আর ঠিক ‘৫২’ রানের ব্যবধানেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে (South Africa) হারাল—সংখ্যার এই সাঙ্কেতিক জবাব যেন কেবল প্রতিপক্ষকে নয়, নারী-ক্রিকেট-বিরোধী মনস্তত্ত্বকেও বর্শার ফলায় বিঁধল!
এডুলজি বরাবরই ধারালো কণ্ঠ। ১৯৭৮–৯৩ পর্যন্ত ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়া এই কিংবদন্তি ২০০৬ সালে মেয়েদের ক্রিকেট বিসিসিআইয়ের (BCCI) আওতায় এলেও প্রশাসনের ‘পুরুষতান্ত্রিক’ মানসিকতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সুর চড়িয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘বিসিসিআই খুবই পুরুষ-শোভিনিস্ট সংগঠন… তারা কোনও দিন চায়নি মেয়েরা শর্ত ঠিক করুক।’ ২০১১ বিশ্বকাপের (ICC World Cup 2011) পরে ওয়াংখেড়েতে (Wankhede Stadium) শ্রীনিবাসনকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে যে কথোপকথন শুনেছিলেন—‘আমার হাতে থাকলে মেয়েদের ক্রিকেটই হতে দিতাম না’—সেটা শুধু ব্যক্তিগত ‘অভদ্র উক্তি’ নয়, এক সময়ের প্রতিষ্ঠিত মনোভাবের প্রতিনিধিও বটে। ফলে আজকের জয় কেবল মাঠের নয়; ভাষা, মানসিকতা, সংস্কারের বিরুদ্ধেও এক সপাটে চড়!
ছবিটা অবশ্য বদলেছে। উইমেনস প্রিমিয়ার লিগ (WPL), সম্প্রচারে বাড়তি জায়গা, চুক্তির কাঠামো—সব মিলিয়ে কাঠামোগত উন্নতি। তবুও বৃত্ত ‘সম্পূর্ণ’ নয়। আসলে এই ট্রফি দেখাল, প্রতিভা–পরিশ্রম–পরিকল্পনা একসঙ্গে জুড়ে গেলে ফল মেলে। একই সঙ্গে মনে করাল, লম্বা রাস্তা হাঁটা বাকি। যে সংগঠনে নারী ক্রিকেট ‘অ্যাপেনডিক্স’ হিসেবে টিকে ছিল, সেখানে তাকে ‘কোর’ করার কাজটাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জয়ের রাতে তাই দ্বিমুখী বার্তা। মাঠে—হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)-এর দাপট, স্মৃতি মন্ধানার (Smriti Mandhana) স্ট্রোকপ্লে-র মসৃণ ছন্দ, দীপ্তি শর্মার (Deepti Sharma) অলরাউন্ড পারফরম্যান্স, রিচা ঘোষের (Richa Ghosh) ডাকাবুকো খেল—সব মিলেজুলে এক আত্মবিশ্বাসী দল।
আর মাঠের বাইরে—মিতালি রাজ (Mithali Raj) ও ঝুলন গোস্বামীর (Jhulan Goswami) মতো পথপ্রদর্শকদের হাতে ট্রফি ধরা… মানে যে ইতিহাস ‘নেই’-র ভেতর থেকে ‘আছে’ হওয়া শিখিয়েছে, তাদের অবদানকে সামনে টেনে আনা। এই স্বীকৃতিই মেয়েদের ক্রিকেটের সামগ্রিক জার্নিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।
তবু সতর্ক সুর জরুরি। শ্রীনিবাসনের মতো উচ্চপদস্থ কণ্ঠ থেকে যে অবজ্ঞা একদিন বেরিয়েছিল—ওটা কেবল ‘এক ব্যক্তির মত’ বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তাতে সমস্যার শিকড় দেখা যায় না। মূল প্রোথিত ছিল বাজেট বণ্টনে বৈষম্য, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে (age-group cricket) কম ম্যাচ, পরিকাঠামোয় অগ্রাধিকার না পাওয়া, সম্প্রচারে (broadcasting) ‘স্লট’ না থাকা, কোচিং–স্কাউটিং–ফিটনেস সাপোর্টে ঘাটতির অন্দরে। শেষ কয়েক বছরে এই দেয়াল ভাঙা শুরু হয়েছে ঠিকই। কিন্তু স্থায়ী সমতা পেতে দরকার—প্রতি রাজ্যে আবশ্যিক মেয়েদের অ্যাকাডেমি (women’s cricket academies), স্কুল–কলেজ লিগের ক্যালেন্ডার, মাতৃত্বকালীন সাপোর্ট-ধারা চুক্তিতে এবং টিভি–ডিজিটালে ‘কোর ক্রিকেট’ বিশ্লেষণ।
এখানে এডুলজির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্ট-নিযুক্ত কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ওপর থেকে নীতি বদলের চেষ্টা করেছেন। মাঠে–মিডিয়ায় যতটা পারছেন আওয়াজ তুলেছেন। আজকের জয় তাঁর এবং তাঁর প্রজন্মের ‘নিঃশব্দ শ্রমে’র সম্মান। শ্রীনিবাসনের মন্তব্যের ফের সামনে আসা তাই কোনও ‘ক্লিকবেট’ নয়… আয়না মাত্র—কী ছিলাম, কতটা পথ হাঁটলাম, আর কোথায় যেতে হবে—এই হিসেব নির্ভুলভাবে বুঝে নেওয়া!
সারকথা, ডিওয়াই পাতিলের (DY Patil Stadium) ৫২ রানের জয় ‘স্কোরলাইন’-এর বাইরে গিয়েও প্রতীক। একদিকে ট্রফি, অন্যদিকে ট্যাবু ভাঙার দলিল। যারা একদিন বলেছিল ‘হবে না’, তাদের সামনে আজ দেশের মেয়েরা বলছে—‘হয়ে গেছে, এবার নিয়ম বদলান।’ আর ইতিহাস জানে, অচলায়তনের নীতি শেষমেশ পাল্টাবেই! যখন মাঠে ফল আসে, গ্যালারিতে বিশ্বাস বাড়ে আর প্রশাসনের টেবিলে সংখ্যার হিসেব নীরব হয়ে যায়—এই বিশ্বজয় (World Cup triumph) সেই নীরবতাকেই সবচেয়ে জোরালো ভাষায় সামনে এনেছে।