সময়ের জাঁতাকলও একটা বড় ফ্যাক্টর। বয়সের কারণে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এক মরশুমে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 August 2025 13:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের জার্সিতে বিশ্বকাপ জিতেছেন। অধিনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক ময়দানে সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগীদের মুখোমুখি, চোখে চোখ রেখে লড়েছেন। সামলেছেন একের পর বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের। নেমেছেন কখনও লর্ডসে, কখনও মেলবোর্নে। স্টেডিয়াম হাজারো দর্শকের স্লোগানে কেঁপেছে। মুখরিত বন্দনায় শুনেছেন নিজেদের নাম!
সেখান থেকে সটান ঘরোয়া ক্রিকেটে। ফাঁকা গ্যালারি। তপ্ত দুপুর। আনকোরা খেলোয়াড়। নাম-না-জানা প্রতিপক্ষ। এমন দলের তিনি সাধারণ সদস্য মাত্র। এখানে রান করলে, উইকেট তুললে তা আন্তর্জাতিক রেকর্ড বুকে কোনও অঙ্ক জুড়বে না। তবু খেলতে হবে ফের ফিরে আসার জন্য। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। তিনি যে ফুরিয়ে যাননি, তার হাতেগরম হিসেব দিতে হবে বাইশ গজে। তবেই মিলবে দেশের জার্সি গায়ে গলানোর সু্যোগ। নয়তো প্রস্থানের সড়ক প্রস্তুত!
রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলির সামনে অগ্নিপরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত। তাঁদের জায়গা আর আগের মতো স্থির নয়। এবার হিসেব বদলে গিয়েছে। একটা কারণ বয়স। অন্যটা ফর্ম। দুটোই হাতছাড়া। নিজেদের হাতে নেই। কেরিয়ারের তুঙ্গ দেখেছেন দুজনেই। কেউ একা হাতে পাকিস্তান বাহিনীকে শাসন করেছেন, কেউ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ঠেঙিয়ে ডবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। কিন্তু এবার সময় পাল্টেছে। অঙ্কও। এখন নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে এমন ময়দানে, যেখানে একদা জার্নি শুরু হয়েছিল। কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে, যখন নাম-খ্যাতির পাহাড় পেরিয়ে এসেছেন, তখন যদি হঠাৎই শুনতে হয়—ফিরে আসতে হলে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতে হবে, যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে… ভেঙে বললে, রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিকে নামতে হবে বিজয় হাজারে ট্রফিতে—তখন খবরটা ক্রিকেটপ্রেমীদের অস্বস্তির খানিকটা বাড়িয়ে তোলে!
যদিও ভারতীয় ক্রিকেটে এমন নজির এই প্রথম নয়। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাই ধরা যাক। ২০০৫ সালে অধিনায়কত্ব হারিয়ে দলের বাইরে চলে যান। জাতীয় দলে ফেরার জন্য নামতে হয় ঘরোয়া ক্রিকেটে। রঞ্জি ও দলীপ ট্রফিতে রান বন্যা বইয়ে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন। ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা নির্বাচকদের তাঁকে ফের জায়গা দিতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে তুলে আনা যেতে পারে অধুনা টিম ইন্ডিয়ার হেড কোচ গৌতম গম্ভীরের নাম। ২০১০ সালের পর জাতীয় দলে জায়গা হারান। দিল্লির হয়ে রঞ্জি ট্রফি ও বিজয় হাজারেতে একাধিক ডবল সেঞ্চুরি ও ঝোড়ো ইনিংস খেলে ফের চর্চায় ফিরে আসেন। তারপর আগের মেজাজে ধরা না দিলেও সংশয়ীদের ভুল প্রমাণ করেছিলেন গম্ভীর।
এর আগে-পরে ইরফান পাঠান, সুরেশ রায়না কিংবা রবি শাস্ত্রী—অনেকেই চেষ্টা করেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটকে পাটাতন বানিয়ে দুর্দান্তভাবে ফিরে আসতে। কারও সাফল্য ছিল সাময়িক, কারও ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি অধরা রয়ে গিয়েছে। যে ক্রিকেটার আইসিসি ট্রফি জিতেছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে সেঞ্চুরি করেছেন, সেই খেলোয়াড়ের জন্য বিজয় হাজারে বা রঞ্জি ট্রফি কেবল আরেকটা টুর্নামেন্ট নয়—হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘রিয়ালিটি চেক’।
প্রথমত, পরিবেশ বদল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাঁচতারা হোটেল, চাটার্ড ফ্লাইট, গর্জনে কম্পমান গ্যালারি—সবই অভ্যস্ত জীবনের অংশ। ঘরোয়া ক্রিকেটে তা নেই। হোটেল মাঝারি মানের, যাতায়াত সাধারণ বাসে, দর্শক হাতেগোনা। নামতে হয় প্রায় নীরব ময়দানে!
দ্বিতীয়ত, সম্পর্কের সমীকরণ বদল। যেসব তরুণ এখন ড্রেসিংরুম শেয়ার করবে, তাদের অনেকের বয়সই বিরাট বা রোহিতের অভিষেকের সময় ছিল দশ কি বারো। এদের কাছে দুই তারকা কিংবদন্তি, কিন্তু মাঠে সমগোত্রের সতীর্থ। সম্পর্কের এই বিন্যাস মেনে নেওয়া যথেষ্ট সমস্যার।
এ ছাড়া রয়েছে প্রত্যাশার চাপ। ঘরোয়া হোক বা আন্তর্জাতিক—দুই ময়দানেই রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির থেকে অনুরাগীরা চায় সেঞ্চুরি। ৫০ রান করলেও সমালোচনা শুনতে হবে। কারণ শতরানই তাঁদের নিয়ে গগনচুম্বী প্রত্যাশার ন্যূনতম মানদণ্ড।
সময়ের জাঁতাকলও একটা বড় ফ্যাক্টর। বয়সের কারণে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এক মরশুমে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে।
তা ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটে বাইশ গজের বাস্তবতাও বেশ আলাদা। বিজয় হাজারে বা রঞ্জির উইকেট আন্তর্জাতিক পিচের চেয়ে ভিন্ন। অনেক সময় ধীরগতির, স্পিন-সহায়ক বা রিভার্স সুইং-প্রবণ উইকেট বানানো হয়। তার জন্য ব্যাটিং স্ট্রোকপ্লে বদলানো জরুরি। ইনিংস গড়তে হয় ধৈর্য ধরে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ত সূচিতে সংযমের পরীক্ষা কম। এখানে তা প্রতি ম্যাচেই প্রয়োজন।
৩৭–৩৮ পেরিয়ে ফিটনেস বজায় রাখা কঠিন। ব্যাটের গতি, রিফ্লেক্স, চোখ-হাতের সমন্বয়—সবই ধীরে ধীরে বদলে যায়, রং ফিকে হতে থাকে। এই বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেটে লাগাতার পারফর্ম করা মানে শরীর ও মনের উপর দ্বিগুণ চাপ। রো-কো জুটি কি পারবেন সেই চাপ সামাল দিতে?
ভারতীয় ক্রিকেটের অতীত বলছে, নির্বাচকরা মুখে একরকম বললেও, ঘরোয়া পারফরম্যান্স সবসময় দল বাছাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। কখনও তরুণ প্রতিভাকে জায়গা দিতে, কখনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে সিনিয়রদের ফেরানো হয় না, এমনকি তাঁরা রান করলেও ব্রাত্য রয়ে যান। ফলে রোহিত-বিরাটের জন্য বিজয় হাজারে সফলতা নির্বাচন নিশ্চিত না করে সুযোগের দরজার একটা পাল্লা কিছুটা খোলা রাখবে মাত্র।