নয় রানের মধ্যে চার উইকেট পড়ে গিয়েছিল ভারতের। কপিল দেব তখন ছিলেন বাথরুমে। তড়িঘড়ি তাঁকে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বলা হয়। কপিল ভাবতেও পারেননি ততক্ষণ কী ঘটে গিয়েছে।

কপিল দেব
শেষ আপডেট: 18 June 2025 16:14
পিছিয়ে যাওয়া যাক ৪২ বছর। সেই দিনটাও ছিল ১৮ জুন। সালটা ছিল ১৯৮৩ (18 June 1983)। ভারতের ক্রিকেটের ইতিহাসে দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। সেদিন অতিমানব হয়ে উঠে ভারতকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনেছিলেন হরিয়ানার ২৪ বছরেরে এক যুবক। যার হাতে সদ্যই তুলে দেওয়া হয়েছিল ভারতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব।
তিনি হলেন কপিল দেব নিখাঞ্জ (Kapil Dev Nikhanj)। ‘হরিয়ানা হ্যারিকেন’ নামে পরিচিত হয়ে তিনি তখন ব্যাট ও বল হাতে আলো ছড়াতে শুরু করেছেন। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে ওডিআই বিশ্বকাপ (1983 World Cup) খেলতে ইংল্যান্ডে (England) গিয়েছিল ভারত। তখন অবশ্য বিশ্বকাপের নাম ছিল প্রুডেনশিয়াল কাপ। ১৮ জুন ভারতের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ ছিল টনব্রিজে জিম্বাবোয়ের (India vs Zimbabwe) বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে হারলেই ভারতের বিদায় নিশ্চিত বিশ্বকাপ থেকে।
টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতের অধিনায়ক কপিল দেব। কিন্তু শুরুতেই দেখা দিল ভয়ঙ্কর ব্যাটিং বিপর্যয়। একে একে প্যাভিলিয়নে ফিরে গিয়েছেন সুনীল গাভাসকর, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত, মহিন্দর অমরনাথ, সন্দীপ পাতিল, যশপাল শর্মারা। মাত্র ১৭ রানে পড়ে গিয়েছে পাঁচ পাঁচটি উইকেট।
নয় রানের মধ্যে চার উইকেট পড়ে গিয়েছিল ভারতের। কপিল দেব তখন ছিলেন বাথরুমে। তড়িঘড়ি তাঁকে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বলা হয়। কপিল ভাবতেও পারেননি ততক্ষণ কী ঘটে গিয়েছে। বেরিয়ে এসেই অবস্থা বুঝে প্যাড পরতে শুরু করলেন। প্যাড পুরো পরার আগেই ফের উইকেট হারায় ভারত। যশপাল আউট। কোনওমতে ক্রিজে পৌঁছন কপিল।
আর তারপর তৈরি হল সেই ইতিহাস। প্রথমে রজার বিনিকে (২২) সঙ্গে নিয়ে গড়লেন ৬০ রানের জুটি। এরপর টিকতে পারলেন না রবি শাস্ত্রীও। মাত্র এক রান করেন তিনি। মনে হচ্ছিল ১০০ রানের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে ভারতের ইনিংস। কিন্তু কপিল দেবের মনে অন্যরকম ভাবনা কাজ করছিল। মাঠে নামলেন মদনলাল। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ চোয়াল নিয়ে মদনলালকে বললেন, “তুমি শুধু সঙ্গ দাও, যা করার আমি করছি।”
করলেনও তাই। জিম্বাবোয়ের বোলররা দিশা হারিয়ে ফেললেন। কোথায় বল করবেন বুঝতেই পারছেন না ইনিংসের শুরুতে বিধ্বংসী হয়ে ওঠা পিটার রসন, কেভিন কুরানরা। ফিল্ডাররা তখন দর্শক। কপিল-মদনলাল জুটিতে উঠল ৬২ রান। মদনলাল ফিরলেন ১৭ রান করে।
তবুও নিরুত্তাপ, টেনশন মুক্ত হরিয়ানা হ্যারিকেন। আরও রান চাই। এবার সঙ্গে কিরমানি। এগোতে থাকল ইনিংস। দেখতে দেখতে ২০০ পার। ততক্ষণে শতকের দেখা পেয়ে গিয়েছেন ভারতের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার। আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠলেন। অতিক্রম করলেন দেড়শ রানের সীমা। অবশেষে শেষ হল ষাট ওভার (তখন বিশ্বকাপে ষাট ওভারের ইনিংস ছিল)। দলের রান আট উইকেট হারিয়ে ২৬৬।
কপিল তখন অপরাজিত ১৭৫। খেলেছেন মাত্র ১৩৮ বল। টি-টোয়েন্টির যুগে এই রান বলার মতো না হলেও, তৎকালীন সময়ে এটাকে তাণ্ডবই বলা হয়েছিল। সেদিন ১৬টি চার ও ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন কপিল। কিরমানি করেছিলেন অপরাজিত ২৪ রান।
এর পর আর ম্যাচে বলার মতো কিছু ছিল না। জিম্বাবোয়ে ৫৭ ওভারে ২৩৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। ভারত জেতে ৩১ রানে। বোলার কপিল সেদিন ১১ ওভার বল করে ৩২ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন একটি উইকেট।
কপিলের মহানায়ক হয়ে ওঠার সেই ম্যাচের কোনও সম্প্রচার হয়নি। নেই কোনও ভিডিও রেকর্ডিংও। তবুও ৪২ বছর পরও সেই ম্যাচ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এই ম্যাচের পরই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ভারত। গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে বুঝিয়ে দেয় এবার তাদের নিয়ে ভাবতে হবে।
এরপর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও ফাইনালে দুর্ধর্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। কপিলের সেই ইনিংস না হলে যা কখনওই সম্ভব হতো না। ১৯৮৩ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের গল্প স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। সেই মুহূর্তগুলি এখনও প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে স্পন্দিত।