দেশের অন্যতম ধারাবাহিক পেসার মাঠে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন, অথচ জাতীয় দলে তাঁর জায়গা নেই—এই বাস্তবতাই এখন নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

মহম্মদ সিরাজ
শেষ আপডেট: 5 December 2025 13:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলের সবচেয়ে ইন ফর্ম খেলোয়াড়। শুভমান ব্যাট হাতে দুরন্ত ছন্দে ছিলেন ঠিকই। কিন্তু সিরাজ যদি পাঁচখানা টেস্টে প্রায় একই ধারাবাহিকতা না দেখাতেন, টিম ইন্ডিয়া যে সিরিজ ড্র করে দেশে ফিরত না—একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়!
অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ফিট থাকা সত্ত্বেও সিরাজকে নিয়ে অদ্ভুত ধাঁধার খেলা শুরু করেছে বিসিসিআই৷ তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা। এমন নয়, যে রিহ্যাবে রয়েছেন। অথবা বিশ্রামে। দিব্যি সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে হাত ঘোরাচ্ছেন, উইকেট নিচ্ছেন৷ অথচ কী অদ্ভুতভাবে দেশের মাটিতেই চলতি দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে মহম্মদ সিরাজকে স্কোয়াডে রাখেনি বিসিসিআই!
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন ওপেনার ও ধারাভাষ্যকার আকাশ চোপড়া (Aakash Chopra)। তাঁর সওয়াল—‘সিরাজকে কীভাবে ও কোন যুক্তিতে এক-ফরম্যাট বোলার বানিয়ে দেওয়া হল?’
চোপড়ার বক্তব্য, ভারতের অন্যতম অভিজ্ঞ পেসারকে নিয়ে বোর্ডের এই পদক্ষেপ মোটেই বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, ‘মহম্মদ সিরাজকে আমরা কোথায় দেখছি? শুধু টেস্টে! কেন? তাঁকে এক-ফরম্যাট বোলার করে দেওয়া হল কবে থেকে? আমি বুঝতেই পারছি না!’
প্রাক্তন ভারতীয় ওপেনারের পর্যবেক্ষণ—নির্বাচকরা অদ্ভুতভাবে সিরাজকে সাদা বলের ক্রিকেট থেকে সরিয়ে রেখেছেন। অথচ তথ্য বলছে, ওয়ানডে ইকোনমি ৫.১৭ সমেত গত দু’বছরে ভারতের সবচেয়ে ধারাবাহিক লিমিটেড-ওভার বোলারদের অন্যতম তিনিই! বিশেষ করে, ২০২৩ এশিয়া কাপ ফাইনালে (Asia Cup final 2023) সিরাজের ৬ ওভারে ৬.২ রানে ৬ উইকেট নিয়ে এখনও চর্চা চলে!
টিম ইন্ডিয়ার সিমার ছিলেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ‘নন-ট্রাভেলিং সাবস্টিটিউট’। দক্ষিণ আফ্রিকার চলতি তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও তাঁকে রাখা হয়নি। টেস্টে দেশের প্রধান ভরসা হয়েও সাদা বলের সেট আপে জায়গা নেই। এই নিয়ে চোপড়ার বক্তব্য, ‘অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজে খেলেছিল। খুব একটা উইকেট না পেলেও ৪ থেকে ৬ ইকোনমিতে বল করে। তবু কেন তাকে দল থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হল? কোনও ব্যাখ্যাই মিলছে না।’
চলতি সিরিজে ভারতের বোলিং ব্যর্থতা আরও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সিরাজের প্রয়োজনীয়তা! রাঁচিতে ৩৪৯ রান ডিফেন্ড করতে করতে নাকানিচোবানি খেয়েছেন রাহুলরা। রায়পুরে ৩৫৯ রান করেও পরাজয়। শিশিরের কারণে স্লিপারি বল, অনভিজ্ঞ পেস আক্রমণ—সব মিলিয়ে টিম ইন্ডিয়ার পরিস্থিতি করুণ। ঠিক এই প্রেক্ষিতে চোপড়ার প্রশ্ন—‘সিরাজ থাকলে কি ছবিটা বদলাতে পারত না?’
সামগ্রিকভাবে ভারতীয় দলের সাম্প্রতিক রোটেশন নীতিও প্রশ্নের মুখে। হর্ষিত রানা, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, অর্শদীপ—তরুণদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কঠিন ম্যাচ পরিস্থিতিতে তাঁরা এখনও ভরসার মুখ নন। অন্যদিকে, বুমরাহ নিয়মিত বিশ্রামে। ফলে সিরাজকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখা অস্বাভাবিক তো বটেই!
চোপড়া আরও বলেন, ‘চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সিরাজ ছিলেন না। তখনই আমরা হতাশ হয়েছিলাম। দুই বছর আগেই তিনি ছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। এখন হঠাৎ করে উধাও!’
পরিসংখ্যানও বলছে, আকাশের বক্তব্য ভুল নয়। সিরাজ ওয়ানডে–তে ৪৭ ম্যাচে ৭৩ উইকেট নিয়েছেন। বোলিং গড় ও ইকোনমি দুটোর নিরিখেই টিম ইন্ডিয়ার পেসারদের মধ্যে অন্যতম সেরা। লেট-সুইং, হিট-দ্য-ডেক বৈশিষ্ট্য আর নতুন বলে ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে সিরাজ ‘অটোমেটিক চয়েস’ হওয়া উচিত।
কিছু সূত্রের মতে, তরুণ পেসারদের আরও ম্যাচ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সিরাজ ও বুমরাহকে বিশ্রাম। কিন্তু চোপড়ার পাল্টা প্রশ্ন—‘বিশ্রাম বা রোটেশন ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে, কাউকে পুরোপুরি ওয়ানডে–টি২০–র বাইরে রাখাটা কোন ধরনের যুক্তি?’ বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। কারণ সিরিজের নির্ণায়ক ম্যাচের আগে (৬ ডিসেম্বর, বিশাখাপত্তনম) ভারতের বোলিং–আক্রমণক কোণঠাসা। সিনিয়র পেসার ছাড়াই টিম ইন্ডিয়া কি চাপ সামলাতে পারবে?
চোপড়া মনে করিয়ে দিয়েছেন—সিরাজ শুধু টেস্ট স্পেশালিস্ট নন। তিনি তিন ফরম্যাট–উপযোগী বোলার, যিনি লাল–সাদা দুই বলেই ভারসাম্য আনতে পারেন। তাঁর মতে, এমন সিমার সীমিত–ওভারের ক্রিকেটে জায়গা না পেলে তা ভারতেরই ক্ষতি।
দেশের অন্যতম ধারাবাহিক পেসার মাঠে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন, অথচ জাতীয় দলে তাঁর জায়গা নেই—এই বাস্তবতাই এখন নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ভারতীয় ক্রিকেটের ব্যস্ত ২০২৬–২৭ ক্যালেন্ডারে (ICC tournaments) সিরাজকে কার্যকরভাবে ব্যবহার না করা হলে এর মূল্য চোকাতেই হবে—এমন সতর্কবার্তা এখন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।