রিঙ্কু, পন্থ, দুবে—এই তিনজনকে কেন্দ্র করে নতুন লেট-ওভার স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে হবে। নয়তো রায়পুরের হাহাকার প্রকট হয়ে উঠবে—‘৩৫৯–ও যথেষ্ট নয় কেন?’

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 December 2025 16:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাঁচিতে ৩৪৯, রায়পুরে ৩৫৯—দুই ম্যাচেই টিম ইন্ডিয়ার টপ অর্ডার রানের পাহাড় তুলেছে। কিন্তু শেষ দিকে? একই ছবি। ইনিংসের গতি কমে যাচ্ছে, দম ধরে রাখা যাচ্ছে না আর দক্ষিণ আফ্রিকা সহজেই ম্যাচে ফিরে আসছে।
ভারতের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এটা নতুন নয়। বহুদিন ধরেই শেষ ১০ ওভারের (death overs) সমস্যা দেখা দিচ্ছে। হার্দিক পান্ডিয়া (Hardik Pandya) নেই, অক্ষর প্যাটেল (Axar Patel) বিশ্রামে, ওয়াশিংটন সুন্দর (Washington Sundar) ও রবীন্দ্র জাডেজা (Ravindra Jadeja) ছন্দহীন—ফলে ‘ফিনিশার’শব্দটাই যেন খেই হারিয়েছে।
রায়পুরে ৩৯তম ওভারে ভারতের স্কোর ছিল ২৮৪/৩। সেখান থেকে মাত্র ৭৪ রান যোগ হয়। শেষ পাঁচ ওভারে ৪১। এই ধীরগতি আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে তখন, যখন শিশিরে বোলারদের হাত পিচ্ছিল আর ব্যাটিং আরও সহজ!
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা আরও তীব্র—শেষ দিকে কে ব্যাটিং সামলাবেন? কার উপর ভরসা রাখবে গৌতম গম্ভীরের টিম ম্যানেজমেন্ট?
ভারতের সম্ভাব্য ফিনিশারদের তালিকায় পাঁচটি নাম স্পষ্ট—রিঙ্কু সিং (Rinku Singh), ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant), শিবম দুবে (Shivam Dube), অক্ষর প্যাটেল (Axar Patel) এবং রিয়ান পরাগ (Riyan Parag)। দেখে নেওয়া যাক, কোন নাম দলের চাহিদার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই।
রিঙ্কু সিং: চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথা
রিঙ্কু এখন ভারতের টি–২০ দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফিনিশার। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, শান্ত মাথায় শট বেছে নেন, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেন আর প্রয়োজনে ছক্কা মারেন। তাঁর অভিজ্ঞতা যদিও মাত্র দুই ম্যাচ। তবু ১৩৪–র স্ট্রাইক রেট তুলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি হতে পারেন অন্যতম সংযোজন। বিশেষত, শেষ দিকে বাউন্ডারি খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা রিঙ্কুকে এগিয়ে রাখবে।
ঋষভ পন্থ: ‘ডিসরাপ্টর’
ঋষভ পন্থের মতো ক্রিকেটার বিরল। অনিশ্চয়তা, বিশৃঙ্খলা—এই সবের মধ্যেই তিনি নিজের সেরা ব্যাটিংটা মেলে ধরেন। তাঁর ওয়ানডে গড় ৩৩+, স্ট্রাইক রেট ১০৬-এরও বেশি। মাঠে নামলে ম্যাচের গতি বদলে যায়। বড় শট, রিভার্স, ইনোভেশন—সবই রক্তে মিশে। প্রশ্ন একটাই: জায়গা কোথায়? যদি কেএল রাহুল (KL Rahul) কিপিং চালিয়ে যান, তাহলে পন্থকে ব্যাটার হিসেবেই খেলাতে হবে। সেক্ষেত্রে ফিনিশিং সমস্যা মিটে যেতে পারে।
শিবম দুবে: নির্মম পাওয়ার হিটার
দুবে ভারতের সেরা ‘ক্লিন হিটার’-দের একজন। আইপিএলে তিন মরশুম ধরে ১৫০+ স্ট্রাইক রেট। স্পিনারদের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী, আবার পেসারদের বাউন্ডারি–লাইনে পাঠানোর ক্ষমতাও জোরালো। ওয়ানডেতে এই শক্তিটাই দরকার—২০ বলে ৩৫–৪০ রান, যা ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারে। তবে দুবের সীমাবদ্ধতা—স্পিন ছাড়া বাকি সব বোলিংয়ের সামনে একইরকম স্বচ্ছন্দ নন। শরীরী ভাষাও কখনও কখনও ধীর মনে হয়। তবুও, পাওয়ার–হিটিংয়ের সুবাদে তিনি বড় প্রার্থী।
অক্ষর প্যাটেল: বৈচিত্র্যময় শট–রেঞ্জ
অক্ষরের ওয়ানডে রেকর্ড খুব একটা তাক লাগায় না—গড় ২৩, স্ট্রাইক রেট ৯২। কিন্তু এই সংখ্যা আজকের জমানার অক্ষরকে পুরোটা বোঝায় না। ২০২৫ আইপিএলে ১৫৭-র স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন। চাপের মুহূর্তে ম্যাচ শেষ করে আসার উদাহরণও কম নেই। বাঁ–হাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে ডান–হাতি বোলারদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী। ফিনিশার হিসেবে নয়, বরং সাপোর্ট–ফিনিশার হিসেবে অক্ষর অনেক বেশি কার্যকর।
রিয়ান পরাগ: আগামী দিনের বিনিয়োগ
পরাগ (Riyan Parag) ভারতের সবচেয়ে উন্নতিশীল ও উদ্যমী তরুণ ব্যাটারদের একজন। গড় ৪১+, স্ট্রাইক রেট ১০৪—শেষ দিকে ব্যাটিং করার জন্য আদর্শ। ইদানীং শটের রেঞ্জ বাড়িয়েছেন, ম্যাচ বোঝার ক্ষমতাও ক্ষুরধার হয়েছে। দরকারে অফ–স্পিন করেন, যা দলে ভারসাম্য জোগাতে পারে। রিয়ান এখনও একদিনের ক্রিকেটে কাঁচা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সেরা ফিনিশারদের একজন হয়ে উঠতে পারেন।
তাহলে সেরা অপশন কে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য—রিঙ্কু সিংহ ও ঋষভ পন্থ। রিঙ্কুর ঠান্ডা মাথা ও ঋষভের আগ্রাসন জুটি হিসেবে ভয়ঙ্কর! দুবেও বড় রোল নেওয়ার যোগ্য। বিশেষত, যখন পাটা পিচে ম্যাচ হচ্ছে। অক্ষর ও পরাগ মূলত সাপোর্ট–ফিনিশার—ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যেতে বা ধরে রাখতে পারেন।
ভারতের সমস্যার সারমর্ম
টপ অর্ডার ৬০–৭০% কাজ করে দিচ্ছে, কিন্তু শেষ ১০ ওভারে ধারাবাহিক স্কোরার নেই। কুয়াশা, দ্রুত আউটফিল্ড, ছোট বাউন্ডারির ফলে শেষ দিকে ৮–৯ রানের রেট স্বাভাবিক। ভারত তা ছুঁতে পারছে না। এখনই সময় ফিনিশারের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার। রিঙ্কু, পন্থ, দুবে—এই তিনজনকে কেন্দ্র করে নতুন লেট-ওভার স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে হবে। নয়তো রায়পুরের হাহাকার প্রকট হয়ে উঠবে—‘৩৫৯–ও যথেষ্ট নয় কেন?’