‘এসএ২০’ অভিযান দেখিয়ে দিল—মহারাজ আজও ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ‘ম্যান-ম্যানেজার’। অগ্নিপরীক্ষায়, আপাতত, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় গম্ভীরের থেকে এক ধাপ নয়—এক যুগ এগিয়ে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 26 January 2026 14:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইতিহাস সাক্ষী—ভারতীয় ক্রিকেট স্থিতিশীল ড্রেসিং রুমে স্বচ্ছন্দ, সফল। যখনই ঝুটঝামেলা লেগেছে, হতে পারে কোচ বনাম অধিনায়ক, সিনিয়র বনাম জুনিয়র, প্রাক্তন বনাম অধুনা-র ইগো সংঘাত—ফলশ্রুতি খুব একটা ভাল হয়নি। গ্রেগ চ্যাপেল (Greg Chappell) থেকে শুরু করে অনিল কুম্বলের (Anil Kumble) জমানা তার সাক্ষী।
গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) এখনও তোপের মুখে মসনদ থেকে উড়ে যাননি। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, টিম ইন্ডিয়ার হেডকোচ আপাতত মাইনফিল্ডে দাঁড়িয়ে। একটা ভুল পদক্ষেপেই সাধের স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে। এশিয়া কাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি—সাফল্যের ঢোল যতই বাজুক, সাজঘর যদি একবার একজোট হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সেখান থেকে কামব্যাক করাটা শুধু দুরূহ নয়, প্রায় অসম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা তাই অনিবার্য—ভারতীয় ক্রিকেট আদৌ কী চায়? অহেতুক বিতর্ক? অন্তর্দলীয় সংঘাত? নাকি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও লিগ্যাসি? উত্তর যদি দ্বিতীয়টাই হয়, তবে গম্ভীরের ঠিক বিপরীতে যাঁর নাম উঠে আসে, তিনি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly)।
দক্ষিণ আফ্রিকার ফাইনাল আর সৌরভের দর্শন
২০০৩ বিশ্বকাপ ফাইনাল (World Cup 2003)। জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স (Wanderers)। ভারত হারল অস্ট্রেলিয়ার (Australia) কাছে। সেই ক্ষত আজও শুকোয়নি। ২৩ বছর পরে সেই একই ভূখণ্ডে, ভিন্ন ভূমিকায়, ফের এক ফাইনাল হাতছাড়া সৌরভের। প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালস (Pretoria Capitals) কোচ হিসেবে এসএ২০ (SA20) ফাইনালে সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপের (Sunrisers Eastern Cape) কাছে পরাজয়।
কিন্তু দুটো পরাজয় এক নয়। ২০০৩ ছিল ব্যর্থতার সিলমোহর। ২০২৬-এর বিপর্যয় প্রমাণ—সাফল্য মানে শুধু ট্রফি নয়। ডিওয়াল্ড ব্রেভিসের (Dewald Brevis) শতরান, দল হিসেবে লড়াই, শেষ ওভার পর্যন্ত ম্যাচে থাকা—এ সবই সৌরভের কোচিং দর্শনের স্বচ্ছ প্রতিফলন, জোরালো বার্তা—ঠিক পথে হাঁটলে ফল আসবেই, আজ না হোক কাল।
ড্রেসিংরুম বনাম ডাগআউট: গম্ভীর বনাম সৌরভ
গম্ভীরের কোচিং দর্শন আক্রমণাত্মক, কর্তৃত্বপরায়ণ। তিনি স্পষ্ট বিশ্বাস করেন—ডিসিপ্লিন মানেই নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটে, বিশেষ করে তারকাখচিত ভারতীয় ড্রেসিংরুমে, এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর? প্রশ্ন উঠবে।
অন্যদিকে সৌরভ। তাঁর দর্শন একেবারেই আলাদা। প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসে তিনি ‘বস’ নন, ‘ফ্যাসিলিটেটর’। খেলোয়াড়দের কথা শোনেন, সিদ্ধান্ত চাপাতে বিমুখ। কেশব মহারাজের (Keshav Maharaj) নেতৃত্বে যে শান্ত, স্থির দল আমরা দেখেছি, তার নেপথ্যে এই বিশ্বাসের সংস্কৃতি। ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাস বলছে—যখন কোচ খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করেন, তখন ক্রিকেটাররা নিজেদের উজাড় করে দেয়। জন রাইট (John Wright)–সৌরভ জুটি, গ্যারি কার্স্টেন (Gary Kirsten)–ধোনি (MS Dhoni) যুগ—সবাই তার সফল উদাহরণ।
অতীত বলছে, অনেক প্রাক্তন মহাতারকাই কোচ হিসেবে ব্যর্থ। কারণ তাঁরা নিজের খেলোয়াড়ি মানদণ্ড অন্যদের ওপর চাপান। সৌরভ এখানে ব্যতিক্রম। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন—‘আমি আর ব্যাট হাতে নামি না। ম্যাচ জেতায় খেলোয়াড়রা।’ এই উপলব্ধি তাঁকে বানিয়ে তুলেছে আধুনিক কোচ। গম্ভীরের ক্ষেত্রে সওয়াল উঠছে—তিনি কি এখনও নিজেকে মাঠের ‘যোদ্ধা’ ভাবেন? নাকি সত্যিই ‘গাইড’ হতে পেরেছেন? প্রিটোরিয়ায় সৌরভ দেখিয়েছেন, কোচের আসল কাজ সংহতিপূর্ণ, সুস্থ পরিবেশ তৈরি। ব্রেভিস, লুঙ্গি এনগিডি, গিডিয়ন পিটার্সরা জানেন—ভুল করলে শাস্তি নয়, সমাধান খোঁজা হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে গম্ভীরের এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি।
ফল নয়, প্রক্রিয়া—এই দর্শনই ভবিষ্যৎ?
গম্ভীরের পক্ষে যুক্তি—ফলই শেষ কথা। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুধু রেজাল্টের পেছনে দৌড়লে ভিত ভেঙে পড়ে। সৌরভ বরাবর প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালস লিগের শুরুতে হোঁচট খেয়েছিল। কিন্তু আতঙ্ক ছড়ায়নি। শেষ সাত ম্যাচে ছ’টি জয়—কারণ, কোচ পরিকল্পনা বদলাননি। এটা সেই সৌরভীয় দর্শন, যা আধুনিক ভারতীয় ক্রিকেটকে পালটে দেয়। আজ টিম ইন্ডিয়ার অন্দরেও প্রশ্ন উঠছে—কোচ কি শুধুই ম্যাচ জেতার কথা ভাববেন? নাকি ২০২৭, ২০২৮-এর লক্ষ্যে টিম তৈরি করবেন? ভবিষ্যৎ দর্শনের এই জায়গাতে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় গম্ভীরের থেকে এগিয়ে।
ইগো ম্যানেজমেন্ট: সবচেয়ে অবহেলিত অথচ সবচেয়ে জরুরি
রোহিত শর্মা (Rohit Sharma), বিরাট কোহলি (Virat Kohli)—এই নামগুলোর ওজন যে কোনও কোচের কাছে চ্যালেঞ্জিং। গম্ভীরের সঙ্গে দূরত্ব নিয়ে কানাঘুষো চলছে। ক্যামেরার ফুটেজ, শরীরী ভাষা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ড্রেসিংরুম কি সত্যিই একজোট?
সৌরভের ইতিহাস এখানে তাঁর পক্ষে কথা বলে। ২০০০ সালে তিনি দলে ফিরিয়েছিলেন বিরোধে জড়ানো ক্রিকেটারদের। তরুণদের সাহস জুগিয়েছেন, সিনিয়রদের সম্মান বজায় রেখেছেন। ইগো ভাঙেননি, সামলেছেন। আধুনিক ভারতীয় দলে কোচের সবচেয়ে বড় কাজ কৌশল নয়—মানুষ সামলানো… পরিভাষায় ‘ম্যান ম্যানেজমেন্ট’। এই পরীক্ষায় সৌরভ সসম্মানে উত্তীর্ণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার হার কেন সৌরভকে ছোট করে না?
এসএ২০ ফাইনালে পরাজয় সৌরভের কেরিয়ারে আরেকটা ‘নোট’। কিন্তু সেটাকে ‘ব্যর্থতা’ বলা ভুল। কারণ, তিনি যা তৈরি করেছেন, তা টেকসই। ড্রেসিং রুমে অভিযোগ নেই। খেলোয়াড়দের প্রকাশ্য সমর্থন। কোচ হিসেবে প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্টে এই গ্রহণযোগ্যতা সহজে আসে না। দীর্ঘমেয়াদে এই দর্শনই ভারতীয় ক্রিকেট আশু প্রয়োজন।
আপাতত বল নির্বাচকদের কোর্টে। তাঁরা যদি চান প্রতিদিন বিতর্ক, প্রতিদিন ‘আমরা বনাম ওরা’, এই সাফল্য এই ব্যর্থতার অস্থির চক্র—তাহলে গম্ভীরই উপযুক্ত। কিন্তু যদি স্থিতিশীলতা, দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য, আর এমন এক সাজঘর যেখানে খেলোয়াড়রা স্বস্তিতে সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারে—নজরে থাকে, তাহলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিকল্প নেই। খেতাব এল না বলে তাঁকে ছোট করা যাবে না। বরং, ‘এসএ২০’ অভিযান দেখিয়ে দিল—মহারাজ আজও ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ‘ম্যান-ম্যানেজার’। অগ্নিপরীক্ষায়, আপাতত, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় গম্ভীরের থেকে এক ধাপ নয়—এক যুগ এগিয়ে।