তাহলে কি রাহুল-ই এখন টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের নতুন রোহিত? প্রশ্নটা স্বাভাবিক। তবে উত্তরটা হয়তো আরও কয়েক ম্যাচের পর মিলবে। আপাতত একটা বিষয় পরিষ্কার—যেভাবে তিনি অভিজ্ঞতা, স্থিরতা আর টেকনিক মিশিয়ে ওপেনিংয়ের সুর বেঁধেছেন, তাতে টিম ইন্ডিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপদ হাতে।

কেএল রাহুল
শেষ আপডেট: 3 October 2025 11:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রধানত ওপেনে, অংশত মিডল অর্ডারে ভারতীয় ক্রিকেটে ঝড়ো ইনিংস মানেই রোহিত শর্মা! দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচের সুর বেঁধেছেন। প্রথম দশ ওভারেই প্রতিপক্ষের বোলিং ভেঙে চুরমার, ভারত পেয়েছে লড়াই জেতার পুঁজি।
সময়ের নিয়মেই টেস্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন রোহিত। জায়গা পূরণে ভারতীয় ক্রিকেট খুঁজছিল নতুন মুখ—যিনি ব্যাট হাতে ইনিংসের রাশ ধরবেন, সুর-তাল-ছন্দ বেঁধে দেবেন, আত্মবিশ্বাস জোগাবেন। প্রতিটি শর্ত মেনে, ধারাবাহিক পারফর্ম করে ঠিক সেই জায়গাটাই নিজের করে নিচ্ছেন কেএল রাহুল (KL Rahul)।
বিতর্কের শেষ নেই। কখনও ব্যাটিং অর্ডারের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো, কখনও ফর্মের ওঠা–নামা। কেউ তাঁকে বলেছে ‘অস্থির’, কেউ ‘আন্ডারপারফর্মার’। অথচ ইংল্যান্ড সফর গোটা ছবিটা পাল্টে দিয়েছে। ওপেনিং স্পটে ফিরেই ১০ ইনিংসে ৫৩২ রান! সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, রাহুল শুধু ফিরে আসেননি, ফিরে এসে নিজের জমি পোক্ত করেছেন। অস্ট্রেলিয়া ‘এ’-র বিরুদ্ধে দুরন্ত ইনিংস আবার প্রমাণ দিয়েছে, তাঁর ফর্ম নিছক আকস্মিক কিংবা কাকতালীয়—কোনওটাই নয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) বিপক্ষে সিরিজ শুরুর দিন আবার দেখা দিল সেই দৃশ্য। যশস্বী জয়সওয়াল (Yashasvi Jaiswal) যেখানে নিজের স্বভাবসিদ্ধ আগ্রাসনে এগোচ্ছেন, রাহুল সেখানে মাথা ঠান্ডা রেখে আঁকড়ে ধরলেন টেম্পো। জটিল ডেলিভারিতে ডিফেন্স, খারাপ বল পেলেই হাত খুলে ড্রাইভ! ফের ব্যাকফুটে ডিফেন্স কিংবা কঠিন পরীক্ষা নেওয়া ডেলিভারি ছেড়ে দেওয়া। তারপর একবার সেট হয়ে গেলেই মাটিতে নামানো শট… সব মিলিয়ে এই গোছানো, ছকে বাঁধা ইনিংসে ভিন্টেজ রোহিতের ছবি মনে পড়তে বাধ্য!
রাহুলের সবচেয়ে বড় শক্তিই হল দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা। প্রথম দিনের ইনিংসে একবার সাই সুদর্শনের (Sai Sudharsan) সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া কোথাও তাঁকে ঘাবড়াতে দেখা যায়নি। চোটও তাঁর মনোযোগ নষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রাক্তন উইকেটকিপার পার্থিব প্যাটেলের (Parthiv Patel) ভাষায়, ‘রাহুল ইংল্যান্ড সফর থেকে দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়েছে। যখন একটা দল ট্রানজিশনের মধ্যে দিয়ে যায়, তখন সিনিয়রদের এগিয়ে আসা জরুরি। রাহুল সেটাই করছে।’
বিশ্লেষকদের কাছে আজকের রাহুল অনেক বেশি স্থির, অনেক বেশি বিচক্ষণ। পরিণতও বটে! একসময় যিনি কখনও ওপেনার, কখনও মিডল অর্ডার—কোথাও যেন মানিয়ে নিতে পারছিলেন না, তিনি এখন জানেন তাঁর ভূমিকাটা ঠিক কী। দল কী চায়! ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রাক্তন ব্যাটার ড্যারেন গঙ্গার (Daren Ganga) চোখে, এই টেম্পোটা রাহুলের জন্য ‘ন্যাচারাল’। তিনি বলছেন, ‘রাহুল এখন জানে কখন বল ছেড়ে দিতে হবে, কখন রুখতে হবে, কখন পাল্টা আক্রমণ। এটাই তাঁর কেরিয়ারের সেরা সংস্করণ।’
আসলে লোকেশ রাহুলের ব্যাটিংয়ের ভিত তাঁর দক্ষ টেকনিক আর অটল ধৈর্য। ব্যাট ছোঁয়ানোর লোভ দমন, বলের লেংথ বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া—এই জায়গাগুলোতেও তিনি পরিণত। আগে যেখানে হঠাকারিতা বারবার বিপদে ফেলত, এখন সেই জায়গাতেই এসেছে পরিমিতি। আর তার ফলেই ভারতীয় টেস্ট দলে পেয়েছে রোহিত-উত্তর জমানার এক নতুন ‘টোন সেটার’।
এখনও দিন শেষ হয়নি। ৫৩ রানে অপরাজিত রাহুল হয়তো শতরানের দিকেও তাকিয়ে। ২০১৬ সালের পর ভারতের মাটিতে তাঁর টেস্ট শতক আসেনি। কিন্তু এর বাইরেও আসল জিনিস হল—তিনি টিম ইন্ডিয়ার ইনিংসের ছন্দ তৈরি করেছেন। প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছেন। দলকে ভরসা জুগিয়েছেন!
তাহলে কি রাহুল-ই এখন টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের নতুন রোহিত? প্রশ্নটা স্বাভাবিক। তবে উত্তরটা হয়তো আরও কয়েক ম্যাচের পর মিলবে। আপাতত একটা বিষয় পরিষ্কার—যেভাবে তিনি অভিজ্ঞতা, স্থিরতা আর টেকনিক মিশিয়ে ওপেনিংয়ের সুর বেঁধেছেন, তাতে টিম ইন্ডিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপদ হাতে। রোহিতের ছায়া থাকলেও, ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি তৈরি করছেন। ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা, আর সেই ভদ্রলোকোচিত ধৈর্য, কৌশল আর দায়িত্ববোধ নিয়েই রাহুল এখন ভারতীয় ইনিংসের সুর-তাল-ছন্দ বাঁধার প্রধান কন্ডাক্টর!