পূজারার বিদায়ও স্বভাবোচিত নিঃশব্দ। বিদায়ী ম্যাচ নয়, গার্ড অফ অনার নয়। একটি মিতায়তন বিবৃতি। তারপর নীরবতা।

চেতেশ্বর পূজারা
শেষ আপডেট: 25 August 2025 13:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চেতেশ্বর পূজারা সরে দাঁড়ালেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দশ হাজারের বেশি রান, টেস্টে সাত হাজার ছুঁইছুঁই। তবু তাঁর কেরিয়ারের আখ্যান কেবল সংখ্যার ইস্তেহার, পরিসংখ্যানের পঞ্জি নয়। এ এক শান্ত যোদ্ধার দীর্ঘ, অক্লান্ত লড়াই। যিনি ধেয়ে আসা বাউন্সার সামলাতে শরীরকে সামনে ঠেলতেও দু’বার ভাবেননি, সমালোচনার জবাবও দিয়েছেন ব্যাট হাতে, মাইক্রোফোনে নয়!
আধুনিক ক্রিকেট, যেখানে আক্রমণ আর গ্ল্যামারই শেষ কথা বলে, সেই স্রোতের আবর্তে পূজারা সংযমের সাবেকি পাঠ আর ধৈর্যের বার্তা নিয়ে বাইশ গজে এক দশক ধরে খেলেছেন। অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁকেই ঠেলে দেওয়া হল অবসরের প্রান্তে। ‘ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন পূজারা’—বক্তব্যটিতে কতখানি স্বাধীন সিদ্ধান্ত, কতটা নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা নিয়ে দানা বেঁধেছে প্রশ্ন। পালটা জল্পনা ধেয়ে এসেছে: বোর্ড, প্রকারান্তরে নির্বাচকরাই কি রাহুল দ্রাবিড়ের যোগ্য উত্তরসূরীকে প্রস্থানের পথে ঠেলে দিলেন?
বিতর্কের সূত্রপাত ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর হার দিয়ে শেষ করল টিম ইন্ডিয়া। কেপটাউন ম্যাচের পর সমালোচনার তির এসে বিঁধল পূজারাকে। শ্রীলঙ্কা সিরিজে ফেরার আশায় ছিলেন। কিন্তু নির্বাচকমণ্ডলী সাফ জানাল: দরজা আপাতত বন্ধ, খোলার তেমন সুযোগ নেই। ফেব্রুয়ারিতে চেতন শর্মার বার্তা: ‘রঞ্জি খেলো, আবার আসবে সুযোগ!’ সান্ত্বনার মতো শোনাল। বাস্তবে রুদ্ধ দুয়ারে একটা পাল্লাও খুলল না। পূজারা ঘরোয়া ক্রিকেট খেললেন, কাউন্টিতেও ছন্দে ফিরলেন। শতক এল, দীর্ঘ ইনিংস গড়লেন স্বভাবসিদ্ধ কায়দায়—আভিজাত্য আর আত্মবিশ্বাসের সুরে। তবু ভারতীয় টেস্ট দলে তিনি ব্রাত্যই রইলেন।
২০২৩-এর শুরুতে খানিক আশার আলো। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দলে তিনি। যেন ইঙ্গিত—পরিকল্পনা থেকে পুরোপুরি বাদ পড়েননি, রোড ম্যাপ থেকে ছিটকে যাননি। কিন্তু ওভালে নেমে দুই ইনিংসে এল ১৪ আর ২৭ রান। ভারত হারল। সমালোচনার কেন্দ্রে ফের ব্যাটিং অর্ডার। তর্জনি উঠল পূজারার দিকেও। তারপর ঘোষণা হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দল। সেখানে খানিক প্রত্যাশিতভাবেই বাদ পড়লেন পূজারা। ৯৮ টেস্টের অভিজ্ঞতা নয়, সাম্প্রতিক ফর্মকেই মানদণ্ড বেছে নিল বোর্ড। বার্তা স্পষ্ট: ‘এখন তোমাকে চাই না!’ পূজারা জনসমক্ষে কিছু বললেন না। কিন্তু জবাব দিলেন ব্যাটে, ঘরোয়া ক্রিকেটে।
পরের বছর বর্ডার–গাভাসকর ট্রফি। অস্ট্রেলিয়া বরাবরই পছন্দের ময়দান। সেখানে পূজারার অনুপস্থিতি বিস্ময় বাড়াল। প্রাক্তন নির্বাচক এমএসকে প্রসাদের তরফ থেকে প্রশ্ন উঠল: দু’টি শতক করেছেন রঞ্জিতে, ঝুলিতে ভরপুর অভিজ্ঞতা, চাপের মুহূর্তে হাল ধরতে সিদ্ধহস্ত যিনি, তাঁকে এভাবে বাদ দেওয়া কি ঠিক হল? বিতর্কের আঁচ বাড়ল। অনেকেই নির্বাচকদের মুণ্ডপাত করলেন। তবু সিদ্ধান্ত পালটাল না। বঞ্চনার ছায়া আরও প্রলম্বিত হল। ক্রুদ্ধ জিজ্ঞাসা: এমন একজন, যিনি বিদেশে জিততে শিখিয়েছেন, চাপের দিনে সাজঘরের ভরসা হয়ে উঠেছেন, তাঁকে কি কেবল স্ট্রাইক রেটের চোখে দেখা উচিত? পূজারা কি সত্যি নতুন প্রজন্মের গতির দুনিয়ায় বদলে যাওয়া দর্শনের অচল অধ্যায়? জবাব হয়তো নির্বাচকদের নোটবুকে লেখা। ইতিহাসে বলবে—পূজারা শুধু বোলারদের বিপক্ষে খেলেননি, লড়েছেন বদলে যাওয়া ক্রিকেট-ভাবনার বিরুদ্ধেও।
এতকিছুর আবর্তে পায়ে পায়ে ২০২৫। আঘাত এবার চূড়ান্ত। বছরের শুরুতে স্ত্রী-র আত্মজীবনীতে দাবি—একজন জাতীয় দলের সদস্য নাকি একদা ফোনে জানিয়েছেন: পূজারাকে বাদ দেওয়া উচিত! কে তিনি? নিরুত্তর পূজা। নির্বাচনের প্রশ্ন তখন ব্যক্তিগত বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল। পূজারা নীরব রইলেন। মাঠে পরিশ্রম করে গেলেন। এপ্রিলে দলীপ ট্রফির স্কোয়াডে পশ্চিমাঞ্চলের দল ঘোষণাতেও তাঁর নাম নেই। অর্থ একটাই—ফিরে আসার সব দরজা এবার বন্ধ।
পুরো পথচলায় কোনওদিন শব্দের কৌশলে জেতার চেষ্টা করেননি। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়ে ভেসেও যাননি। রঞ্জির রুক্ষ পিচে, কাউন্টির গ্রিন টপে বারবার প্রমাণ দিয়েছেন। পূজারা ব্যাটিংয়ে সাবেকি, চিন্তাধারাতেও আবহমান সহবতের দীক্ষা মেনে চলেছেন। বিশ্বাস ছিল—মুখ নয়, রানই শেষ কথা বলবে। কিন্তু সময়ের নতুন ব্যাকরণের কানুন আলাদা। ক্রিকেট আজ আলো-ছায়ার মিশেলে গড়ে ওঠা বিনোদনের মঞ্চ। ধৈর্য, একেকটা বল বাঁচিয়ে খেলার কারিগরি—এগুলো যেন প্রদর্শনীতে সাজানো পুরনো যন্ত্র। দৃষ্টিননন্দন, কিন্তু অকেজো। পূজারা সেই সবকিছুর শেষ প্রতিনিধি। নিজস্বতায় অটল, বিশ্বাসে স্থিতধী… কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণে আপোসে নারাজ।
তাঁর বিদায়ও স্বভাবোচিতভাবে নিঃশব্দ। বিদায়ী ম্যাচ নয়, গার্ড অফ অনার নয়। একটি মিতায়তন বিবৃতি। তারপর নীরবতা। অথচ এই মানুষটাই ২০২১-এর গাব্বায় শরীরকে ঢাল করে দাঁড়িয়েছিলেন। ১১ বার বল লেগেছে শরীরে, তিনি টলেননি। সেই সহ্যশক্তি ভারতকে এনে দেয় অস্ট্রেলিয়ার দুর্গভাঙা দিন। এই স্মৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন পূজারার নাম টেস্ট ক্রিকেটের সাহস আর সংযমের পাঠ হিসেবে উচ্চারিত হবে। এই গল্প তাই পরিসংখ্যানের নয়, ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর প্রতিরোধের। একদিন নবীন প্রজন্ম যখন ‘দ্রুত’র বদলে ‘দৈর্ঘে’র পাঠ শিখতে চাইবে, তাঁদের তাকাতে হবে পূজারার দিকে। গাব্বার শরীরী ইনিংস, যেখানে গায়ে কালশিটে পড়েছে, সেই ছবি নীরব হয়েও একটা বার্তা পৌঁছে দেয়—সব যুগেই কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা নিজেকে বদলান না। কারণ, তাঁরা জানেন—নিজস্বতা ধরে রাখাই সময়কে বদলানোর প্রথম শর্ত।