সমস্তিপুরের কিশোরের বার্তা পরিষ্কার—কোনও ‘ওয়ান-সিজন ওয়ান্ডার’, স্রেফ প্রতিশ্রুতিমান প্রতিভা নয়… ভারতীয় ক্রিকেট নতুন এক লম্বা রেসের ঘোড়ার অভিষেকের সাক্ষী থাকতে চলেছে।
.jpeg.webp)
বৈভব সূর্যবংশী
শেষ আপডেট: 31 March 2026 10:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: খেলার মাঠে ‘সেকেন্ড ইয়ার সিনড্রোম’ বলে একটা টার্ম বেশ মুখে মুখে ঘোরে। অভিষেককারী প্রতিভা পয়লা সিজনে চোখ ধাঁধালেও পরের মরসুম থেকে ক্রমশ উধাও হতে শুরু করেন। ফলে তাঁকে এক মরসুমের ঝলক বলা উচিত নাকি প্রজন্মের তারকা—তা নিশ্চিত করতে সবুর রাখা জরুরি।
খেলাধুলোর অনেক আপ্তবাক্যের মতো এই ধারণাটিকেও হয়তো স্কুপ হিটে বাউন্ডারির বাইরে পাঠাতে চলেছেন বৈভব সূর্যবংশী। অন্তত গতকাল চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে মারকাটারি হাফসেঞ্চুরির পর এই কথাটা বেশ জোর দিয়েই বলা যেতে পারে। বয়স মাত্র ১৫। কিন্তু ব্যাট হাতে যেন বহুদিনের পরিণত ক্রিকেটার। আইপিএল (IPL 2026)-এর উনিশতম সংস্করণের মঞ্চে তৃতীয় দিনে গুয়াহাটির বর্ষাপাড়া ময়দানে রাজস্থান রয়্যালসের (Rajasthan Royals) তরুণ প্রতিভা (Vaibhav Sooryavanshi) যা করে দেখালেন, তাকে স্রেফ ‘বিধ্বংসী’, ‘বিস্ফোরক’ বললেও হয়তো যথেষ্ট হবে না। চেন্নাই সুপার কিংসের (Chennai Super Kings) বিরুদ্ধে হাঁকালেন ১৭ বলে ৫২। ম্যাচ শেষ ৮ উইকেটে, হাতে তখনও ৮ ওভার বাকি।
প্রত্যাশিতভাবেই ম্যাচের সেরা। হাত তুলে নিলেন পুরস্কার। কিন্তু তার ফাঁকে যে কথাটি বললেন, তাকে ঘিরেই আপাতত ক্রিকেট দুনিয়ায় তোলপাড়। শুধু ব্যাট নয়, মাইক্রোফোন হাতেও যে বৈভব ‘নির্মম পেশাদার’ হয়ে উঠছেন, গতরাতের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণায় তা স্পষ্ট।
১৭ বলে ঝড়, ম্যাচ একতরফা
টার্গেট বড় ছিল না—১২৮। কিন্তু যেভাবে শুরু করলেন সূর্যবংশী, তাতে ম্যাচ অল্প সময়েই কার্যত একতরফা হয়ে যায়। চারটি চার, পাঁচটি বিশাল ছক্কা—বোলাররা অসহায়। কেউই ফাঁদে ফেলার কোনও সুযোগ পেলেন না। পাওয়ারপ্লেতেই খেলা মোটামুটি শেষ। ওপেনিংয়ে যশস্বী জয়সওয়ালের (Yashasvi Jaiswal) সঙ্গে বৈভবের বোঝাপড়া নজর কাড়ল। স্ট্রাইক রোটেশন, ফাঁকা জায়গা খোঁজা—সব কিছুতেই বিচক্ষণতার ছোঁয়া। সবচেয়ে বড় কথা, চাপের কোনও ছাপ নেই।
মুখের কথাতেও অকপট
মাঠে নেমে দুরন্ত পারফরম্যান্সের মতোই ম্যাচ শেষে সাক্ষাৎকারে সূর্যবংশীর বক্তব্য এখন চর্চার কেন্দ্রে। তিনি বলেন, ‘কোচরা আলাদা করে বলেনি যে বোলাররা আমাকে টার্গেট করবে। কিন্তু ওরা বাদে বাকি পৃথিবী বলছিল!’ এই এক লাইনে পরিষ্কার—বাইরের দুনিয়ার দ্বন্দ্বময় বাস্তব, প্রত্যাশার পাষাণভার—সব তাঁর জানা। কিন্তু সেসব মাথায় না নিয়ে নিজের খেলাতেই আপাতত ফোকাস রেখেছেন। কোচ কুমার সাঙ্গাকারা (Kumar Sangakkara) ও বিক্রম রাঠোরের (Vikram Rathore) বার্তাও সিধেসাধা—নিজের স্বাভাবিক ক্রিকেটটুকুই খেলো।
সমালোচকদের জবাব, কাইফের ইউ-টার্ন
এই ইনিংস শুধু রাজস্থানকে ম্যাচ জেতায়নি, বদলে দিয়েছে মতামতও। প্রাক্তন ক্রিকেটার মহম্মদ কাইফ (Mohammad Kaif) স্বীকার করেছেন, আগে তিনি ভেবেছিলেন সূর্যবংশীকে ‘অতিরিক্ত হাইপ’ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এখন তাঁর অবস্থান পাল্টেছে। টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকার পরিবর্তিত মত: এই ১৫ বছরের ছেলে এখন বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত!
পরিণত মানসিকতা, বড় মঞ্চের ইঙ্গিত
সূর্যবংশীর ইনিংসের সবচেয়ে বড় দিক—পরিকল্পনা। নিজেই জানালেন, লক্ষ্য ছিল পাওয়ারপ্লে নিয়ন্ত্রণ করা। শুরুতে উইকেট একটু মন্থর ছিল, কিন্তু বল পুরনো হওয়ার পর ভালভালে ব্যাটে আসতে থাকে—সেটাই কাজে লাগিয়েছেন মাত্র। শুধু ধুমধাড়াক্কা স্ট্রোকপ্লে নয়, পরিস্থিতি বুঝে খেলা—এই গুণ চলতি সিজনে বৈভবকে আলাদা করে তুলতে চলেছে। এর আগে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও (U19 World Cup) একই কারণে নজর কেড়েছিলেন। এবার আইপিএলে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে সমস্তিপুরের কিশোরের বার্তা পরিষ্কার—কোনও ‘ওয়ান-সিজন ওয়ান্ডার’, স্রেফ প্রতিশ্রুতিমান প্রতিভা নয়… ভারতীয় ক্রিকেট নতুন এক লম্বা রেসের ঘোড়ার অভিষেকের সাক্ষী থাকতে চলেছে।