মঙ্গলবার সকালে জয় নিশ্চিত করলেই সিরিজ ভারতের দখলে। তবু এই ম্যাচে যেটা থেকে গেল, তা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মনোবল—পরাজয় সত্ত্বেও আত্মসম্মান জিতে নেওয়ার গল্প।

ভারতীয় দল
শেষ আপডেট: 13 October 2025 19:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে (Arun Jaitley Stadium) চতুর্থ দিনের শেষে ছবিটা প্রায় পরিষ্কার—ভারতের (India) সামনে জয়ের পথ একদম খোলা। শেষ দিনে তুলতে হবে মাত্র ৫৮ রান, হাতে ৯ উইকেট। সিরিজ (IND vs WI Test Series 2025) পকেটে পুরে ফেলার ব্যাপারটা তাই সময়ের অপেক্ষা। তবু সোমবার খেলা শেষে যা রয়ে গেল, তা হল ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) এক বিরল মানসিক দৃঢ়তা—যা সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে দেখা যায়নি।
তৃতীয় দিনের শেষে যখন ফলো অনে (Follow-On) তাড়া খেয়ে দুই উইকেট হারিয়ে বসেছিল অতিথি দল, তখনও কেউ ভাবেননি ম্যাচ পঞ্চম দিন পর্যন্ত গড়াবে। কিন্তু সোমবার পুরো গল্পটাই বদলে দিলেন জন ক্যাম্পবেল (John Campbell) ও শাই হোপ (Shai Hope)। দু’জনেই হাঁকালেন অসাধারণ সেঞ্চুরি, যা এক সময় ভারতের বোলারদের হতাশ করে তোলে। এক বছরের মধ্যে এই প্রথম ৩০০-র উপর রান বানাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর সেটাও কিনা ভারতের মাটিতে!
হোপের ব্যাটিং চোখধাঁধানো। ১২টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজানো ১০৩ রানের ইনিংস—আট বছর পর টেস্টে এল তাঁর শতরান। লাল বলের ক্রিকেটে বহুদিন ধরেই ‘অনাবিষ্কৃত প্রতিভা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। কিন্তু দিল্লিতে নিজের ছন্দ ফেরালেন পুরোপুরি। অন্য প্রান্তে ক্যাম্পবেলও (Campbell) পেলেন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। প্রথম ইনিংসে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে আগ্রাসন ও ধৈর্য মিলিয়ে তৈরি করলেন এক স্মরণীয় ইনিংস।
তবে ভারতীয় বোলাররা (Indian Bowlers) সহজে হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয় নতুন বল হাতে নিয়েই চিত্রনাট্য ঘুরিয়ে দেন মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj)। অফ স্টাম্পের বাইরে সামান্য লো ডেলিভারিতে বোল্ড হন হোপ—তারপরই ধস। ২৭১/৩ থেকে ৩১১/৯—মাত্র ৪০ রানে ছ’উইকেট উড়ে গেল। অধিনায়ক রোস্টন চেজ (Roston Chase) কুলদীপ যাদবের (Kuldeep Yadav) ফাঁদে পড়ে শর্ট মিড উইকেটে ধরা দেন। একই স্পিনারের থাবায় আউট টেভিন ইমলাক (Tevin Imlach) ও খারি পিয়েরে (Khary Pierre)।
ঠিক তখনই শুরু দিনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত লড়াই—জাস্টিন গ্রিভস (Justin Greaves) ও জেডেন সিলসের (Jayden Seales) অন্তিম উইকেটের জুটি। এক প্রান্তে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার, অন্য প্রান্তে টেইলএন্ডার—দু’জনের জুটিতে যোগ হয় ৭৯ রান। গ্রিভস পৌঁছে যান পঞ্চাশে (৫০), সিলস মারেন দুরন্ত এক পুল শট বুমরার (Jasprit Bumrah) বলে। মুহূর্তেই লিড ছাড়িয়ে যায় একশো।
এমন সময়ই অধিনায়ক শুভমান গিলের (Shubman Gill) নেতৃত্বের পরীক্ষা শুরু। একাধিক বোলার বদল, ফিল্ড পরিবর্তন—তবু সাফল্য মিলছিল না। ধ্রুব জুরেল (Dhruv Jurel) ফেললেন একাধিক ক্যাচ, কুলদীপের শরীরে ধকল স্পষ্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠল প্রশ্ন—নীতীশ রেড্ডিকে (Nitish Reddy) কেন এক ওভারও বল দেওয়া হল না?
অবশেষে পুরনো অভ্যাসেই ভরসা রাখতে হল ভারতকে। বুমরাহ ফের আক্রমণে এসে সিলসকে ভুল করতে বাধ্য করেন—তাঁর শট উড়ে যায় ওয়াশিংটন সুন্দরের (Washington Sundar) হাতে। শেষ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস (৩৯০), ভারতের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১২১।
চতুর্থ দিনের শেষ বিকেলে ব্যাট করতে নেমে ভারতের শুরুটা তেমন সুখকর ছিল না। যশস্বী জয়সওয়াল (Yashasvi Jaiswal) দ্বিতীয় ওভারেই লং-অনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন, কিন্তু শুভমান গিল ও সাই রাহুল (Sai Rahul) মিলে ইনিংস সামলে নেন। দু’জনের জুটিতে আসে ৫৪ রান, আর দিন শেষে স্কোরবোর্ডে ভারত ৬৩/১।
এখন বাকি কাজটা স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা। মঙ্গলবার সকালে জয় নিশ্চিত করলেই সিরিজ ভারতের দখলে। তবু এই ম্যাচে যেটা থেকে গেল, তা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মনোবল—পরাজয় সত্ত্বেও আত্মসম্মান জিতে নেওয়ার গল্প। দিল্লির গরমে, চতুর্থ দিনের ধুলোভরা বাইশ গজে, যে লড়াইটা দেখা গেল—সেটা তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে ‘পরাজয়ের মধ্যে প্রাপ্তি’-র নজির হয়ে থাকবে।