১৯৯০ সালের ৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা কেন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন রান পিপাসু এক অতি ধৈর্যশীল ব্যাটার, যাঁকে আউট করতে হিমশিম খেয়ে যেতেন বিপক্ষের বোলাররা।

কেন উইলিয়ামসন
শেষ আপডেট: 8 August 2025 13:06
তাঁকে বলা হয় নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের পরিত্রাতা। স্বর্গীয় আরেক নিউজিল্যান্ড গ্রেট মার্টিন ক্রো প্রথম তাঁকে ফ্যাব ফোর-এর একজন বলে অভিহিত করেছিলেন (বাকি তিনজন- জো রুট, স্টিভ স্মিথ এবং বিরাট কোহলি)। বিগত দেড় দশক বিশ্ব ক্রিকেটকে শাসন করে চলা সেই অসামান্য প্রতিভাবান এবং পরিশ্রমী এক ক্রিকেটারের নাম কেন স্টুয়ার্ট উইলিয়ামসন (Ken Stuart Williamson)। ১৯৯০ সালের ৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা কেন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন রান পিপাসু এক অতি ধৈর্যশীল ব্যাটার, যাঁকে আউট করতে হিমশিম খেয়ে যেতেন বিপক্ষের বোলাররা।
১৯৯০ সালের ৮ আগস্ট নিউজিল্যান্ডের তৌরঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন কেন। পিতা ব্রেট একজন সেলসম্যান ছিলেন, যিনি নিউজিল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৭ টিমের হয়ে খেলেছিলেন এবং মা স্যান্ড্রা বাস্কেটবল খেলে নাম অর্জন করেছিলে। কেনরা ৫ ভাই-বোন। যমজ ভাই লোগান এবং তিন বোন অ্যানা, কাইলি এবং সোফি। তিন বোন প্রত্যেকেই নামকরা ভলিবল প্লেয়ার ছিলেন এবং জাতীয় স্তরে নিউজিল্যান্ডের বয়স ভিত্তিক দলের অন্তর্গত ছিলেন। বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই খেলার একটা মহল ছিল, যা কেনকে পরবর্তী পর্যায়ে সাহায্য করেছিল।
ছাত্রাবস্থায় ২০০৭ সালে কেনের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়, যখন তিনি তৌরাঙ্গা বয়েজ কলেজের ছাত্র ছিলেন। অনূর্ধ্ব-১৯ অভিষেক ঘটে সেই বছরেই সফরকারী ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ টিমের বিরুদ্ধে। ২০০৮-এর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড টিমের অধিনায়ক নির্বাচিত হন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি ২০০৭ সালে নর্দার্ন ডিস্ট্রিকটের হয়ে অভিষেক করেন এবং এখনও তাদের হয়ে খেলে চলেছেন।
কেনের আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে ২০১০ সালে। কেন ২০১১ সালে ইংলিশ কাউন্টি সিজনে গ্লস্টারশায়ারের হয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বনেদি কাউন্টি ইয়র্কশায়ার তাঁকে সই করায় এবং মাঝখানে কিছুদিন বাদ দিলে টানা ২০১৮ অবধি তিনি ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলেন। ২০২৫ সালে মিডলসেক্স কাউন্টি জানায়, তারা উইলিয়ামসনকে এই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করছে।

কেন উইলিয়ামসনের একদিনের আন্তর্জাতিক অভিষেক ২০১০, ১০ আগস্ট ভারতের বিরুদ্ধে । ১৪ অক্টোবর ২০১০ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঢাকাতে তিনি তাঁর জীবনের প্রথম শতরান করেন এক দিনের আন্তর্জাতিকে, এবং নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসাবে পরিগণিত হন। ভারতের বিরুদ্ধে আহমেদাবাদে ৪ নভেম্বর, ২০১০ উইলিয়ামসনের টেস্ট অভিষেক ঘটে এবং প্রথম ইনিংসেই তিনি ২৯৯ বলে ১৩১ করেন। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসে অষ্টম ব্যাটার হিসাবে অভিষেকে শতরানের নজির রাখেন।
এর পরের ৩ বছর উইলিয়ামসনের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হয়ে ওঠার জন্য এই ৩ বছর তিনি বেছে নিয়েছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ২০১৪ জুনে তিনি করেন অপরাজিত ১৬১, এবং বিদেশের মাটিতে একটি অসাধারণ সিরিজ জয়ে তিনি হয়ে উঠলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধান রূপকার। ডিসেম্বর ২০১৪, ব্রেন্ডন ম্যাকালামের অনুপস্থিতিতে তিনি প্রথমবার ওডিআই এবং টি-টোয়েন্টিতে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক নির্বাচিত হলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে বুলাওয়েতে ৬৯ বলে অপরাজিত ১০০ করলেন। এর পর একদিনের আন্তর্জাতিকে ২০১৫ সাল। ৬৯ এবং ২৪২* করলেন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। এই অনবদ্য পারফরমেন্স এবং দু’টি ক্যাচ ধরে তিনি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হলেন । সেই সময় তিনি এবং রস টেলর নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের প্রধান স্তম্ভ হিসাবে পরিগণিত হচ্ছিলেন। ২০১৫ ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি নিউজিল্যান্ডের ৯৯তম ওডিআই সেঞ্চুরি করলেন এবং একই ম্যাচে রস টেলর ১০০তম সেঞ্চুরি করলেন। ১৭ জুন ২০১৫, উইলিয়ামসন একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পঞ্চম দ্রুততম এবং নিউজিল্যান্ডের দ্রুততম ক্রিকেটার হিসাবে ৭৮ ইনিংসে ৩০০০ রান সম্পূর্ণ করলেন। ডিসেম্বর ২০১৫-তে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীন উইলিয়ামসন এক ক্যালেন্ডার বছরে কোনও নিউজিল্যান্ড ব্যাটারের করা সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভেঙে ১১৭২ রান করলেন।
২০১৬ মার্চ মাসে কেন উইলিয়ামসন নিউজিল্যান্ডের টেস্ট, একদিন এবং টি-২০ অধিনায়ক নির্বাচিত হলেন। মাত্র সাড়ে ২৫ বছর বয়েসে এ এক অনবদ্য সম্মান। ব্রেন্ডন ম্যাকালাম অবসর নেওয়ার পর তাঁর ওপর এই গুরুভার ন্যস্ত করা হল। ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হল তাঁর দায়িত্ব। ইএসপিএন এবং ক্রিকবাজ তাঁকে টিম অব দ্য টুর্নামেন্টের অধিনায়ক নির্বাচিত করল।
২০১৬ আগস্ট মাসে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে সিরিজে উইলিয়ামসন বিশ্বের ত্রয়োদশ ব্যাটার হিসাবে অন্য সমস্ত টেস্ট খেলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে শতরান করার গৌরব অর্জন করলেন। মার্চ ২০১৮-তে অকল্যান্ডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১০২ করেন তিনি, যেটা তাঁর ১৮ তম শতরান ছিল। টেস্টে নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ শতরানকারী হিসাবে পরিগণিত হলেন। ৭ ডিসেম্বর ২০১৮, উইলিয়ামসন প্রথম নিউজিল্যান্ড ব্যাটার হিসাবে আইসিসি টেস্ট ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ে ৯০০ রেটিং পয়েন্ট অতিক্রম করলেন। ২০১৯ বাংলাদেশ সিরিজে নিউজিল্যান্ডের দ্রুততম ব্যাটার হিসাবে ৬০০০ রান সম্পূর্ণ করেন।
এর পর ২০১৯ আইসিসি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড বোর্ড তাঁকে অধিনায়ক নিযুক্ত করে। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ প্রদর্শন করে উইলিয়ামসন প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট বিবেচিত হলেন। ৫৭৮ রান দশ ম্যাচে, যা একটি বিশ্বকাপে একজন অধিনায়কের সর্বোচ্চ রান। এর জন্য আইসিসি এবং ইএসপিএন ক্রিকইনফো তাঁকে টিম অব দ্য টুর্নামেন্টের অধিনায়ক নির্বাচিত করে।
একজন ক্রিকেটারের যা স্বপ্ন- স্যার গারফিল্ড সোবার্স অ্যাওয়ার্ড- দশকের সেরা পুরুষ ক্রিকেটার এবং দশকের সেরা টেস্ট ক্রিকেটারের সম্মান- এই দুটোর জন্যই তিনি মনোনীত হন। ৪ ডিসেম্বর ২০২০, উইলিয়ামসন ২৫১ রান করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে, যা এখনও অবধি তাঁর সর্বাধিক টেস্ট স্কোর।
প্রারম্ভিক আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে তাঁরই নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড ভারতকে ৮ উইকেটে হারায়। ২০২১ আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপে উইলিয়ামসন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড উপর্যুপুরি তৃতীয়বার আইসিসির যে কোনও ইভেন্টের ফাইনালে পৌঁছয় এবং তাঁর অসাধারণ ৪৮ বলে করা ৮৫ সত্ত্বেও দল হেরে যায়। এই টুর্নামেন্টে তিনি দলের সবথেকে বেশি রান করা ব্যাটার ছিলেন।
২০২২-এ অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে খোলা মেনে খেলতে নেমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর জীবনের পঞ্চম দ্বিশতরান করেন এবং প্রথম কিউই ব্যাটার হিসাবে টেস্টে ৫টি ডাবল সেঞ্চুরি করেন। এরই সঙ্গে প্রথম নিউজিল্যান্ড ব্যাটার হিসাবে টেস্টে ২৫ টি শতরানের গৌরব অর্জন করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, উইলিয়ামসন রস টেলরকে অতিক্রম করে টেস্টে নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে অমরত্ব লাভ করেন। মার্চ মাসে তিনি তাঁর জীবনের ষষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরি করেন।
ধারাবাহিকতা, ধৈর্য এবং বনেদি টেস্ট ব্যাটিংয়ের আরেক নাম কেন উইলিয়ামসন। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে তিনি নিউজিল্যান্ডের প্রধান ব্যাটিং স্তম্ভ। নিউজিল্যান্ড এমন একটি টেস্ট খেলিয়ে দেশ যারা কোনদিন স্টার কালচারে বিশ্বাস করে না। দলগত নৈপুণ্যর ওপর ভর করা এই দলে উইলিয়ামসন যথার্থই একজন সুপারস্টার।
এবার আসুন একবার দেখে নেওয়া যাক উইলিয়ামসনের অসাধারণ টেস্ট এবং ওয়ানডে রেকর্ড
টেস্টে ১০৫ ম্যাচে উইলিয়ামসন এখনও অবধি ৯২৭৬ রান করেছেন, গড় ৫৪.৮৮। ৩৩ শতরান এবং ৩৭ অর্ধ-শতরান হাঁকিয়েছেন তিনি। ওয়ানডেতে ১৭৩ ম্যাচে ৭২৩৫ রান ৪৯.২১ গড়ে, শতরান ১৫টি ও অর্ধশতক ৪৭টি। পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে কেন উইলিয়ামসন কী জাতের প্লেয়ার।
চলুন এবার দেখে নিই কেন উইলিয়ামসন সমসাময়িক ক্রিকেটে কেন এত প্রভাবশালী। তাঁর প্রখর ব্যাটসম্যানশিপ এবং ধুরন্ধর ক্যাপ্টেন্সি ছাড়াও উইলিয়ামসন একজন বিশ্বমানের ফিল্ডার। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ রিফ্লেক্স, প্রত্যুত্পণ্যমতীত্ব এবং নির্ভরযোগ্য ফিল্ডিং তাঁকে একজন অসাধারণ ফিল্ডার বানিয়ে তুলেছে। গালি পজিশনে তিনি এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিল্ডার।
ক্যাপ্টেন হিসাবে উইলিয়ামসন নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দলের সাফল্য এখানে তুলে ধরা হল-
১. ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০২১ টি-২০ ফাইনাল খেলেছে নিউজিল্যান্ড।
২. প্রথম সরকারি আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেয়।
৩. চাপের মুখে অবিচল থেকে ঠান্ডা মাথায় একের পর এক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বিশ্বের একজন সর্বকালীন সেরা অধিনায়কের একজন।
শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও উইলিয়ামসন এক অসাধারন ব্যক্তিত্ব। তাঁর বিনম্র খেলোয়াড়ি মানসিকতা, নরম স্বভাব, বিপক্ষের জন্য সম্ভ্রম, তাঁকে সর্বকালীন সেরাদের তালিকায় একেবারে ওপরে রেখেছে। উইলিয়ামসনের প্রভাব শুধু নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেও সমান ভাবে প্রভাব ফেলেছে। স্পিরিট অব ক্রিকেট এবং উইলিয়ামসন তাই আজ সমার্থক।
এই অনন্য সাধারণ ক্রিকেটারকে খেলার পাঠক-পাঠিকা সবার তরফ থেকে জন্মদিনে (Birthday) অনেক শুভেচ্ছা।