অভিধা আর লক্ষণার চাইতে ব্যঞ্জনার জোর এখানেই যে, ব্যঞ্জনায় সবকিছু খোলাখুলি বলার দরকার হয় না। একটু আকার, সামান্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট… ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান।’… যাঁর বোঝার তিনি ঠিক সবকিছু বুঝে ফেলেন!

রোহিত শর্মা
শেষ আপডেট: 26 August 2025 11:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অভিধা আর লক্ষণার চাইতে ব্যঞ্জনার জোর এখানেই যে, ব্যঞ্জনায় সবকিছু খোলাখুলি বলার দরকার হয় না। একটু আকার, সামান্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট… ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান।’… যাঁর বোঝার তিনি ঠিক সবকিছু বুঝে ফেলেন!
নামেই প্যানেল ডিসকাশন। আসলে রোহিত শর্মার (Rohit Sharma) পেট থেকে আসল কথাটা বের করার সুসজ্জিত প্ল্যাটফর্ম! সেখানেই হাজির ছিলেন ভূতপূর্ব টেস্ট দলের অধিনায়ক। ক্রিকেটের ভূত-ভবিষ্যৎ, নিজের বেড়ে ওঠা, আগামী দিনের পরিকল্পনা সব এল ঠিকই। কিন্তু লক্ষ্মভেদী তির ছোড়া হল ‘অবসর-বিতর্ক’-কে (Rohit Sharma Retirement) তাক করে। ফাঁদে পা দিলেন না রোহিত। সোজাসুজি জবাব এল না ঠিকই। কিন্তু ঘুরিয়ে, ব্যঞ্জনার আশ্রয়ে যা কিছু জানালেন, তাতে স্পষ্ট ফিটনেস-ফ্যাটিগ, শারীরিক ক্লান্তি এসব কথার কথা। আসলে ‘মানসিকভাবে’ তিনি এতটাই ‘বিধ্বস্ত’ হয়ে পড়েছিলেন, যে লাল বলের ক্রিকেটকে বিদায় জানানো ছাড়া তাঁর হাতে আর উপায় ছিল না।
তিন মাস আগে টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন রোহিত শর্মা। সরবিবার অনুষ্ঠানে এসে খোলামেলাভাবে জানালেন, ফরম্যাটটির চাপ আসলে কেবল মাঠেই নয়—শরীরের সঙ্গে মানসিক শক্তিকেও চূড়ান্তভাবে নিঃশেষ করে দেয়। আর সেই কারণেই তাঁর অবসরের সিদ্ধান্ত এত তাড়াতাড়ি এসেছে। এটা বাইরের দুনিয়ার চোখে ‘অপ্রত্যাশিত’ হলেও তাঁর নিজের বিচারে যথেষ্ট ‘যুক্তিযুক্ত’!
৬৭ টেস্টে ৪৩০১ রান, গড় ৪০.৫৮। ভারতের হয়ে দীর্ঘ সময় ওয়ান ডাউনে নয়, ওপেনার হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু সিইএটি আয়োজিত আলোচনামঞ্চে রোহিত অহেতুক আবেগপ্রবণ নন, কাঠখোট্টা মুম্বইকরের মতোই বাস্তববাদী। ভাবালুতা ছেড়ে নির্মেদ ভঙ্গিতে বললেন, ‘টেস্ট ক্রিকেট মানে দীর্ঘস্থায়িত্ব। পাঁচ দিন টিকে থাকার লড়াই। মানসিকভাবে প্রচণ্ড কঠিন আর অনেক সময় ক্লান্তিকর!’
এই ধৈর্যের ভিত্তি কোথায় তৈরি হয়েছিল? মুম্বইয়ের ঘরোয়া ক্রিকেটে, এমনটাই জানালেন তিনি। বললেন, ‘আমাদের শহরে ক্লাব ম্যাচও দু’তিন দিন ধরে চলে। ছোট থেকেই শিখতে হয়, কীভাবে চাপের মধ্যে খেলতে হবে, কীভাবে লম্বা সময় মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। সেখান থেকেই লাল বলের ক্রিকেটে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা পেয়েছি!’
এখন বয়স ৩৮। ক্রিকেট-জীবনের প্রথম দিকে খেলার আনন্দই ছিল মূল চালিকাশক্তি। পরে বুঝেছেন প্রস্তুতির গুরুত্ব। তাঁর নিজের কথায়, ‘শুরুর সময় বুঝতাম না, প্রস্তুতির আসল মর্মটা ঠিক কী। তখন কেবল খেলাটা উপভোগ করতাম। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সিনিয়র খেলোয়াড়, কোচদের সংস্পর্শে এসে বুঝেছি, শৃঙ্খলা আসলে অনুশীলন থেকেই আসে। টেস্ট ক্রিকেটে তো সেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
বিশ্বকাপজয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক জোর দিয়ে জানালেন, ম্যাচের আগে যতটা সময় খরচ করা হয়, সেটাই আসল। তাঁর বিশ্লেষণে, ‘ম্যাচ শুরু হলে তখন আর প্রস্তুতি নেওয়া যায় না। তখন শুধু প্রতিক্রিয়া। চাপের সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, ব্যাট বা বল হাতে সঠিক পদক্ষেপ করা—এসবই ম্যাচ শুরুর আগে তৈরি হয়ে আসে। তাই প্রস্তুতিটাই সবকিছুর ভিত!’
শুধু শরীর নয়, মাথাকেও প্রস্তুত রাখা জরুরি বলে মনে করেন রোহিত। তাঁর মন্তব্য, ‘উচ্চস্তরে খেলতে গেলে মানসিক স্বচ্ছতা দরকার। দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখাই আসল। আর সেই স্বচ্ছতা আসে প্রস্তুতি থেকে!’
টেস্ট কেরিয়ারের বাঁকবদল ঘটে ২০১৯ সালে। তখন তাঁকে ওপেনিংয়ে তোলা হয়। সেই দায়িত্বে এসে রোহিত শর্মা ভারতের সর্বকালের অন্যতম ভরসাযোগ্য ওপেনার। বিশেষ করে দেশের মাটিতে।
টেস্ট থেকে অবসর নিলেও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে, তিন ফরম্যাটে একই রকম সাফল্যের নিরিখে রোহিত শর্মার জুড়ি মেলা ভার। তবুও স্বেচ্ছায় নয়, তাঁকেও সরে যেতে হয়েছে পর্দার আড়ালের অঙ্গুলিহেলনে। কারও নাম তিনি করেননি, কেউ সামনে এসেও জানাননি, কেন রোহিতকে সরে যেতে হল। না বোর্ড, না নির্বাচক—ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বেসর্বারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। যে কারণে চাপ চাপ ধোঁয়াশা আরও ঘন হয়েছে। ‘মানসিক ক্লান্তি’, ‘বিধ্বস্ত’—এই টুকরো শব্দ ও অনুষঙ্গগুলো সামনে টেনে জল্পনার ঘনত্ব আরও বাড়িয়ে তুললেন রোহিত নিজে!