এক অনাবশ্যক নাটক এশিয়া কাপকে ঢেকে দিয়েছে। জয়ী হয়েছে ভারত, কিন্তু হেরেছে ক্রিকেট। অন্তত কিরমানির মতো কিংবদন্তির দৃষ্টিতে এটাই বাস্তব। তাঁর চোখে পুরো ঘটনাই ‘লজ্জাজনক’—যেখানে খেলার জয় নেই, আছে কেবল রাজনীতির প্রতিশোধ।

সূর্যকুমার ও আঘা
শেষ আপডেট: 30 September 2025 10:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাঠে ভারত-পাক দ্বন্দ্ব যতটা আগ্রহ জাগিয়েছে, বাইশ গজের বাইরের কাদা–ছোড়াছুড়ি তৈরি করেছে ঠিক ততটাই বিতৃষ্ণা। আর কারও কাছে না হলেও অন্তত সৈয়দ কিরমানির (Syed Kirmani) চোখে তো বটেই! সদ্যসমাপ্ত এশিয়া কাপের (Asia Cup 2025) সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ক্রিকেট নয়, রাজনীতি। আর সেই প্রবণতা নিয়েই মুখ খুললেন ১৯৮৩-র বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য, কিংবদন্তি উইকেটকিপার। কিরমানি মন্তব্য, ‘লজ্জিত আমি। এই খেলা এভাবে রাজনীতির সঙ্গে মেশানো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়!’
পুরো এশিয়া কাপের মাসজুড়ে যতটা আলোচিত ম্যাচের লড়াই, তার চেয়ে বেশি জমেছিল বিতর্ক। শুরু হ্যান্ডশেক না-করা দিয়ে, তারপর সূর্যকুমার যাদবের (Suryakumar Yadav) পহেলগাম (Pahalgam) হামলায় নিহতদের উদ্দেশে জয়ের বার্তা, তারও পরে চূড়ান্ত নাটক—এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (ACC) চেয়ারম্যান তথা পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির (Mohsin Naqvi) হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার! ফল? চ্যাম্পিয়ন হয়েও হাতে কাপ উঠল না ভারতের।
এইসব দেখে স্তম্ভিত কিরমানি। সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটে এখন আর ভদ্র আচরণের ছিটেফোঁটাও নেই। মাঠে রূঢ়তা, ঔদ্ধত্য, কুরুচিকর ইঙ্গিত। আমার কাছে বার্তা এসেছে—ভারতীয় দল কী করছে, কেন করছে? এ সব শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করতে হয়!’
কিরমানি মনে করিয়ে দেন তাঁর জমানার ভারত–পাক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা। রাজনৈতিক অশান্তি তখনও ছিল। কিন্তু ক্রিকেটের গায়ে তার আঁচ পড়ত না। পাকিস্তানি দল এদেশে এলে আপ্যায়ন, আতিথ্য; ভারতীয়রা ওদেশে গেলে অঢেল ভালোবাসা। তাঁর কথায়, ‘মাঠের বাইরের সমস্যা বাইরে থাকুক। খেলায় রাজনীতি টানবেন না। জয়কে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে দেবেন না। মহৎ কারণ থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বার্তার রঙে রাঙানো উচিত নয়। আমাদের সময়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে এমন দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। আজকের দৃশ্য ভেবে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়!’
প্রসঙ্গত, পুরো টুর্নামেন্টেই ভারত–পাক ম্যাচ ভরে ওঠে ইশারা–উসকানিতে। সুপার ফোরে হ্যারিস রউফ (Haris Rauf) আর সাহিবজাদা ফারহান (Sahibzada Farhan) যেভাবে সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত দেন, সেটা কেবল বিতর্কই নয়, নিন্দার ঝড় তোলে। জবাবে ভারতের অর্শদীপ সিং (Arshdeep Singh) করে বসেন বিমান ভূপাতিত করার অঙ্গভঙ্গি, যা আরও উত্তেজনা বাড়ায়। শেষমেশ আইসিসির (ICC) শাস্তি ঘোষণা—হ্যারিস জরিমানার মুখে পড়েন, সূর্যকুমারও রাজনৈতিক মন্তব্যের দায়ে শাস্তি পান।
ফাইনালে পৌঁছে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক। ট্রফি বিতরণীর মঞ্চে দাঁড়িয়েও ভারতীয় দল নকভির হাত থেকে কাপ নিতে অস্বীকার করে। পাকিস্তানি শিবির তখনও ক্ষোভে ফুঁসছে। গোটা অনুষ্ঠান ভেসে যায় দুয়ো–টিপ্পনিতে। কিরমানির মতে, এই সমস্ত ঘটনা খেলার অপমান।
প্রাক্তন কিপারের মতে, এশিয়া কাপ ক্রিকেটের বদলে রাজনীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর সোজাসাপ্টা বক্তব্য, ‘এই প্রজন্মের ক্রিকেটাররা কেমন করে খেলছে? এতটা কদর্যতা! ক্রিকেট যে ছিল ভদ্রলোকের খেলা, সেটা আজ কোথায় হারাল?’
ভারতীয় দলের তরফে অধিনায়ক সূর্যের বক্তব্য অবশ্য আলাদা। তিনি জানিয়েছেন, এটা দেশের সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। অন্যদিকে পাকিস্তানের সলমন আঘার (Salman Ali Agha) বারবার অভিযোগ—ভারত কেবল প্রতিপক্ষকে নয়, ক্রিকেটকেই অসম্মান করছে।
সব মিলিয়ে এক অনাবশ্যক নাটক এশিয়া কাপকে ঢেকে দিয়েছে। জয়ী হয়েছে ভারত, কিন্তু হেরেছে ক্রিকেট। অন্তত কিরমানির মতো কিংবদন্তির দৃষ্টিতে এটাই বাস্তব। তাঁর চোখে পুরো ঘটনাই ‘লজ্জাজনক’—যেখানে খেলার জয় নেই, আছে কেবল রাজনীতির প্রতিশোধ।