২০০৩-এ টসে হার, পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ—সব মিলিয়ে নিয়তি সেদিন সহায় ছিল না। ২০২৬-এর ফাইনালে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে ট্রফি তোলার দায় নেই। কিন্তু তাঁর ভাবনা, তাঁর তৈরি পরিবেশ আজ প্রিটোরিয়ার শক্তি।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 January 2026 16:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তেইশ বছর অনেকটা লম্বা সময়। দুই দশকেরও বেশি! কিন্তু হতাশার, রিক্ততার, বেদনার, স্বপ্নভঙ্গের ‘চিরচিহ্ন’ ভুলে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট কি? এত সহজ বিলকুল নতুন করে সবকিছু শুরু করা? তিলতিল করে দল তৈরি, হতোদ্যম সৈনিকদের একজোট করে আস্ত আর্মি গঠন, যুদ্ধে তাঁরা অপাঙক্তেয়—জনমানসের বিশ্বাসকে মুখের কথায় না কেটে ময়দানে নেমে ভুল প্রমাণ, একের পর এক শৃঙ্গ জয়, চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নামার ছাড়পত্র দখল, খেতাব যখন হাতের নাগালে, তখনই বিপর্যয়! সযত্নে তৈরি স্বপ্নসৌধের নিমেষে ধূলিসাৎ!
অতিরঞ্জন কিংবা আবেগী প্রলাপ মনে হচ্ছে? ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতের জার্নিকে এই ভাষায় বলে বোঝানোটা কি সত্যিই উচ্চকিত ঠেকছে? বেটিং কেলেঙ্কারিতে হাড়কঙ্কাল বেরিয়ে আসা জাতীয় টিমের দায়িত্ব নিয়ে পারফরম্যান্সকে একমাত্র মানদণ্ড মেনে ‘তরুণদের অগ্রাধিকার, অভিজ্ঞদের স্বাগত’ মন্ত্রে আস্থা রেখে যেভাবে সবাইকে একত্রিত করেছিলেন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly), সামলেছিলেন একের পর বিতর্ক, চারিয়ে দিয়েছিলেন বিদেশের জমিতে দাদাগিরি দেখানোর সাহস, ‘শুধু খেলতে নয়, জিততে নামো মাঠে’—তত্ত্বে উজ্জীবিত রেখেছিলেন গোটা ড্রেসিং রুম—এ সবেরই মূল মোক্ষ কি ছিল না আফ্রিকার বিশ্বকাপ? তিরাশির পর যা অধরা রয়ে গেছিল?
স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সৌরভ। কিন্তু দেশে ফিরেছিলেন খালি হাতে। শৌর্য আর বীরত্বের নতুন সংজ্ঞা লিখেছিল ‘মেন ইন ব্লু’, পরের ধারাবাহিক সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তরও সেদিনই গাঁথা হয়েছিল… কিন্তু ইতিহাস ‘বিজয়ীদের মনে রাখে, বিজিতদের নয়’—নির্মম আপ্তবাক্যের মর্ম শেলের মতো বিঁধেছিল মহারাজের বুকে।
তেইশ বছর বাদে সেই ক্ষতে কিছুটা হলেও প্রলেপ দেওয়ার সুযোগ। পোয়েটিক জাস্টিস—সেই আফ্রিকারই মাটিতে! এবারও দল ফাইনালে। এবারও কেউ ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি। ছুটেছিল ট্রোল, বিদ্রুপ, পরিহাস। ‘বাপি বাড়ি যা’ স্টাইলে যথারীতি টেনে ফেলেছেন বাউন্ডারির বাইরে। ফারাকের মধ্যে একটাই: এখন তিনি যুদ্ধের সৈনিক নন, মন্ত্রণাদাতা। লড়াইটা মূলত পর্দার আড়ালে। দল সাজান। ছকে দেন রণকৌশল। সাফল্যের টোটকা বাতলে দেন অভিজ্ঞতায়। ড্রেসিং রুমে ‘ফিল গুড’ পরিবেশ। ঠিক যেমনটা ছিল অধিনায়ক-জমানায়!
ক্যাপ্টেন থেকে কোচ: সৌরভের বিবর্তন
দলনেতা সৌরভ ছিলেন আগ্রাসী, দৃপ্ত, আবেগী। কোচ সৌরভ তার ঠিক উলটো মেরুতে। প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসে তাঁর ভূমিকা আদেশদাতা নয়, পথপ্রদর্শকের। কেশব মহারাজের (Keshav Maharaj) মতো অধিনায়ক বারবার জানিয়েছেন—ড্রেসিং রুমে সৌরভের সবচেয়ে বড় অবদান শান্তি আর বিশ্বাস। এখানেই বিবর্তন। সৌরভ জানেন, আধুনিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কোচ মানে আর ‘বস’ নয়। খেলোয়াড়রা তারকা, স্বতন্ত্র। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন ‘বন্ধু ও মেন্টরে’র ভূমিকা। ব্যক্তিগত আলাপ, হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ, আগেভাগে সম্পর্ক গড়া—ডিওয়াল্ড ব্রেভিস (Dewald Brevis), লুঙ্গি এনগিডি (Lungi Ngidi), গিডিয়ন পিটার্সদের সঙ্গে এই মানবিক সেতুবন্ধনই প্রিটোরিয়ার ভিত শক্ত করেছে।
প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের রূপান্তর: টিম কালচারের জয়
এই দলটা আগের দু’টি মরসুমে প্লে-অফেও ওঠেনি। এবছর হঠাৎ কী বদলে গেল? উত্তরটা স্কোরবোর্ডে নেই, রয়েছে মানসিকতায়। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় দলের দায়িত্ব নিয়ে পরিষ্কার করে দেন—ভালো ক্রিকেট খেলাই একমাত্র অ্যাজেন্ডা। যার ফল ময়দানের পারফরম্যান্স!
লিগ পর্বে ওঠানামা ছিল। ঘরের মাঠে হোঁচট। কিন্তু সৌরভ আতঙ্কিত হননি। একেবারে বেসিক সমস্ত জায়গা—ফিল্ডিং, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝা, চাপ সামলানো—জোর দিয়েছেন। তার সুবাদে, শেষ সাত ম্যাচে ছ’টি জয়। কোয়ালিফায়ারে সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপের (Sunrisers Eastern Cape) বিরুদ্ধে দাপুটে পারফরম্যান্স। এটা সৌরভীয় দর্শন—টিম আগে, ব্যক্তি পরে-র প্রতিফলন ছাড়া আর কী!
ফাইনালের মনস্তত্ত্ব: অভিজ্ঞতার মূল্য
ফাইনাল মানেই চাপ। আর চাপ সামলানোর পাঠ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় শিখেছেন সংঘাতময় লম্বা কেরিয়ারে। বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন, ন্যাটওয়েস্টের মতো বিদেশের মাটিতে সিরিজ জিতেছেন। তাই কেপ টাউনের (Cape Town) নিউল্যান্ডসের (Newlands) ফাইনালে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান মৌখিক ভাষণ নয়, দৃপ্ত উপস্থিতি! খেলোয়াড়রা জানে—ডাগআউটে এমন একজন আছেন, যিনি এই অনুভূতির সঙ্গে পূর্বপরিচিত। যিনি জানেন কখন চুপ থাকতে হয়, কখন দু’কথা বলাই যথেষ্ট। সৌরভের নিজের বক্তব্য—‘কোচ ম্যাচ জেতায় না, জেতায় খেলোয়াড়রা!’ এই উপলব্ধি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করছে।
পোয়েটিক জাস্টিসের সন্ধানে
২০০৩-এ টসে হার, পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ—সব মিলিয়ে নিয়তি সেদিন সহায় ছিল না। ২০২৬-এর ফাইনালে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে ট্রফি তোলার দায় নেই। কিন্তু তাঁর ভাবনা, তাঁর তৈরি পরিবেশ আজ প্রিটোরিয়ার শক্তি। যদি আজ কেপ টাউনে জিতে নেন ট্রফি, তাহলে সেটাকে বিশ্বকাপের বিকল্প বলা যাবে না। কিন্তু এক অসমাপ্ত বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার স্বস্তি মিলবে নিশ্চিত। আফ্রিকার মাটিতে স্বপ্নভঙ্গের পর, আফ্রিকার মাটিতেই এক নতুন স্বপ্নের জন্ম… এই ফাইনাল তাই শুধু টি-২০ ম্যাচ নয়, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্রিকেট-জীবনের আরেকটি অধ্যায়—যেখানে তিনি নায়ক নন, নেপথ্য-কারিগর।