Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

‘গড’ নন… তিনি ‘গ্ল্যাডিয়েটর’! কীভাবে ক্রিকেট-বাণিজ্যের মানচিত্র পালটে দিলেন বিরাট?

বিরাট এমন এক সময়ের প্রতীক, যেখানে খেলার চেয়ে বেশি বিক্রি হয় কনসিস্টেন্সি, আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস। আজ প্রতিটি তরুণের মনে প্রশ্ন—‘আমি কীভাবে নিজেকে কোহলির মতো সুশৃঙ্খল করতে পারি?’ 

‘গড’ নন… তিনি ‘গ্ল্যাডিয়েটর’! কীভাবে ক্রিকেট-বাণিজ্যের মানচিত্র পালটে দিলেন বিরাট?

বিরাট কোহলি

রূপক মিশ্র

শেষ আপডেট: 5 November 2025 16:20

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় ক্রিকেটে সব সময় সর্বজনমান্য নায়কের খোঁজ চলে। যতবার কোনও নতুন নক্ষত্র উঠে এসেছে, ক্রিকেট নিছক খেলার গণ্ডি ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে সংস্কৃতি, ব্যবসা আর আবেগের স্ফীতোদর বৃত্তে।

এক সময় সেই আকাশে নিজের গরিমায় ভাস্বর সচিন তেন্ডুলকর… এক নিঃসঙ্গ ঈশ্বরের মতো।

ধোনি এসেছিলেন ‘ক্যাপ্টেন কুলে’র তকমা নিয়ে—গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতীক!

আর বিরাট কোহলি? দুয়ের মাঝখানে এক নতুন দর্শন—যিনি শচীনের ‘ভক্তি’ আর ধোনির ‘সংযম’ দুটোকেই পিছনে ফেলে নিপাট ‘পেশাদারিত্বে’র নতুন সূত্র রচনা করেছেন!

আসলে শুধু মাঠের তারকা নন; এক নয়া জমানার প্রতীক কিং কোহলি—যেখানে ফিটনেস, ব্র্যান্ডিং, আগ্রাসন ও শৃঙ্খলা মিলেমিশে এক নতুন ভারতীয় চেতনা গড়ে তুলেছে। তাঁর আগমন ভারতীয় ক্রিকেটের মার্কেটিং ডিএনএ-তে নতুন কোড জুড়ে দিয়েছে—একই সঙ্গে বিনোদন, ব্যবসা ও ব্যক্তিত্বের সংমিশ্রণ!

যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম আলোচনায় এলেন বিরাট, সেই সময় ভারতীয় ক্রিকেটের বাজার সচিন-ধোনি-যুগের ছায়ায়। ব্র্যান্ড স্পনসররা ক্রিকেটারদের ব্যবহার করতেন ‘পোস্টার বয়’হিসেবে। অর্থাৎ, খেলোয়াড়দের ‘মুখ’ থাকত, ‘কণ্ঠ’ ছিল না। কোহলি সেই সমীকরণ পালটে দিলেন।

খেলার পাশাপাশি যেভাবে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব গড়ে তুললেন—অতিরিক্ত রাগ, প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে কথা বলা, আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করা, মাটিতে লুটিয়ে না পড়ে প্রতিটি সাফল্যের আগ্রাসী উদযাপন… এটাই নতুন ভারতের চেহারা। এই আগ্রাসনটাই বাজারে ‘সেলেবল’। ব্র্যান্ড ম্যানেজাররা বুঝেছিলেন, দেশের উঠতি প্রজন্ম স্রেফ হিরো খোঁজে না। তারা চায় যে লড়াই করে, প্রতিবাদ করে, প্রকাশ্যে নিজেকে দেখাতে ভয় পায় না… এমন নায়ককে।

ফলে বিরাটের ব্যক্তিত্ব এক প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। চারপাশে গড়ে উঠল এক সম্পূর্ণ ‘ব্র্যান্ড ইকোসিস্টেম’। শুধু মাঠে ব্যাট হাতে নয়, বাইরে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন জীবনদর্শন—যা বলে ‘নিজের সীমা নিজেই ভাঙো’! ভারতের ক্রিকেট-বাণিজ্য সব সময় এক নায়কের ঘূর্ণিতে চলে। কপিলের কাপজয় থেকে শচীনের শতরান, ধোনির ছক্কা—প্রতিটি স্মৃতি কোনও না কোনও বিজ্ঞাপনের সঙ্গে জড়িয়ে। কিন্তু এই ধারাটাকে আরও সচেতন ও প্রফেশনাল করেছেন বিরাট।

২০০৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারতের নেতৃত্ব। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরই ব্র্যান্ডগুলির নজর তাঁর দিকে ফেরে। কিন্তু কোহলি বুঝেছিলেন—শুধু পারফরম্যান্স যথেষ্ট নয়, দরকার উপস্থিতি। তাই শুরু থেকেই নিজেকে গড়ে তুললেন ভিন্নভাবে। ফিটনেস, ডায়েট, পোশাক, ভাষা, এমনকি শরীরী ভঙ্গিতেও গড়ে তুললেন ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’!

যার প্রথম সাফল্য এল ২০১৩-১৪ নাগাদ। মাঠে ধারাবাহিক রান, অধিনায়কত্বের দায়িত্ব, আগ্রাসী মানসিকতা—সব মিলে হয়ে উঠলেন তরুণ প্রজন্মের অধীশ্বর। বিরাটের সবচেয়ে বড় শক্তি—তিনি নিজের নামকে ব্যবসার অংশ করেছেন। পুমার সঙ্গে তাঁর যৌথ ব্র্যান্ড ‘ওয়ান৮’ (One8) আজ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় স্পোর্টসওয়্যার। সেখানে তিনি কেবল মডেল নন, উদ্যোক্তাও বটে! এর পাশাপাশি রেস্তোরাঁ চেন নুয়েভা (‘Nueva’), ফিটনেস কোম্পানি চিসেল (‘Chisel’) এবং একাধিক ব্র্যান্ডে তাঁর বিনিয়োগ।

এটাই কোহলির ব্র্যান্ড-বুদ্ধির মূল। তিনি কখনও একটি নির্দিষ্ট সংস্থার হয়ে বিজ্ঞাপন দেন না, বরং নিজেকে ‘একগুচ্ছ ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি’ বানান। তাঁর প্রতিটি ক্যাম্পেইনে একটা আখ্যান থাকে। হয় ‘ফিটনেস মানে স্বাধীনতা’, নয়তো ‘হার মেনো না’ কিংবা ‘নিজেকে ছাপিয়ে যাও’। বিজ্ঞাপনগুলো দেখতে দেখতে দর্শক স্লোগান নয়, মনে রাখে ব্যক্তিত্ব!

যেখানে সচিন তেন্ডুলকরের ইমেজ ছিল ঈশ্বরের মতো নির্ভেজাল, সেখানে কোহলি অনেক বেশি মানবিক—রাগী, আবেগপ্রবণ তবু শৃঙ্খলাবদ্ধ। সচিনের কাছে দর্শক যেত প্রণাম করতে, বিরাটের সঙ্গে তারা সেলফি তোলে। সচিন ‘আদর্শ’; কোহলি ‘আধুনিক’। সচিন ভদ্র, বিনয়ী; কোহলি যা বলেন সরাসরি। এই আকাঁড়া বা অপরিশোধিত ভাবটাই তরুণ সমাজে আবেদন তোলে। আর এমন পার্থক্যই ভারতীয় বিপণনের ভাষা দেয় বদলে!

বিরাটের ব্র্যান্ড ইমেজের সবচেয়ে স্থায়ী দিক: ফিটনেস। তিনি শুধু ক্রিকেটের মধ্যে নয়, দেশের স্বাস্থ্যবোধে প্রভাব ফেলেছেন। একসময় ক্রিকেটারদের পেট নিয়ে ঠাট্টা হত, এখন জিমে গিয়ে ব্যায়াম করাটা তরুণদের দৈনন্দিন রুটিন। এর নেপথ্যে কোহলির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তিনি ভারতীয় খেলোয়াড়দের জন্য এমন এক মানদণ্ড তৈরি করেছেন, যেখানে ‘পেশাদারিত্ব’মানেই শরীরের শৃঙ্খলা। খাবার থেকে ঘুম, ট্রেনিং থেকে মেডিটেশন—সবেতেই তাঁর সংযম ও নিষ্ঠা শিক্ষণীয়।

অদ্ভুত বিষয় হল—এই সংযমকে বিরাট বিক্রিযোগ্য করে তুলেছেন। তাঁর ইনস্টাগ্রাম পোস্ট বা রিল এখন অনেক সময় কোনও বিজ্ঞাপন নয়, এক ধরনের লাইফস্টাইল গাইড। মানুষ তাঁকে দেখে শিখছে কীভাবে ধরে রাখতে হয়, নিজেকে রিবুট করতে হয়। সমাজমাধ্যোমে কোটি কোটি ফলোয়ার। কিন্তু কী আশ্চর্য, তাঁর ফিডে কখনও অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে না! বিরাট নিজের ব্র্যান্ড ইমেজের উপর রাখেন কঠোর নিয়ন্ত্রণ। যে-কোনও পোস্ট বা প্রচারও নিজের জীবনদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন।

বাজার বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বিরাট কোহলির বার্ষিক ব্র্যান্ড ভ্যালু প্রায় ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা কোনও ভারতীয় অ্যাথলিটের মধ্যে সর্বোচ্চ! প্রায় ৩০টির বেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত তিনি—স্পোর্টস, টেক, হেলথ, ফুড, ফ্যাশন, ট্র্যাভেল—প্রত্যেক সেক্টরেই অনিবার্য উপস্থিতি। এ নিছক জনপ্রিয়তার ফল নয়, ‘ব্র্যান্ড রিলেভ্যান্সে’র প্রভাব! অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছেন বিরাট। তরুণরা যেখানে যেভাবে নিজেদের পুনর্নির্মাণ করছে, কোহলিও সেইভাবে নিজের ইমেজ পাল্টেছেন।

আজ ভারতীয় বিপণনের মানচিত্রে কোহলির প্রভাব ক্রিকেটের বাইরেও প্রাসারিত। স্কুলে বাচ্চাদের ফিটনেস সচেতনতা, টিকটক ও রিলের ভাষায় আক্রমণাত্মক আত্মবিশ্বাস, এমনকি পুরুষদের গ্রুমিং সংস্কৃতিতেও তাঁর ছাপ স্পষ্ট। যেভাবে আগে সিনেমার হিরোরা ফ্যাশনের মাপকাঠি হতেন, আজ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোহলি। তাঁর দাড়ি, হেয়ারস্টাইল, ট্যাটু, পোশাক—সবই ট্রেন্ড নির্ধারণ করছে। ‘ক্রিকেটার’ শব্দটা এখন অনেক বড় অর্থ বহন করে। এর মধ্যে আছে উদ্যোক্তা, আইকন, পরামর্শদাতার আলাদা আলাদা চৌখুপি।

আসলে বিরাট এমন এক সময়ের প্রতীক, যেখানে খেলার চেয়ে বেশি বিক্রি হয় কনসিস্টেন্সি, আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস। আজ প্রতিটি তরুণের মনে প্রশ্ন—‘আমি কীভাবে নিজেকে কোহলির মতো সুশৃঙ্খল করতে পারি?’ একটা সময় ব্যাট হাতে জয় আনতেন ভারতের জার্সিতে। এখন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে জিতছেন এক বৃহত্তর ম্যাচ—বাজারের, সংস্কৃতির, সময়ের!


```