মুম্বইয়ের দাদরের শিবাজি পার্ক। আজও মুম্বই ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র। সকাল থেকে সন্ধে, প্র্যাকটিসে সরগরম। এখানেই তৈরি হয় অনেক প্রজন্মের ক্রিকেটার। আচরেকর ছিলেন সেই বিদ্যায়তনের প্রধান পূজারি।

সচিন ও রমাকান্ত
শেষ আপডেট: 5 September 2025 17:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের সনাতন ঐতিহ্যে প্রেরণ জোগানো গুরু-শিষ্যের কথামালার অভাব নেই। সংস্কৃতি, বিদ্যাচর্চা কিংবা শিল্পের নানান আঙিনায় গুরুবাদী শিক্ষাধারার ধারাবাহিক ঐতিহ্য রয়েছে।
তুলনায় টক্কর দেবে খেলার ময়দানও। তার মধ্যে ভারতীয় জনমানসে ‘ক্রিকেট’ আবেদন আর ভাবাবেগের নিরিখে ধর্মের চাইতেও কোনও অংশে কম নয়। এমন কিছু সম্পর্ক রয়েছে, যা নিছক প্রশিক্ষক–খেলোয়াড় নয়, বরং এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরম্পরারই অংশ। সেই তালিকায় সচিন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar) ও রমাকান্ত আচরেকরের (Ramakant Achrekar) বোধ হয় একেবারে উপরের দিকে থাকবে।
একদিকে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান, অন্যদিকে আলোচনায় আসতে না চাওয়া, ধুলোয় ধূসরিত মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা এক কোচ। তাঁদের এই রসায়নই লিখেছিল ভারতীয় ক্রিকেটের অমর মহাকাব্য!
দাদরের শিবাজি পার্ক: এক প্রবহমান পাঠশালা
মুম্বইয়ের দাদরের শিবাজি পার্ক। আজও মুম্বই ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র। সকাল থেকে সন্ধে, প্র্যাকটিসে সরগরম। এখানেই তৈরি হয় অনেক প্রজন্মের ক্রিকেটার। আচরেকর ছিলেন সেই বিদ্যায়তনের প্রধান পূজারি। কঠোরতা, শৃঙ্খলা আর অনবরত খেলার ভেতর দিয়ে তৈরি করতেন ছেলেদের। আবহাওয়া যেমনই হোক—তপ্ত রোদ কিংবা ঝমঝমে বৃষ্টি—প্র্যাকটিস চালু থাকবে! শিবাজি পার্কের এই ক্রিকেটের বুনিয়াদেই হাতেখড়ি কিশোর সচিনের।
হিরে চেনার কাহিনি
গল্পটা প্রায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। সচিন তখন স্থানীয় আজিমপুরা ক্লাবের হয়ে খেলেন। কিন্তু দাদা অজিত তেন্ডুলকরের বিশ্বাস ছিল, ভাইয়ের প্রতিভা শাণিত করার জন্য দরকার এক বিশেষ গুরুর ছোঁয়া। তাই নিয়ে এলেন শিবাজি পার্কে। প্রথমে নেটে সচিনকে দেখে তেমন তাক লাগানো কিছুই টের পাননি আচরেকর। ব্যাট থেকে রান আসছিল না। টেকনিকে বিস্তর গলদ। প্রায় ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন।
কিন্তু অজিতের অনুরোধে আবার সুযোগ দিলেন। আর তখনই হঠাৎ ভোলবদল! দেখা গেল: বল ব্যাটের মাঝখানে ঠকাঠক লেগে যাচ্ছে। ছোটখাটো গড়নের ছেলেটি সামনে পা বাড়িয়ে নির্ভয়ে শট খেলছে! আচরেকরের জহুরির চোখ ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে—আসল রত্নটি ছদ্মবেশে ধরা দিয়েছে। একে ফেরালে হাত কামড়াতে হবে!
কঠোরে-কোমলে প্রশিক্ষণ
আচরেকরের কোচিং মানে শুধু টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি নয়। ছিল নিখাদ শৃঙ্খলা। সকালে শিবাজি পার্কে নেট, বিকেলে ম্যাচ। কখনও সাইকেলে চেপে সচিনকে মুম্বইয়ের এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে নিয়ে গেছেন, যাতে দিনে তিনটে ম্যাচ খেলতে পারেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্র্যাকটিসের সময় যত বাড়বে, অভিজ্ঞতা হবে তত গভীর! ভুল করলে শাসন কড়া—মনোযোগের অভাবে ঠাস করে এক চড়। আবার একই সঙ্গে নিখুঁত শটে রান করলে কাঁধে প্রলম্বিত প্রশ্রয়ের হাত! এই কড়া শাসন আর মমতার টানাপোড়েনেই সচিন বেড়ে ওঠেন।
প্রেরণা জোগায় যে সব গল্প
একবার স্কুল ম্যাচে সচিন অল্প রান করে ফিরেছেন। হতাশ হয়ে ভেবেছিলেন সেদিন হয়তো আর খেলতে হবে না। কিন্তু আচরেকর তাঁকে তৎক্ষণাৎ আরেক মাঠে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘আজই ভুল শুধরে নাও। কাল নয়!’
আরেকদিন বড় ইনিংস খেলার পর বন্ধুর সঙ্গে হাসি-তামাশায় ব্যস্ত। ভেবেছিলেন, আজ রেহাই। শুধুই ছুটি। কিন্তু হঠাৎ চমকে দিয়ে ভেসে এল স্যারের গলা: ‘ভালো খেলেছিস, কিন্তু ওই শটটা মারার দরকার ছিল না!’ রান যতই হোক, টেকনিকের খুঁটিনাটিতে কোনওদিন ছাড় দেননি আচরেকর। গুরু-শিষ্যের আদত সম্পর্ক হয়তো এটাই—কঠোর সমালোচনার পরেই কোমল স্নেহ, প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনার সঠিক ভারসাম্য।
শুধু সচিন নন, বিনোদ কাম্বলি, প্রবীণ আমরে, চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত—মুম্বই ক্রিকেটকে যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের সিংহভাগেরই গুরু ছিলেন আচরেকর। কিন্তু আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছেন সচিনই। কারণ, তিনি সবচেয়ে সফল কিংবা প্রতিভাবান বলে নয়। আসলে আচরেকরের কাছে সচিন ছিলেন এমন এক প্রকল্প, যেখানে তিনি প্রতিদিন নতুন কিছু যোগ করেছেন। কোনওদিন সামান্য, কোনওদিন বড়—ঝাড়াই-বাছাই, সংযোজন-সংযোজনের মধ্য দিয়ে গড়েপিটে ওঠেন ভবিষ্যতের মহাতারকা।
গুরু-শিষ্যের নিবিড় যোগ: মাঠে… মাঠের বাইরে
আচরেকরের শিক্ষা খেলাধুলোর বাইরেও বিস্তৃত ছিল। প্রতিপক্ষকে অবজ্ঞা নয়, বরং সম্মান করার পাঠ শিখিয়েছিলেন। সচিন আজও বারবার বলেন, উলটো দিকের খেলোয়াড়কে কখনও ছোট করে দেখেননি। আচরেকর স্যারের সেই শিক্ষাই তাঁকে দুনিয়ার নজরে ‘জেন্টলম্যান’ ক্রিকেটারের আসনে বসিয়েছে। সচিনের আত্মজীবনী থেকে সাক্ষাৎকার—সর্বত্র গুরুবন্দনা। একাধিকবার বলেছেন, ‘আচরেকরের মতো শিক্ষক না থাকলে ছেলেবেলার আমি আজকের আমি হতাম না!’ ক্রিকেট জীবনের প্রতিটি সাফল্যের আড়ালে তিনি দেখেছেন স্যারের ছায়া। অবসর নেওয়ার সময়ও প্রথম সারিতে বসে ছিলেন আচরেকর। খ্যাতির ঝলমলে আলোতেও গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক নীরব… অথচ অটুট।