আজ দেশের ছোট শহরে কোনও মেয়েকে ক্রিকেট ব্যাট হাতে দেখলে বাবা-মা ভয় পান না, গর্ব করেন। হরিয়ানার মাঠ থেকে বিশাখাপত্তনমের গলি—সব জায়গাতেই মেয়েরা জানে, এই খেলায় তাদের নিঃশর্ত অধিকার।
.jpeg.webp)
টিম ইন্ডিয়া
শেষ আপডেট: 3 November 2025 18:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রিজার্ভ ট্রেনের কামরায় ঠেসাঠেসি করে যাত্রা। কাঁধে কিট ব্যাগ। অনেক সময় নিজের টাকায় ব্যাট-বল কেনা, নিজেই ইউনিফর্ম ধোওয়া। গ্যালারিতে হাতেগোনা দর্শক, সংবাদপত্রে এক কলমও খবর নয়। এভাবেই শুরু দেশের মেয়েদের (Women’s Cricket in India) পথচলা।
১৯৭৮ সালে প্রথম মহিলা বিশ্বকাপ (Women’s World Cup) আয়োজন করেছিল ভারত। তখনও ছেলেদের দল (Men’s Team India) বিশ্বকাপ খেলেনি! অথচ শান্তা রঙ্গস্বামী (Shantha Rangaswamy), ডায়ানা এডুলজি (Diana Edulji), সন্ধ্যা আগরওয়াল (Sandhya Agarwal), শুভাঙ্গী কুলকর্ণী (Shubhangi Kulkarni), নিতু ডেভিড (Neetu David)—এই নামগুলোই সেই নীরব বিপ্লবের মুখ। তাঁরা খেলেছিলেন। কিন্তু কেউ শুনতে চায়নি তাঁদের গল্প। না ছিল সম্প্রচার (broadcast), না ছিল আলো, না ছিল অর্থ। শুধু ছিল ভালোবাসা—খেলার প্রতি এক একরোখা, অদম্য টান।
আর সেই পথেরই শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর। ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে (DY Patil Stadium) ৫০ হাজার মানুষ নীল জার্সিতে গর্জে উঠলেন, যখন হারমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) হাতে তুললেন ভারতের প্রথম বিশ্বকাপের (Women’s ODI World Cup 2025) ট্রফি। ৫২ রানের জয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa) হার মানল, আর ভারত পেল এক অধরা ইতিহাসের স্পর্শ।
ডায়ানা এডুলজি, ১৯৭৮-এ ভারতের প্রথম মহিলা বিশ্বকাপ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যিনি, বললেন, ‘এই মুহূর্ত আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের। পঞ্চাশ বছর ধরে ক্রিকেট মাঠে আছি, অবশেষে ভারতীয় জার্সিতে সেই তারাটা উঠল!’ তাঁর কণ্ঠে যেন মিশে গেল অর্ধশতকের পরিশ্রম, অবহেলা আর প্রতীক্ষা… সমবেতভাবে!
আসলে, ১৯৭৮ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এই গল্পটা কেবল ক্রিকেট নয়—অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হওয়ার ইতিহাস। ২০০৫ সালে মিতালি রাজ (Mithali Raj) আর অঞ্জুম চোপড়ার (Anjum Chopra) দল প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছিল, কিন্তু হার মানে অস্ট্রেলিয়ার (Australia) কাছে। তবু সেই টুর্নামেন্টেই বীজ পুঁতেছিলেন তাঁরা। প্রতিটি ম্যাচে মাত্র হাজার টাকা পারিশ্রমিক জোটে মিতালিদের। আজ যেটা শুনলে অবিশ্বাস্য লাগে, সেটাই বাস্তব।
তারপর ২০১৭। লর্ডস (Lord’s) ভরতি দর্শক, সরাসরি সম্প্রচার, স্মৃতি মান্ধানার (Smriti Mandhana) দাপট আর হারমনপ্রীতের ১৭১ রানের ঝড়। ফাইনালে ৯ রানে হার। কিন্তু ভারতীয় মেয়েদের ক্রিকেট তখনই জায়গা করে নিল কোটি মানুষের মনে। আর সেই ব্যথার সিঁড়ি বেয়েই পৌঁছল ২০২৫-এর চূড়ায়।
আরেকটা নাম ভুললে অন্যায় হবে—ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami)। চাকদহের মেয়ে, দুই দশক ধরে দেশের হয়ে বোলিং করেছেন। কিন্তু কখনও বিশ্বকাপ হাতে পাননি। ২০২২-এ যখন অবসর নিলেন, তখন হারমন–স্মৃতি–জেমাইমারা (Jemimah Rodrigues) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—‘এই কাপ তোমার জন্য জিতব!’ এবার সেই প্রতিশ্রুতিও পূরণ হল। ঝুলনের চোখে জল, গলায় থরথর গর্ব: ‘ওরা বলেছিল আমার জন্য ট্রফি জিতবে—সত্যিই কথা রেখেছে!’ এই সাফল্য তাই স্রেফ স্কোরলাইনে নয়—একটা আস্ত প্রজন্মের সেতুবন্ধন। এক পাশে অগ্রজদের সওগাত, অন্য পাশে অনুজদের প্রতিশ্রুতি। হরমন নিজেও বললেন, ‘আমরা এত বছর ধরে বলেছি, একটা বড় টুর্নামেন্ট না জিতলে পরিবর্তন আসবে না। আজ সেটা করে দেখালাম!’ তাঁর গলায় সেই চিরাচরিত লড়াইয়ের সুর।
সাফল্যের মূলে শুধু খেলোয়াড় নয়, পরিবর্তন এসেছে পরিকাঠামোতেও। ২০০৬ সালে মেয়েদের ক্রিকেট সংস্থা (WCAI) যখন বিসিসিআইয়ের (BCCI) সঙ্গে মিশে যায়, তখনই শুরু কাঠামোগত বদল—চুক্তিভিত্তিক বেতন, ভ্রমণ ভাতা, টিভি সম্প্রচার। তারপর এসেছে উইমেনস প্রিমিয়ার লিগ (WPL), সমান ম্যাচ ফি নীতি (equal pay policy), নতুন প্রজন্মের প্রতিভাদের মঞ্চ। আজ দেশের ছোট শহরে কোনও মেয়েকে ক্রিকেট ব্যাট হাতে দেখলে বাবা-মা ভয় পান না, গর্ব করেন। হরিয়ানার মাঠ থেকে বিশাখাপত্তনমের গলি—সব জায়গাতেই মেয়েরা জানে, এই খেলায় তাদের নিঃশর্ত অধিকার।