গতরাতে ভারতের ১২ ম্যাচে জয়ের ধারা থামল। নেট রান রেট নেমে গেল -৩.৮০০-তে। সুপার এইটের অঙ্ক জটিল হল। কিন্তু এই পরাজয় শুধু হিসেবের নয়।

ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা
শেষ আপডেট: 23 February 2026 11:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফ্লাডলাইটের আলোয় ভরা স্টেডিয়াম। গ্যালারি ভর্তি এক লাখ দর্শক। শুরুতে বিপুল উল্লাস, মাঝে চাপা ফিসফাস, শেষ শ্মশানের নীরবতায়! নেপথ্যে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে (Narendra Modi Stadium) দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) কাছে ৭৬ রানে টিম ইন্ডিয়ার লজ্জার পরাজয়। শুধু স্কোরলাইন নয়, বার্তাও স্পষ্ট, জোরালো—প্রোটিয়ারা এবার চব্বিশের ক্ষত বুকে নিয়ে মাঠে নেমেছে। স্রেফ লড়াই করতে নয়, খেতাব জিতে নিতে ভারতে এসেছে।
গতরাতের পারফরম্যান্স এর জ্বলন্ত প্রমাণ! ম্যাচ শেষে ময়নাতদন্তে ভারতের ব্যর্থতার পাশাপাশি যে কয়েকটি বিষয় উঠে আসছে, তাতে স্পষ্ট, এডেন মার্করামরা পরিকল্পনা করেই পেতেছিলেন ফাঁদ। সূর্যকুমার যাদবদের পরাজয় তাই আচমকা নয়। ফাঁকগুলো আগে থেকেই ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা সেগুলো খুঁজে বের করেছে মাত্র!
প্রস্তুতি চুপিসারে
ম্যাচের আগের দিন দক্ষিণ আফ্রিকার অনুশীলনে ভিড় ছিল না। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, গোটা স্কোয়াড বুঝি সুপার এইটে নামার আগে ছুটি কাটাচ্ছে। আড়ালে কেউ সাড়াশব্দ পায়নি, আসল কাজ সেরে ফেলা হয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা আগে। গত পরশু দুপুরের তীব্র গরমে পুরো বোলিং ইউনিট নেমেছিল প্র্যাকটিসে। দর্শক নেই, আলো নেই—ফাঁকা মাঠে স্রেফ পরিকল্পনা কষে নেওয়া। মার্করাম নিজে বল হাতে বারবার নির্দিষ্ট ডেলিভারি ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন—ব্যাক অফ লেংথে পড়ে বাঁ-হাতি ব্যাটারের স্টাম্পে ঢুকে আসা বল। রবিবার ঠিক সেই চিত্রই ময়দানে ফুটে উঠল। স্পেল শুরু করলেন মার্করাম। পয়লা ওভারেই অনুশীলনে প্র্যাকটিস করা ডেলিভারি! ঈশান কিষাণ (Ishan Kishan) ভুল শট খেললেন। বলা ভাল, খেলতে বাধ্য হলেন। শূন্য রানে আউট। কাজের কাজ শেষ, মার্করামও আর বোলিংয়ের লোভ দেখাননি। পরিকল্পনার প্রথম ধাপ সফল।
গতি নয়, ছলনাই অস্ত্র
এরপর শুরু ভিন্ন রণনীতি। লুঙ্গি এনগিডি (Lungi Ngidi) নেটে ধীর গতির বল নিয়ে নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। ম্যাচে প্রথম বল ফুল পেসে। তারপর গতি কমানো, স্লোয়ার, কাটার—ছন্দ ভাঙা। ভারতীয় ব্যাটাররা বুঝতেই পারলেন না, কোন ডেলিভারি কতটা দ্রুত আসবে।
অন্যদিকে মার্কো জানসেন (Marco Jansen)। কাজে লাগালেন নাকল-বল। ফাঁদে পা দিলেন অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma)। দুরন্ত ক্যাচ করবিন বশের (Corbin Bosch)। যিনি শুধু ফিল্ডিংয়েই থামেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর (Washington Sundar) ও সূর্যকুমার যাদবকে (Suryakumar Yadav) শর্ট অফ লেংথে বিভ্রান্ত করেছেন। ১৪০ কিমি আর ১২০ কিমির মধ্যে গতি বদলে ব্যাটারদের দ্বিধায় রেখেছেন। ৪৩ রানে ৪ উইকেট পতন। তখনই ম্যাচের ভারসাম্য একপেশে হয়ে যায়।
মহারাজের শেষ আঘাত
১৮৭ তাড়া করা অসম্ভব না হলেও দরকার ছিল জুটি। সেই সুযোগ দেননি কেশব মহারাজ (Keshav Maharaj)। নেটে তিনি দু’ধরনের ডেলিভারি ঝালিয়েছিলেন—একটা লুপ করে ভাসানো, আরেকটা ফ্ল্যাট ও দ্রুত। ম্যাচে প্রথম দুই ওভারে কিছু রান গেলেও পরিকল্পনা পাল্টায়নি। যার ফল মিলল ১৫তম ওভারে। মহারাজ ছিনিয়ে নিলেন তিন উইকেট। হার্দিক পান্ডিয়া (Hardik Pandya), রিঙ্কু সিং (Rinku Singh), অর্শদীপ সিং (Arshdeep Singh)—একই ওভারে তিন শিকার। তিনটি বলই ফ্ল্যাট, হিটিং আর্কের বাইরে। তিনজনই বড় শট খেলতে গিয়ে ব্যর্থ। সেখানেই ম্যাচ শেষ।
গ্যালারির নীরবতা, অঙ্কের চাপ
গতরাতে ভারতের ১২ ম্যাচে জয়ের ধারা থামল। নেট রান রেট নেমে গেল -৩.৮০০-তে। সুপার এইটের অঙ্ক জটিল হল। কিন্তু এই পরাজয় শুধু হিসেবের নয়। দিনের শেষে লেখা থাকবে: ভারত আমদাবাদের মাঠে পরিকল্পনা বনাম আত্মতুষ্টির লড়াইয়ে হেরে ভূত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা জানত, এই পিচে ২০০ রান নাও হতে পারে। ফলে গতি নয়, বৈচিত্র্য কাজে দেবে। ভারতও এটা বুঝল। কিন্তু অনেক দেরিতে।
স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময় তেমন শোরগোল কানে আসেনি। খাবারের দোকান ফাঁকা। শহর নিস্তব্ধ। ক্রিকেট আমদাবাদে শুধু খেলা নয়, সান্ধ্য আড্ডার হট টপিকও বটে। সেই সন্ধ্যাই কাল ম্লান করে দিল প্রোটিয়ারা! হারের জন্য ভাগ্যকে দুষে লাভ নেই। রণচতুর দক্ষিণ আফ্রিকা আগেই স্ক্রিপ্ট লিখে রেখেছিল। ফ্লাডলাইট জ্বলে ওঠার পর ময়দানে সেটাই মঞ্চস্থ করল কেবল।