আসলে কিছু খবর আমাদের স্মৃতিমেদুর করে। ‘এটাই ভবিতব্য’, ‘সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত’ জেনেও মেনে নিতে কষ্ট হয়। মনের অবুঝ কোণ থেকে একটা মাথাঝাঁকানি প্রতিবাদ ধেয়ে আসে। কিছু সংবাদ নিছক খবর নয়, বিষ্ণু দে-র ভাষায় ‘মূলত কাব্য’ হয়ে ওঠে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 August 2025 16:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চেতেশ্বর পূজারা ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন।
খবরটা বিচলিত করে দেওয়ার মতো নয় যদিও। দীর্ঘদিন ধরে দলের বাইরে। ঘরোয়া ক্রিকেটে নেমেছেন, রান তুলেছেন, কিন্তু আহামরি এমন কিছু করে দেখাননি, যাকে কেন্দ্র করে বছর সাঁইত্রিশের এক ব্যাটারের কামব্যাক সংক্রান্ত পাতাভরানো প্রতিবেদন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগভারাতুর পোস্ট হতে পারে।
আসলে কিছু খবর আমাদের স্মৃতিমেদুর করে। ‘এটাই ভবিতব্য’, ‘সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত’ জেনেও মেনে নিতে কষ্ট হয়। মনের অবুঝ কোণ থেকে একটা মাথাঝাঁকানি প্রতিবাদ ধেয়ে আসে। কিছু সংবাদ নিছক খবর নয়, বিষ্ণু দে-র ভাষায় ‘মূলত কাব্য’ হয়ে ওঠে।
চেতেশ্বর পূজারার নিষ্ক্রমণ কাব্যিক নয়। তাতে অশ্রু নেই, বেদনার আভাষ নেই, বিতর্কের ঝাঁজ নেই। সতীর্থদের কাঁধে চড়ে মাঠ পরিক্রমণ, সমর্থকদের অভিবাদন, স্মারক-স্বীকৃতি লাভ… কিচ্ছুটি নেই। কর্মহীন দিনে, রবিবার, যখন সবাই স্নান-খাওয়ার তোড়জোর করছে, তখন হাল্কা গ্ল্যান্সের কায়দায় অবসরের সংবাদটুকু বাড়িয়ে দিলেন পূজারা। স্বভাবোচিত কায়দায়। ঠিক যেভাবে বাইশ গজে লড়তেন এক নিস্তব্ধ মহিমায়, সেভাবেই ক্রিকেটকে আলবিদা জানালেন। এমন অনুচ্চকিত প্রস্থান কোনও বড়মাপের প্রশ্ন কিংবা বিতর্কের ইন্ধন দিল না। শুধু স্মৃতিচারণার একটা বন্ধ দুয়ার খুলে দিল মাত্র!
রাহুল দ্রাবিড় যখন বিদায় নিলেন, একটা সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছিল—কে হবেন ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের নতুন নোঙর? তখনকার দুনিয়া উন্মত্ত টি-টোয়েন্টির ঝড়ে ভেসে যাচ্ছে। ব্যাটাররা শিখছে পুল, সুইচ হিট, স্কুপ। কিন্তু সেই সময়েই রাজকোট থেকে উঠে এলেন এক শান্ত মুখ। চেতেশ্বর পূজারা। ক্রিকেটের দ্রুতগতির হাইওয়েতে তিনি হাঁটলেন ধীরপায়ে। এবং ভারতীয় ব্যাটিংয়ের ‘দ্য ওয়ালে’র যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠলেন।
আজ, পূজারার বিদায়, যেন শুধু একজন ক্রিকেটারের অবসর নয়, এক দর্শনের অবসান। যে দর্শন বলে: ক্রিকেট মানে ধৈর্য, ক্লাসিক ব্যাটিং, প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করা। পুজারা সেই শেষ যোদ্ধা, যিনি আধুনিকতার ঝড়ের বিরুদ্ধে গত এক দশক ধরে লড়ে গেলেন।
২০১০ সালের অক্টোবর। বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অভিষেক। ২২ বছরের তরুণ, ঝকঝকে চোখে স্বপ্ন নিয়ে নামলেন তিন নম্বরে। চাপ? প্রচণ্ড। কারণ ওই জায়গাটা কয়েক মাস আগেও ছিল দ্রাবিড়ের দখলে। অভিষেক ইনিংসে ৭২ রানের ঝলক। এক ইনিংসেই সবাই একমত: ‘দ্য ওয়ালের যোগ্য উত্তরসূরি এসে গিয়েছে!’
ওয়ান ডাউন চিরস্থায়ী সিংহাসন রইল না যদিও। পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে নেমে গেলেন চার নম্বরে। ২০১২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে রাজকোটের ছেলে তুলে নিলেন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি—১৫৯ রান। সেই ইনিংসের পর ভারতীয় ক্রিকেট বুঝল: পূজারা কেবল বিকল্প নন, ভবিষ্যতের স্তম্ভ।
তাঁর কেরিয়ারের পরিসংখ্যান যেন নিজেই ইতিহাস। ১০৩ টেস্টে ৭ হাজারের উপর রান। গড়: ৪৩.৬০, সেঞ্চুরি: ১৯, ডাবল সেঞ্চুরি: ৩। সর্বোচ্চ রান: ২০৬* (অস্ট্রেলিয়া, আহমেদাবাদ, ২০১২)। অবাক করা ব্যাপার, টেস্ট কেরিয়ারের প্রথম কয়েক বছরে তাঁর একটিও ছক্কা নেই! কারণ, পূজারা খেলতেন কপিবুক ক্রিকেট। ডিফেন্স, লিভ, পেশেন্স। যে শব্দগুলো আজ প্রায় উধাও।
রবিবারের বিকেলে যখন পুজারার নাম নেওয়া হবে, সবার আগে মনে জাগবে সেই সিরিজ। বিরাট কোহলির নেতৃত্বে ভারত অস্ট্রেলিয়া সফরে। টেস্ট সিরিজ জয়ের কাজটা ছিল কঠিন, কারণ ৭০ বছরের ইতিহাসে ভারত কখনও ক্যাঙারুদের ঘরের মাঠে হারায়নি। সেই মিশনে অধিনায়ক কোহলিকে ছাপিয়ে নায়ক হয়ে উঠলেন পুজারা। নায়কত্ব অর্জন করলেন, কিন্তু নীরবে।
অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্টে। পুরো ব্যাটিং লাইন আপ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু পুজারার অবিচল ১২৩ রান ভারতকে ম্যাচ জিতিয়ে দেয়। মেলবোর্ন ম্যাচে ফের সেঞ্চুরি, এবার ১০৬। ভারত আবার জিতল। সিডনিতে ১৯৩ রান। সেই ইনিংস ছিল সংযমের চূড়ান্ত উদাহরণ। শট খেলে নয়, শট না খেলে জয় এনে দেন পূজারা।
সিরিজে রান—৫২১, গড় ৭৪। তিনটি সেঞ্চুরি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ভারত ইতিহাস লিখল—অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়। আর অমর হয়ে রইল একটাই ছবি—পূজারার শরীরে বলের ক্ষতচিহ্ন, বারবার হেলমেট খুলে উপরে তাকানো… আর চোখ-ঠিকরানো একরাশ জেদ।
এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি। স্টিভ স্মিথের অস্ট্রেলিয়া, ধোনির ঘরের মাঠ রাঁচি। প্রথম ইনিংসে ভারত পিছিয়ে। তারপর এল সেই ইনিংস—পূজারার মহাকাব্যিক দ্বিশতরান। ৫২৫ বলের ম্যারাথন। উঠতে শুরু করেন গুঞ্জন—‘পূজারা শুধু অজিদের নয়, সময়কে থামিয়ে দিয়েছেন!’
শুধু রান করেননি। পূজারা শিখিয়েছেন—মানসিক শক্তি কেন ও কীভাবে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। বাউন্সার লাগছে, কিন্তু হেলমেট খুলে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। ২০১৮-১৯ সিরিজে তাঁর শরীরে কতবার বল লেগেছিল? ৫৪ বার। কিন্তু সেবার একটিও হেলমেট খুলে সরে যাওয়ার দৃশ্য নেই। কোচ শাস্ত্রী বলেছিলেন, ‘পুজারা ছাড়া সেই লড়াই আমরা জিততে পারতাম না!’ ভুল নয়। নয় অতিরঞ্জনও। কোহলির মন্তব্য, ‘পূজারা ছিল আমাদের আঠা। টিমকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছিল!’ বুঝিয়ে দেয় তাঁর অপরিহার্যতা।
সময়ের সঙ্গে ক্রিকেট বদলেছে। স্ট্রাইক রেটের তত্ত্ব সমস্ত ফর্ম্যাটে ঢুকে গেল। দলে জায়গা পেলেন আগ্রাসী ব্যাটাররা—গিল, পন্থ, জয়সওয়াল। পূজারা নিজের ধাঁচে অটল। সুযোগ কমল। কিন্তু পূজারা স্বভাব পাল্টালেন না। ২০২২ সালে এজবাস্টনে শেষবারের মতো খেললেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তার পর থেকে ভারতীয় দলে আর ডাক নেই। পুজারা কাউন্টি খেললেন, সাসেক্সের হয়ে পাহাড়প্রতিম রান করলেন। তবু জাতীয় দলে ফেরা হল না। অবশেষে এল খবর: বিদায় নিচ্ছেন চেতেশ্বর পুজারা। আজ, ঘোষণার দিনে বললেন— ‘দেশের হয়ে খেলা গর্বের। আমি সবসময় চেয়েছি ভারতকে জেতাতে। সতীর্থদের ধন্যবাদ, কোচদের ধন্যবাদ। ক্রিকেট আমাকে সব দিয়েছে!’
বক্তব্যে শান্তি। যেন কোনও আক্ষেপ নেই। অথচ এই শান্ত মুখের আড়ালে কত ত্যাগ, কত লড়াই। আজ প্রশ্ন উঠছে—পূজারার মতো ব্যাটার কি আবার আসবেন? ক্রিকেটে আজ আগ্রাসনের যুগ। শুভমান গিল, যশস্বী জয়সওয়ালরা প্রতিভাবান। কিন্তু পূজারার মতো ৫০০ বল খেলে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সাহস ক’জনের আছে? দ্রাবিড় শিখিয়েছিলেন, ‘দাঁড়াও, ভেঙে যেও না!’ পুজারাও সেই মন্ত্রকেই আধুনিক ক্রিকেটে বাঁচিয়ে রাখেন। আজ তাঁর বিদায় সেই প্রস্থানের, সেই স্কুলিংয়ের চূড়ান্ত অবসান।