অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে রুটের পরের কয়েকটি ইনিংসই হয়তো বলে দেবে—তিনি শুধু একজন ‘মহান ব্যাটসম্যান’। নাকি ক্রিকেটের অবিসংবাদী শ্রেষ্ঠদের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার যোগ্য!

সচিন ও রুট
শেষ আপডেট: 8 December 2025 13:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্রিসবেনে শতরানটা শুধু একটা অভিশাপ-মোচন নয়—জো রুটের কাছে ছিল এমন এক বোঝা ঝেড়ে ফেলা, যা প্রায় এক দশক ধরে টেনে বেড়াতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শতক না থাকা কেরিয়ারের একমাত্র দাগ। অ্যাশেজ শুরুর আগে তাই প্রশ্ন ছিল—এবার পারবেন? আসবে সেঞ্চুরি? নাকি খরা রইবে জারি?
দ্বিতীয় টেস্টেই ১৩৮ রানের দুরন্ত ইনিংসে যাবতীয় উত্তর দিলেন রুট। ঝেড়ে ফেললেন ‘ডাউন আন্ডারে ব্যর্থতা’-র তকমা। আপাতত অস্ট্রেলিয়া-জুজু নিয়ে কেউ সওয়াল তুলবে না।
কিন্তু পিঠোপিঠি দানা বেঁধেছে অন্য এক বিতর্ক—রুট কি সত্যিই এক প্রজন্মের প্রতিভা? পূর্বজ তারকা সচিন তেন্ডুলকরকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত? সেই স্তরে পৌঁছতে চলেছেন? নাকি সংখ্যার দৌড়ে এগোলেও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিতে এখনও দূর… বহুদূর?
গত চার বছরে ইংরেজ ব্যাটার এমন ধারাবাহিকতায় ব্যাট করছেন, যেখানে তাঁকে প্রায় ধরাই যায় না। ২০২১-এর পর থেকে নামের পাশে প্রায় ৬ হাজার রান, ২৩টি শতরান, গড় প্রায় ৫৭—এই পরিসংখ্যান আধুনিক ক্রিকেটের সংজ্ঞা পাল্টানোর জন্য যথেষ্ট। কেরিয়ারের প্রথম আট বছর এই একই রুট ছিলেন ধারাবাহিক, কিন্তু ‘রূপান্তরে’র সমস্যায় ভোগা এক ব্যাটার। নামের পাশে ১৭টি শতরান, কিন্তু ৪৯টি অর্ধশতরান।
ইদানীং সেই অঙ্ক বদলে গিয়েছে। রুট এখন বড় ইনিংসের কারিগর। ‘রূপান্তর’ আজ তেন্ডুলকরের রানের পাহাড় সত্যিই হাতের নাগালে এনেছে। রুটের সংগ্রহ ১৪ হাজার ছুঁইছুঁই। সামনে কেবল সচিন। ব্যবধান—মোটে আড়াই হাজারের কাছাকাছি। তিন বছরের মধ্যেই রেকর্ড ভেঙে ফেলবেন—এ নিয়ে সন্দেহ নেই।
কিন্তু ক্রিকেট শুধু পরিসংখ্যান নয়। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আরও কঠিন। সচিন নিজেকে ‘সর্বকালের সেরা’ ব্যাটসম্যানদের তালিকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন শুধুমাত্র রানের জোরে নয়, বরং এমন ধারাবাহিকতা দেখিয়ে, যা আজও অনুকরণীয়। যে দেশেই গেছেন, টেস্ট গড় ৪০-এর নিচে নামেনি—এই বৈশিষ্ট্য শ্লাঘনীয়। আর এখানেই রুটের সমস্যা শুরু। রুট দুর্দান্ত—হ্যাঁ। কিন্তু তিনি কি সব দেশে, সব পরিস্থিতিতে একইরকম ভয়ংকর? উত্তরটা অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকালেই মেলে।
ইংরেজ ব্যাটারদের কাছে অ্যাশেজ শুধু সিরিজ নয়—অগ্নিপরীক্ষা। ব্র্যাডম্যান, স্টিভ ওয়া, রিকি পন্টিং, স্টিভ স্মিথ—অস্ট্রেলিয়া–ইংল্যান্ড লড়াইয়ে নিজেদের কিংবদন্তি বানিয়েছেন। রুট সেই জমিতে দাঁড়াতে ব্যর্থ। ঘরের মাঠে ভাল খেলেন, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে? বারবার অসফল। ব্রিসবেনের সেঞ্চুরি সেই খাতায় আলো ফেলে ঠিকই। কিন্তু সেই আলো ছায়া কাটিয়ে ‘সেরা’-র দৌড়ে তাঁকে এগিয়ে দেয় কি?
চলতি সিরিজে এখনও তিন ম্যাচ বাকি। রুটের সামনে সুবর্ণ সুযোগ। তিনি যদি ধারাবাহিকভাবে বড় রান করেন, যদি ইংল্যান্ডকে ম্যাচে বারবার টেনে তোলেন, যদি ‘অস্ট্রেলিয়া-ফোবিয়া’ভেঙে দেন—তাহলে ‘GOAT-বিতর্কে’র পাল্লা তাঁর দিকে হেলে যেতে বাধ্য। না হলে? আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা হবেন ঠিকই, কিন্তু ‘দ্য গ্রেটেস্ট’? সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। যতই তিনি তেন্ডুলকরের রেকর্ড অতিক্রম করুন না কেন।
সচিনের সঙ্গে তুলনা করলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। ‘লিটল মাস্টার’ যখন খেলে গিয়েছেন, ভারতীয় ক্রিকেট তখন বদলের পথে। দলে নেই একাধিক সুপারস্টার। তবু একা হাতে অসংখ্য ম্যাচে পথ দেখিয়েছেন তিনি। রুটের ইংল্যান্ড অবশ্য বেশ কিছু সময় জুড়ে গভীরতা, শক্তি, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ টিম। তবুও তাঁকে সরতে হয়নি কেন্দ্রীয় ভূমিকা থেকে—এটা কৃতিত্বের। কিন্তু কড়া প্রতিপক্ষ, কঠিন পরিস্থিতি—এসবের বিরুদ্ধে সচিনের স্মরণিকা রুটের তুলনায় এখনও অনেক বেশি সমৃদ্ধ।
ইংরেজ ব্যাটার যদি সত্যিই তেন্ডুলকরকে ছাপিয়ে যেতে চান, শুধু রান নয়—তাঁকে লিখতে হবে নতুন গল্প। ‘কিংবদন্তি’ মানে শুধু রেকর্ড নয়—মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নেওয়া ইনিংস। ব্রিসবেন অপবাদ মুছে দেওয়ার প্রথম ধাপ। কিন্তু এখনও সিডনির ‘ম্যাজিক’, অ্যাডিলেডের ‘চরিত্র’ আর পার্থের ‘দৃঢ়তা’ দেখানো বাকি! অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে রুটের পরের কয়েকটি ইনিংসই হয়তো বলে দেবে—তিনি শুধু একজন ‘মহান ব্যাটসম্যান’। নাকি ক্রিকেটের অবিসংবাদী শ্রেষ্ঠদের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার যোগ্য!