ক্রিকেটে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ জায়গা আসলে সেই মুহূর্ত, যখন আপনি একা। তবু পুরো ম্যাচ আপনার চারপাশে ঘুরছে। ঈষাণ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন—তিনি শুধু দলে ফিরেছেন তা নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতেও প্রস্তুত!
.jpeg.webp)
ঈশান ও বিরাট
শেষ আপডেট: 16 February 2026 12:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্রিকেটে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চারদিকের শব্দ থেমে যায়। গ্যালারির গর্জন, প্রতিপক্ষের স্লেজিং, ময়দানের স্নায়ুচাপ—সব যেন ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে। ব্যাটসম্যান তখন একা। সামনে শুধু ডেলিভারির চ্যালেঞ্জ!
২০২২ সালে মেলবোর্নে (Melbourne Cricket Ground) নিজেকে সেই স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। টি২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর ৮২ রান আজও ভারতীয় ক্রিকেটের এক অবিস্মরণীয় ইনিংস। চার বছর পর, ২০২৬-এর টি-২০ বিশ্বকাপে কলম্বোয় (Colombo) সেই একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার পর নিঃসঙ্গ অথচ স্বচ্ছ বলয়ে ঢুকে পড়লেন ঈশান কিষাণও (Ishan Kishan)। গন্তব্য এক, তবে পথ আলাদা। কোহলি পৌঁছেছিলেন লড়াই করে, সংঘর্ষ সেরে। ঈশান একচ্ছত্র দাপট দেখিয়ে।
ঈশান ‘ইন দ্য জোন’
খেলোয়াড়রা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে নেন, মহাকাব্যিক কোনও ইনিংসের সময়, তাঁরা ‘ইন দ্য জোন’ ছিলেন। বাইরের তর্জন-গর্জন কিছুই সেভাবে স্পর্শ করেনি। কথাটা শুনতে যত সহজ, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ঠিক ততটাই কঠিন। গতকালের ম্যাচ এর সার্থক দৃষ্টান্ত! কলম্বোর পিচ ঘুরছিল। পাকিস্তান দল ভরতি স্পিনার নিয়ে নেমেছিল—অফস্পিন, লেগস্পিন, বাঁ-হাতি স্পিন। এমনকি ‘মিস্ট্রি’ স্পিনার পর্যন্ত জায়গা করে নেয়! টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) লড়াই শুরুর আগেই জানিয়ে দেন, এই ঘূর্ণির ধরন ‘সিলেবাসের বাইরে’! কিন্তু ঈশানের কাছে কিছুই বুঝি কঠিন নয়। ৪০ বলে ৭৭ রান। স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯৩। সেটাও এমন এক পিচে, যেখানে তিলক বর্মা (Tilak Varma) ও সূর্য প্রায় বল-পিছু-এক রানের গতিতে খেলেছেন! ঈশান সমস্ত জারিজুরির তত্ত্ব নস্যাৎ করে এগিয়েছেন প্রায় দ্বিগুণ গতিতে।
অথচ চ্যালেঞ্জ ছিল প্রকাণ্ড! প্রথম ওভারেই অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) আউট। স্কোর ১/১। টানটান উত্তেজনা। ভারতীয় সমর্থকদের মনে অস্বস্তি। ঠিক তখনই শাহিন আফ্রিদির (Shaheen Afridi) বাউন্সারকে মিডউইকেটের ওপর দিয়ে গ্যালারিতে পাঠালেন ঈশান। শুধু ছক্কা নয়, সাধাসিধা ওভারবাউন্ডারি হয়ে উঠল জোরদার ঘোষণা। বুঝিয়ে দিলেন—এই ইনিংস এবার থেকে একমাত্র তাঁর শর্তে এগবে!
ধৈর্যের শিল্প: তাড়াহুড়ো নয়, নিয়ন্ত্রণ
ঈশানের ইনিংসের বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর ‘ওয়েটিং গেম’। সুনীল গাভাসকর (Sunil Gavaskar) যাকে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ‘ও বলের জন্য অপেক্ষা করে। ক্রস-ব্যাটেড শটও ও হুট করে মারে না!’ এই ধৈর্যই পার্থক্য গড়ে দেয়। স্পিনিং পিচ ব্যাটসম্যানকে তাড়াহুড়োয় কিংবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
কিন্তু ঈশান যেন সময়কে সুতোর মতো হাতে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। যার প্রমাণ: সলমন আলি আঘাকে (Salman Ali Agha) ইনফিল্ডের উপর দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে ছুড়ে ফেলা, আবরার আহমেদকে (Abrar Ahmed) সুইপ করে গ্যালারিতে পাঠানো! যেই একবার ফিল্ড ছড়িয়ে গেল, বুদ্ধি খাটিয়ে দেরিতে কাট খেললেন।
গতরাতে ফিফটি এল ২৭ বলে। ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপ ম্যাচে দ্রুততম অর্ধশতরান। ঈশান যখন ক্রিজে, রান উঠছিল প্রায় ১০ রান প্রতি ওভারে। তিনি আউট হতেই গড় নেমে আসে ৭-এ। দলের প্রথম ৮৮ রানের মধ্যে তাঁর ব্যাট থেকেই ৭৭! এই পরিসংখ্যান বুঝিয়ে দেয় বোঝায়, ম্যাচ তখন আদতে কার নিয়ন্ত্রণে।
‘অ্যান্টি-কোহলি’ ইনিংস: দুই পথ, এক নিঃসঙ্গতা
মেলবোর্নে কোহলি ঢুকেছিলেন ‘সারভাইভাল মোডে’। ভারত ৩১/৪। চারদিক চাপ। প্রতিটা ওভার বাঁচিয়ে এগতে থাকেন। তাঁর ৮২ রানের অপরাজিত ইনিংস আসলে ধৈর্যের জয়।
গতকাল কলম্বোয় ঈশান দলকে বাঁচতে নয়, আক্রমণ করতে এয়েছিলেন। আর তাই বিরাট যখন চাপ শুষে নিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করছেন, ঈশান উলটো পথে হেঁটে চাপ বানিয়ে পাকিস্তানকে ভেঙে দিলেন। দুই ইনিংস প্রকৃতিগতভাবে এখানেই আলাদা। তবু মিল এক জায়গায়—দু’জনেই পৌঁছে যান সেই নিঃসঙ্গ ‘জোনে’, যেখানে বাইরের কিছুই আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
প্রত্যাবর্তনের গল্পও কম নাটকীয় নয়। দলে ঢুকেছিলেন শেষ মুহূর্তে। শুরুর আলোচনায় তিনি কার্যত উধাও, গায়েব! কিন্তু ফিরলেন। কীভাবে? এখানেও ছক ভেঙেছেন তরুণ ঝাড়খণ্ডি। প্রত্যাবর্তন সাধারণত ধীরে ধীরে হয়। ঈশান সেই ধাপ এড়িয়ে সরাসরি আলোয় চলে এলেন। গাভাসকরের উচ্ছ্বাসভরা কথায়, ‘এই না হলে কামব্যাক!’
মেলবোর্নে কোহলি অনিশ্চয়তার পর্দা ফুঁড়ে জয় নিশ্চিত করেছিলেন। কলম্বোয় ঈশান অনিশ্চয়তাকে জায়গাই দেননি। ক্রিকেটে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ জায়গা আসলে সেই মুহূর্ত, যখন আপনি একা। তবু পুরো ম্যাচ আপনার চারপাশে ঘুরছে। ঈষাণ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন—তিনি শুধু দলে ফিরেছেন তা নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতেও প্রস্তুত!