ইডেনের ঘটনাটা তাই সতর্কবার্তা। ভারতের স্পিন–স্কিল যেমন অবনতির দিকে, তেমনই পিচ–টেলরিংয়ের অভ্যাসও বয়ে আনছে চরম ক্ষতি।

ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 17 November 2025 12:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরফান পাঠানের বিশ্লেষণে—ভারতীয় ব্যাটারদের স্পিন–স্কিল পালেস্তারা ঝরে যাওয়ার মতো খসে পড়ছে। হরভজন সিংয়ের চোখে—দোষ পুরোপুরি পিচের। এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইডেন গার্ডেন্সের তিন দিনে শেষ হওয়া টেস্ট—যেটা আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের গভীর সমস্যার নির্ভেজাল খসড়া, সবকিছু এক্স–রে রিপোর্টের মতোই স্পষ্ট!
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১২৪ রান তাড়া করা, শুনতে সহজ। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে ইডেনের বাইশ গজে দুরূহ চ্যালেঞ্জ। গতকালও সেটাই পরিণত হল সুউচ্চ শৃঙ্গে। ভারত গুটিয়ে গেল ৯৩-এ। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২টি উইকেট তুলে নিলেন স্পিনাররা। আর মুখ্য ভিলেন কিংবা নায়ক—আপনি যেভাবে দেখতে চান—সেই সাইমন হার্নার। এক ট্রেডমার্ক অফস্পিনারকে ইডেন কীভাবে শেন ওয়ার্নে পরিণত করতে পারে, তা দিন-দুয়েকেই খালি চোখে দেখা গেল।
এখানেই উঠেছে প্রথম প্রশ্ন—ভারতীয় ব্যাটাররা কি সত্যিই স্পিন খেলতে ভুলে গিয়েছে?
সওয়ালের উদগাতা ইরফান পাঠানের উত্তর ‘হ্যাঁ’। তাঁর মতে, ভারতীয় ব্যাটারদের টেকনিক, বিশেষ করে লেগ–স্পিন, অফ–স্পিন, লো বাউন্স, হাই বাউন্স—সবকিছু সামলানোর শিল্পটাই নাকি কমতে কমতে প্রায় বিলীনের পথে! পাঠানের চোখে, অন্তত দু’জন ব্যাটার যদি ইতিবাচকভাবে, স্ট্রাইক ঘোরানো মনোভাব নিয়ে খেলতেন, ম্যাচ জিতে যাওয়া যেত।
এখানেই তাঁর যুক্তির সত্যতা—অক্ষর প্যাটেল যেভাবে হাত খুলে ২৫–২৬ রানে পৌঁছলেন, সেই ভাবনাটা যদি উপরের সারিতে দেখা যেত, ভারত ১২৪ তাড়া করে ফেলতে পারত। পাঠানের যুক্তি, আজকের ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা বাঁচতে বেশি, রান তুলতে খেলেন কম। আর টেস্ট ক্রিকেটে অতিরক্ষণ একধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা। আপনি প্রথম বল নয়, দ্বিতীয় বল নয়—তৃতীয় বলে ধরা দেবেনই দেবেন, কারণ ব্যাট আর মাথা দুই-ই চাপে ডুবে গেছে, শরীর আটকে গেছে আর স্পিনাররা এই মানসিক অবস্থাকেই টার্গেট করে!
কিন্তু সমস্ত দায় ব্যাটারদের ঘাড়ে চাপানো হলেও ছবি সম্পূর্ণ হয় না। এখানেই চলে আসে হরভজন সিংয়ের বক্তব্যের ন্যায্যতা। পিচকে খলনায়ক দেগে দিয়ে তাঁর সাফ বক্তব্য ‘আরআইপি টেস্ট ক্রিকেট!’ অর্থাৎ কিনা ইডেনের বাইশ গজ লাল বলের ক্রিকেটের বধ্যভূমি! তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—বছরের পর বছর ভারত এমন পিচ বানাচ্ছে, যা আদৌ টেস্টের মান বাড়ায় না। টার্ন থাকবে—এটা ঠিক; কিন্তু অতিরিক্ত শুকনো, কম রোল করা, অস্বাভাবিক আচরণ করা পিচে খেলা ক্রিকেটারদের স্কিল তৈরি করে না। বোলাররা নায়ক হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু সেই উইকেটগুলো কখনওই প্রকৃত দক্ষতার পরিচায়ক নয়!
অথচ ইডেনের বাইশ গজ তো ঐতিহাসিকভাবে এমন ছিল না। এখানে রাজ করত রিভার্স সুইং, ছিল ধীর গ্রিপ, ধৈর্য ধরে বোলিং করার পরিসর। কিন্তু এবারের পিচ যেন ছদ্ম–টার্নারের আদর্শ উদাহরণ। শুকনো মাটি, অসমান বাউন্স, কখনও ধুলো, কখনও লাফ—এ তো স্বাভাবিক নয়। বরং, এমন এক উইকেট, যা দু’দলেরই ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করে দেবে। আর এখানেই আসল বিপদ—এই ধরনের উইকেট ক্রিকেটের শিল্পকে নষ্ট করে। ব্যাট–বল লড়াইয়ের জায়গা নেয় ‘বেঁচে থাকার যুদ্ধ’। আর টেস্ট ক্রিকেট বাঁচার লড়াই নয়—ধৈর্য, স্কিল, পরিকল্পনা, গতি বদলের দ্বৈরথ!
দুটি মত—বিপরীত মেরু। তবে সত্যিটা মাঝামাঝি কোথাও। ভারতীয় ব্যাটারদের স্পিন–টেকনিক সত্যিই ক্ষয়েছে। সাদা বলের ক্রিকেটের ভিড়ে স্পিন খেলার সময় কমেছে। থ্রোডাউন, হার্ড লেন্থ, এগুলোতে খেলতে খেলতে কব্জির কাজ, নরম হাতে ডিফেন্স, ফুটওয়ার্ক সবই যেন গোল্ডফিশ মেমরির মতো হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, বোর্ড–নির্দেশিত পিচ টেলরিংয়ের অতিরিক্ত হাওয়া টেস্ট ক্রিকেটকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও একই ভুল হয়েছিল। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট জোগাড়ের তাড়নায় কৃত্রিম পিচ বানালে ম্যাচ ছোট হয়, কিন্তু ক্রিকেট খাটো হয় আরও অনেক গুণ বেশি।
ইডেনে এবার দেখা গেল তিন দিনের নাটক। উত্তেজনা ছিল, কিন্তু ক্রিকেট কোথায়? দর্শকরা এসেছিলেন পাঁচ দিনের আবহে, ধীরে ধীরে ক্লাইম্যাক্স চেটেপুটে খাওয়ার আমেজ উপভোগ করতে। অথচ তাঁরা উড়তে দেখলেন ধুলো, অপ্রত্যাশিত ভাঙন। উত্তেজনা আছে ঠিকই, কিন্তু লড়াই? নেই। ব্যাটারদের সংহতি নেই, বলের স্বাভাবিক জীবন নেই। এই পরিস্থিতি ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য চিন্তার।
আসলে প্রশ্নটা খুব সোজা—পিচ নষ্ট হলে ক্রিকেট বাঁচে না; ব্যাটাররা স্কিল হারালেও খেলাটা মরে যায়। এই দুইয়ের সংযোগেই ইডেনের বিপর্যয় ঘনিয়েছে। তাই দায় কার, সেটা আঙুল তুলে বলা যতটা সহজ, আসল সমস্যা তার চেয়ে অনেক গভীর। ভারত টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচাতে চাইলে ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ফের শক্ত করে পিচকে তার স্বাভাবিক চরিত্রে থাকতে দিতে হবে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য ঠিক এখানেই—চ্যালেঞ্জ থাকবে, কিন্তু সেটা যেন ক্রিকেটের নিজস্ব অর্জন হয়; পিচের অসুস্থ আচরণের ফসল না হয়ে দাঁড়ায়!
ইডেনের ঘটনাটা তাই সতর্কবার্তা। ভারতের স্পিন–স্কিল যেমন অবনতির দিকে, তেমনই পিচ–টেলরিংয়ের অভ্যাসও বয়ে আনছে চরম ক্ষতি। দুটো মিললেই তিন দিনে খতম হওয়া ‘টেস্ট’—যেটা সুস্থির লড়াই নয়, একধরনের তড়িঘড়ি বাঁধা অস্থির নাটক। আর টেস্ট ক্রিকেটের শিকড় গাঁথা অস্থিরতায় নয়—অধ্যবসায়ে। এই সত্যটা ভুলে গেলে আগামী দিনে আরও অনেক ইডেন-বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।