সব মিলিয়ে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড সাক্ষী রইল এক অদ্ভুত, অস্বস্তিকর এবং স্মরণীয় হ্যান্ডশেক ড্রয়ের। ‘থিয়েটার অফ ড্রিমস’ ইংল্যান্ডের স্বপ্নপূরণ না করলেও নাটকীয়তার এতটুকু খামতি রাখল না! ওভালের গ্র্যান্ড ফিনালের সুর বেঁধে দিল ম্যাঞ্চেস্টারের শেষ প্রহর!
.jpeg.webp)
স্টোকস, ওয়াশিংটন ও জাদেজা
শেষ আপডেট: 28 July 2025 11:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাজবলের (Bazball) পাঠশালা ড্র করতে শেখায় না। হয় করো, নয়তো মরো। হয় জেতো নয় হারো। এই বাইনারির বাইরে তৃতীয় সম্ভাবনা ছেঁটে ফেলেছেন নয়া কিসিমের আগ্রাসী ক্রিকেট, যাকে সংবাদমাধ্যম ‘বাজবল’ আখ্যা দিয়েছে, তার উদগাতা ব্রেন্ডন ম্যাকালাম (Brendon Mccullum)।
কিন্তু কিউয়ি কোচের টোকটা পকেটে পুরে গতকাল লড়াই মিটমাট চেয়ে রবীন্দ্র জাদেজার (Ravindra Jadeja) দিকে হ্যান্ডশেকের (Ben Stokes Handshake) আর্জিতে হাত বাড়িয়ে দিলেন ইংরেজ অধিনায়ক বেন স্টোকস। একটু ভুল বললাম। বলা ভাল, হাত বাড়াতে বাধ্য হলেন। বাধ্য করল ওয়াশিংটন-জাদেজা জুটি। তাও ম্যাচ শেষের ১২ ওভার আগে! দু’জনেই তখন আশির কোঠায়। শতরান আসেনি। কিন্তু আসব-আসব করছে। পরাজয় এড়ানো গিয়েছে। ম্যাচ অমীমাংসিত রেখেই ময়দান ছাড়তে হবে দু’পক্ষকে। কিন্তু সেটা সেঞ্চুরি না করেই? তাও আবার ইংল্যান্ডের মাটিতে… কেরিয়ারে প্রথমবার… তা কীভাবে সম্ভব!
ফলত যা হওয়ার তাই হল। এতটুকু দাক্ষিণ্য না দেখিয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়কের করমর্দনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন জাদেজা (Handshake Controversy)। মুখে নীরব থেকেও শরীরী ভাষায় একই জবাব দিলেন ওয়াশিংটন (Washington Sundar)। আর ঠিক তখনই মাঠে শুরু হল ক্রিকেটীয় কূটনীতির অভিনব নাটক।
জাদেজার প্রত্যাখ্যানে আঁতে ঘা লাগল স্টোকসের। এগিয়ে এলেন। তারপর চোখে চোখ রেখে বলে উঠলেন, ‘জাড্ডু, তুমি কি ব্রুক আর ডাকেটকে খেলেই তোমার টেস্ট শতরান করতে চাও?’ স্টাম্প মাইকে কথাটা স্পষ্ট শোনা গেল। যার জবাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন জাদেজা, ‘আমার কিছু করার নেই। কী করব আমি?’
উত্তর কানে যেতেই জ্যাক ক্রলি বলে উঠলেন, ‘তুমি চলে যেতে পারো, শুধু হ্যান্ডশেক সেরে নাও!’
এরপর আর মুখে নয়, ব্যাটেই জবাব দিলেন জাদেজা। অন্যদিকে শতরানকে হীন, লঘু ও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করতে অদ্ভুত রণকৌশল বেছে নিল ইংল্যান্ড। চালিয়ে গেল লোপ্পা বল, ক্রিকেটের পরিভাষায় ‘লুপি ডেলিভারি’। হাত ঘোরালেন পার্ট টাইম বোলাররা। বল করতে এলেন হ্যারি ব্রুক। আর তাঁর ওভারেই স্টেপ আউট করে লং অনের উপর দিয়ে সোজা ছয় মেরে নিজের দ্বিতীয় টেস্ট শতক সেরে ফেললেন জাডেজা। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা নির্বাক পুতুল! কেউ অভিবাদন জানাননি। হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিশ্চল প্রতিমার মতো!
এই দৃশ্য দেখে কমেন্ট্রি বক্সে মাইক হাতে ক্ষোভ উগরে দেন গাভাসকর। বলেন, ‘ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা জাদেজার শতরানকে অভিনন্দন জানাল না। আমি বলব ভারত যেন পুরো পনেরো ওভার খেলেই যায়!’ এরপর জুড়ে দেন, ‘ইংল্যান্ড যদি ৬৬৯ রানে না থেমে ব্যাট করে, তাহলে ভারতের ক্রিকেটাররাও নিজেদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি নেবে!’
শেষমেশ ওয়াশিংটনের শতরানের পর নাটকীয় টেস্টের যবনিকা নামল। গতকাল আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করেন তিনি। এরপরই হ্যান্ডশেক। কিন্তু সেটা স্রেফ লোক-দেখানো, আনুষ্ঠানিক কৃত্য। করতে হয় তাই করা। রুষ্ট মুখে মাঠ ছাড়েন স্টোকস। পিছু পিছু দলের বাকি খেলোয়াড়। ম্যাচ ড্র। কিন্তু নাটক তখনও শেষ হয়নি। ধারাভাষ্যে প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল আথারটন প্রশ্ন করলেন ইংরেজ শিবিরের স্পিরিট নিয়ে। প্রথম সারির বোলাররা কেন হাত ঘোরালেন না? সওয়াল তুলে প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ক বলে দেন, ‘শেষ দিকে ব্রুকের এই বল করা একদম হাস্যকর। এই শতরান, এমন মুহূর্ত ওয়াশিংটনের প্রাপ্য!’
পরে সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘটনা প্রসঙ্গে দুই অধিনায়কই মুখ খোলেন। শুভমানের কথায়, ‘এই সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণভাবেই দুই ব্যাটারের ছিল। ওরা অসাধারণ খেলেছে। দু’জনেই আশির ঘরে ছিল। ওরা সেঞ্চুরির যোগ্য!’
অন্যদিকে বেন স্টোকসের সাফাই, ‘ভারত কঠিন পরিশ্রম করেছে। দু’জনেই দারুণ খেলেছে। আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, একটাই ফল সম্ভব—ড্র। আমি আমার পেসারদের চোট-আঘাতের ঝুঁকি নিতে চাইনি। ডসন অনেক ওভার বল করেছে, ওর শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, পায়ের পেশিতে টান ধরছিল। তাই ড্রয়ের প্রস্তাব জানাই!’
যদিও এই কৈফিয়তেও বেশ কিছু প্রশ্ন অধরা রয়ে গেল—দুই ব্যাটার যখন শতরানের মুখে, তখন তাদের সাফল্যকে খেলো দেখাতে ডাকেট ও ব্রুককে দিয়ে বোলিং করানো কতটা গ্রহণযোগ্য? প্রতিপক্ষের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি না জানিয়ে কোন বার্তা দিল ইংল্যান্ড? আর যদি সত্যিই খেলা বন্ধ করতে চাইতেন স্টোকস, তবে নিজেরা ৬৬৯ রান পর্যন্ত ব্যাট করলেন কেন?
সব মিলিয়ে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড সাক্ষী রইল এক অদ্ভুত, অস্বস্তিকর এবং স্মরণীয় হ্যান্ডশেক ড্রয়ের। ‘থিয়েটার অফ ড্রিমস’ ইংল্যান্ডের স্বপ্নপূরণ না করলেও নাটকীয়তার এতটুকু খামতি রাখল না! ওভালের গ্র্যান্ড ফিনালের সুর বেঁধে দিল ম্যাঞ্চেস্টারের শেষ প্রহর!