যে বিশ্বকাপের স্মৃতি ভুলতে চাইতেন ডোনাল্ড, তার জন্য এখন তর সইছে না। বাভুমাদের বিশ্বজয়ের এর চেয়ে বড় ‘হলমার্ক’ আর কী হতে পারে!

অ্যালান ডোনাল্ড
শেষ আপডেট: 16 June 2025 15:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরা জুম করল লর্ডসের ব্যালকনি। নতমস্তকে খানিক মাথা ঝাঁকালেন অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা।
ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরা শতভিড়ের মধ্যে খুঁজে নিল এবি ডিভিলিয়ার্সকে। গ্যালারিতে সবান্ধব, সপরিবার ও সপুত্র যিনি মুষ্টিবদ্ধ হাত সোল্লাসে আকাশে ছুড়ছেন।
ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরা নজরবন্দি করল গ্রেম স্মিথকে, তাক করল ভের্নন ফিলান্ডারের উপর। তুলে আনল রোদেলা দিনে সমর্থকদের শাপমোচনের উল্লাস, সাজঘরের বাঁধভাঙা উৎসব। কেশব মহারাজ সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন। শন পোলক, ক্রিকেটের ময়দানে হৃদয়খোঁড়া যন্ত্রণার দিনেও যিনি বেদনাকে লুকিয়ে রেখেছেন, প্রবল খুশিতেও সেভাবে বেলাগাম হননি, তিনি পর্যন্ত কমেন্ট্রি বক্সে বসে চুপ মেরে গেলেন।
কিন্তু ক্রিকেটের সালতামামির হিসেব রাখেন যাঁরা, জানেন কেন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় শুধু ঐতিহাসিক নয়, সবদিক থেকে শাপমুক্তি, তাঁরা নিশ্চয় চেয়েছিলেন এই আনন্দের দিনে ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরা এক সেকন্ডের জন্য হলেও যেন ফোকাস করে অ্যালান ডোনাল্ডের উপর।
ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা পেসার। নিখুঁত লাইন-লেন্থ মেপে উল্কাগতিতে বল করে ব্যাটসম্যানের আবাল্য ব্যাটিং-শিক্ষার পরীক্ষা প্রতিপদে নিতেন যিনি, বল মিস করলে কিংবা অল্পের জন্য আউট হতে হতে বেঁচে গেলে ব্যাটারের দিকে হিমশীতল চাহনি চোখে চোখ রেখে ছুড়ে দিতেন… সেই ডোনাল্ডই পৃথিবীর দুর্বলতম, সবচাইতে অসহায়, ভাগ্যহত মানুষের মতো ছেড়েছিলেন বার্মিংহ্যামের মাঠ। নিশ্চিত জয় যখন কড়া নাড়ছে, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা যখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, তখন বালখিল্য ভুলে রান আউট… দলের ভরাডুবি… ফের একবার ফাইনাল হাতছাড়া… আরও একবার ‘চোকার্সে’র ট্যাগ গায়ে নিয়ে আইসিসি টুর্নামেন্ট অভিযান খতম! ইংল্যান্ড ফিরিয়েছিল রিক্ত হাতে। তারপর তিনি অবসর নিলেন। কত প্রজন্ম এল-গেল। কিন্তু সেদিনের সেই অভিশাপ কিছুতেই দক্ষিণ আফ্রিকার পিছু ছাড়ল না!
পিছু ছাড়েনি ডোনাল্ডেরও। যত বড়, যত প্রতিস্পর্ধীই তিনি হোন না কেন, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বার্মিহ্যামের সেই বিকেলে ডোনাল্ড ছিলেন পৃথিবীর দুর্বলতম মানুষ। তাঁরই দোষে রান আউট। তাঁরই সিদ্ধান্তহীনতায় স্খলন, দলের বিপর্যয়। এমন পরজয়, যাকে ক্রিকেটের চোখে, যুক্তির নজরে ব্যাখ্যা করা যায় না। ভাগ্যবিপর্যয় ছাড়া একে আর কী নাম দেওয়া যেতে পারে?
এতদিন ধরে উত্তর খুঁজেছেন তামাম দক্ষিণ আফ্রিকার জনতা। ‘চোকার্সে’র মতো অবমাননাকর তকমা গ্রহনক্ষত্রের অভিশাপের মতো বয়ে বেড়াতে হয়েছে। কাঠগড়ায় উঠেছেন ডোনাল্ড। কেরিয়ারের ভূতপূর্ব সাফল্য, ভাবী কৌলীন্য—সব এক লহমায় অপাঙক্তেয়, বাহুল্য। অ্যালান ডোনাল্ড বলতেই সব্বার চোখে ভেসে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া দলের বাঁধভাঙা উল্লাস আর নতমস্তক ক্রিকেটারের মুখ!
লর্ডসের ক্যামেরাম্যান ময়দানে ডোনাল্ডকে খুঁজে পাননি। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন নিজের অনুভূতি। গ্যালারিতে হাজির ছিলেন না, কমেন্ট্রি বক্সেও না। কিন্তু ফাইনালের দিন টিভির পর্দায় ঠায় নজর রেখেছিলেন ডোনাল্ড। বলেছেন, ‘এটা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ও দক্ষিণ আফ্রিকার খেলাধুলোর জন্য বিরাট জয়। এমন সাফল্য আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করবে। ৩০ বছর ধরে বন্ধ ছিল যে দরজা, তাকে হাট করে খুলে দেবে। হয়তো বছরের হিসেবে গোলমাল করে থাকতে পারি, কিন্তু এই জয় আমার ভেতরের যন্ত্রণা অনেকটাই লাঘব করেছে।’
কোন যন্ত্রণা? কোন কষ্ট? সাংবাদিকের প্রশ্নের আগেই ডোনাল্ড একগাল হেসে বলেন, ‘আমি এই নিয়ে বিস্তারে কিছুই বলছি না, আপনারা সবাই সবকিছু জানেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা টিম চ্যাম্পিয়নশিপে পারফর্ম করে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা টানা টেস্ট সিরিজ জিততে পারে।’
এটাই কি নজাগরণের ইঙ্গিত? মনে করছেন ডোনাল্ড। তাঁর কথায়, ‘আশা রাখি, এমন জয় আরও সাফল্যের পথ প্রশস্ত করবে। আমি তো এখন থেকেই আগামী বিশ্বকাপের জন্য দিন গোনা শুরু করেছি। এই দল ফের একবার ঐক্যবদ্ধ হবে। ভুলে গেলে চলবে না, সাদা বলের ক্রিকেটেও কিন্তু এই টিমেরই অনেক সদস্য মাঠে নামতে চলেছে!’
যে বিশ্বকাপের স্মৃতি ভুলতে চাইতেন ডোনাল্ড, তার জন্য এখন তর সইছে না। বাভুমাদের বিশ্বজয়ের এর চেয়ে বড় ‘হলমার্ক’ আর কী হতে পারে!