এতদূর এসেই শেষ হতে পারত রূপকথার প্রত্যাবর্তন! বিচ্ছিন্ন প্রত্যঙ্গ জোড়া লেগে উঠে দাঁড়ানোটাই স্বপ্নের গন্তব্য। কিন্তু ঋষভ পন্থ আলাদা।

ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 29 June 2025 15:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডিসেম্বর, ২০২২।
তিন বছর আগে হাড়কাঁপানো শীতের রাতে যখন ঋষভ পন্থকে মারাত্মক জখম অবস্থায় মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়, তখন দায়িত্বে থাকা চিকিৎসককে তাঁর প্রথম প্রশ্নই ছিল, ‘আমি কি আবার খেলতে পারব?’
একটা দুর্ঘটনা, ‘মর্মান্তিক’ বিশেষণটা জুড়লেও যার প্রাবল্য ঠিকমতো বোঝানো অসম্ভব, প্রাণে বাঁচবেন কি না ঠিক নেই, প্রাণে বাঁচলেও হাঁটতে পারবেন কি না অনিশ্চিত—সেই পরিস্থিতিতে খেলতে পারা-না পারা ঋষভের কাছে জীবনমরণের সমস্যার চেয়েও জোরালো ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়।
ক্রিকেট দেবতা কোনওকালেই পুরোপুরি সদয় হননি। কেরিয়ারে এই আলো, এই অন্ধকার। এই সাফল্য, এই ব্যর্থতা। ঋষভ পন্থের ক্রিকেটজীবন বরাবর বন্ধুর, খেলোয়াড়ভাগ্য অস্থির। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর, নতুন বছরে পা রাখার দু’দিন আগে দিল্লি থেকে রুরকি যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা! গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা মেরে উলটে পড়ে। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মারাত্মকভাবে আঘাত পান ঋষভ। তড়িঘড়ি হাসপাতালে আনা হয়। অর্থোপেডিক সার্জেন ডা. দীনশ পার্দিওয়ালা ছিলেন অপারেশনের দায়িত্বে।
কেমন অবস্থা হয়েছিল ঋষভের? দীনশর কথায়, ‘যেদিন তাকে প্রথম নিয়ে আসা হয়, তখন গোটা শরীর প্রায় ছিন্নভিন্ন। ডান হাঁটুটি পুরোপুরি স্থানচ্যুত, গোড়ালিতে গুরুতর চোট, সারা শরীরে ছোটখাটো জখমের চিহ্ন। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ত্বকের অবস্থা—ঘাড়ের পেছন থেকে হাঁটু পর্যন্ত পুরো চামড়া ঘষা খেয়ে ছিঁড়ে আসে। দুর্ঘটনার ধাক্কায় গাড়ির জানলার ভাঙা কাচের আঘাতে পিঠের মাংস পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।’
আশঙ্কার মেঘ যে অস্ত্রোপচারের পরেও কাটেনি, অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে জানিয়ে দেন ডাঃ পার্দিওয়ালা। বলেন, ‘ঋষভ পন্থ বেঁচে আছে, এটাই অলৌকিক। সত্যিই অলৌকিক।’
অর্ধেক বলেছিলেন সার্জেন। বাকি অর্ধেক সত্য প্রমাণ করেছেন ঋষভ নিজে। চিকিৎসা, অপারেশন, থেরাপি আর অদম্য মানসিক শক্তির এক দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে ৬৩৫ দিন বাদে যেদিন শুধু পায়ে ভর দিয়ে স্রেফ উঠে দাঁড়ালেন না, হাঁটাচলা করলেন না… প্যাড পরে, গ্লাভস হাতে, মাথায় হেলমেট গুঁজে যখন ব্যাট হাতে ট্রেনিংয়ে নামলেন, বিষাক্ত ইনসুইং আর বোমারু বাউন্সারের মোকাবিলা শুরু করলেন, জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ামাত্র হাঁকালেন শতরান—সেটাই এক লহমায় ক্রিকেটের ইতিহাসে ‘অলৌকিক প্রত্যাবর্তন’ হয়ে উঠল!
তিন বছর গড়ালেও ডাঃ পার্দিওয়ালার বিস্ময় এখনও কাটেনি। তাঁর চিকিৎসক-জীবন আর চোখে-দেখা যুক্তি অনুযায়ী, এত ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় গাড়ি উল্টে আগুন ধরে গেলে প্রাণে বেঁচে থাকাটাই একটা শুধু ‘সৌভাগ্য’ নয়, ‘বিরল সৌভাগ্য’ই বটে। তিনি বলেন, ‘আরও ভয় ছিল, হাঁটুর ভয়াবহ চোটের জেরে রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হলে চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক না করলে পুরো পা-ই বাদ দিতে হবে। যদিও এতকিছুর পর, অবিশ্বাস্যভাবে, ঋষভের রক্তনালী অক্ষত ছিল!’
কিন্তু সবই কি অলৌকিক? চিকিৎশাস্ত্রের কোনও হাত নেই? সার্জেনের কথায়, ‘যখন কারও হাঁটু এভাবে ডিসলোকেট হয়, সমস্ত লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়, তখন প্রধান রক্তনালী বা স্নায়ুও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঋষভের তেমনটা হলে হলে হয়তো আমরা আর কিছুই করতে পারতাম না।’
২০২৩ সালের ৬ জানুয়ারি, দীর্ঘ চার ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারে হাঁটুর তিনটি লিগামেন্ট সারাই ও টেন্ডন ও মেনিস্কাস মেরামত করা হয়। তবু অপারেশন শেষে অনেক সপ্তাহ বিছানায় পড়েছিলেন ঋষভ। হাতদুটো এতটাই ফুলে গিয়েছিল যে নিজে দাঁতও মাজতে পারতেন না। তারপর ধীরে ধীরে জল নিজের হাতে খাওয়া শুরু। এক পা-দু’পা ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটা। সবশেষে চার মাস বাদে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ানো, চলাফেরা!
এতদূর এসেই শেষ হতে পারত রূপকথার প্রত্যাবর্তন! বিচ্ছিন্ন প্রত্যঙ্গ জোড়া লেগে উঠে দাঁড়ানোটাই স্বপ্নের গন্তব্য। কিন্তু ঋষভ পন্থ আলাদা। ডাঃ পার্দিওয়ালার কথায়, ‘অসুস্থ রোগীরা সাধারণত হেঁটেচলে বেরলেই খুশি থাকেন। কিন্তু ঋষভ নিজের সুস্থতার টাইমলাইন নিজেই ঠিক করেছিল। প্রশ্ন ছিল, ‘আমি কতদিনে ফিরতে পারব?’ আমি বলেছিলাম, অন্তত ১৮ মাস লাগবে। কিন্তু ঋষভ থামেনি। নিজের শরীরকে এমনভাবে পুশ করেছে, যেটা সাধারণ কেউ করে না।’
স্রেফ চলাফেরা নয়। ঋষভ পন্থের লক্ষ্য ছিল নেটে নামা, প্র্যাকটিস করা, ক্রিকেটের ময়দানে জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরে আসা! আর এই কারণেই প্রথম যেদিন ঋষভকে হাসপাতালে আনা হল, তাঁর গলায় একটাই প্রশ্ন, ‘আমি কি আর কখনও খেলতে পারব?’ পাশে দাঁড়িয়ে মা। ছেলের সওয়ালের জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘ও কি কোনও দিন হেঁটে চলতে পারবে?’
ঋষভ চলেছেন, ফিরেছেন, মাঠে নেমেছেন, সেঞ্চুরি করেছেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাত্রাপথের পরের অধ্যায় লেখা হয়েছে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে। দীর্ঘ এক বছরের কষ্টসাধ্য রিহ্যাবিলেশন। যার ফলশ্রুতি ধাপে ধাপে স্বাভাবিকতা ফিরে আসা, জীবনের মূল স্রোতে প্রত্যাবর্তন।
ফিরেছেন তিনি। কীভাবে? সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় মিরাকল। মৃত্যুর মুখ থেকে, শরীরের প্রায় অর্ধেক চামড়া হারিয়ে, হাঁটুর সব লিগামেন্ট ছিঁড়ে ঋষভ পন্থ ফিরে এসেছেন শতরানের উচ্ছ্বাস আর সামারসল্টের ভেল্কিতে!