সংযোগের পাকিস্তান-সংক্রান্ত কঠোর কিন্তু ন্যায়সঙ্গত ভূমিকার প্রশংসা করছে ক্রিকেট মহল। দৃঢ় অবস্থান বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক চাপ বা হুমকিতে তিনি নতজানু হবেন না।

সংযোগ গুপ্ত
শেষ আপডেট: 18 September 2025 15:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এশিয়া কাপে (Asia Cup 2025) ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে হাত না মেলানো বিতর্কে কার্যত ভেসে গিয়েছে ক্রিকেটবিশ্ব। পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড (PCB) রীতিমতো যুদ্ধং দেহি ভঙ্গিতে নেমেছিল। অভিযোগ তুলেছিল ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটের (Andy Pycroft) বিরুদ্ধে। দাবি করেছিল, তাঁকে অবিলম্বে সরাতে হবে। না হলে তারা খেলবে না। এমন অবস্থায় যিনি একাহাতে সামনে দাঁড়িয়ে এই ‘আবদার’ খারিজ করেছেন, তিনি জয় শাহ নন, আইসিসির (ICC) নবনিযুক্ত ভারতীয় সিইও সংযোগ গুপ্ত (Sanjog Gupta)।
১৪ সেপ্টেম্বর দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে টসের পরেই নাটকের সূত্রপাত। ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) করমর্দন করেননি পাকিস্তানের অধিনায়ক সলমন আঘার (Salman Agha) সঙ্গে। দলপত্র বিনিময়ও হয়নি। ভারতের ব্যাখ্যা ছিল সোজাসাপটা—এপ্রিলের পহেলগামে জঙ্গিহানায় ২৬ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের সঙ্গে সৌজন্য-সৌহার্দ্য সম্ভব নয়। সেই অবস্থানেই আগাগোড়া অনড় থাকেন সূর্য।
পাকিস্তান বোর্ড অবশ্য দায় চাপায় পাইক্রফটের ঘাড়ে। অভিযোগ তোলে, তিনিই নাকি নাটের গুরু। পাক অধিনায়ককে হাত না মেলানোর উপদেশ দেন। এমনকি টিমশিট বিনিময়েরও বিরোধিতা করেছেন। এই আচরণকে ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেটে’র বিরোধী বলে চিহ্নিত করে তাঁকে সরানোর দাবি তোলে পিসিবি।
তারপর শুরু তুমুল টানাপড়েন। একের পর এক ইমেল গেল–এল। তিন–তিনবার পাইক্রফটকে সরানোর জন্য চাপ তৈরি করল পাকিস্তান। প্রস্তাব উঠল, বদলি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হোক রিচি রিচার্ডসনকে (Ritchie Richardson)। এমনকি ১৭ সেপ্টেম্বর আমিরশাহির (UAE) বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে পাক দল নির্ধারিত সময়ে হোটেল ছেড়ে বেরল না। স্পষ্ট হুমকি: যদি রেফারি পালটানো না হয়, তারা মাঠে নামবে না।
এই সঙ্কটমোচনে এগিয়ে আসেন সংযোগ। চলতি বছর জুলাই মাসে আইসিসির সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। ক্রিকেট প্রশাসনে এটাই ছিল প্রথম বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় শুরুতেই পেয়ে গেলেন ফুল মার্কস। সংবাদমাধ্যম ‘ক্রিকবাজে’র খবর, পুরো আলোচনায় সামনের সারিতে ছিলেন গুপ্ত। পাকিস্তানের প্রতিটি ইমেলের পালটা জবাব গিয়েছে তাঁর দপ্তর থেকে। মোট ছয় দফায় ইমেল আদানপ্রদান হয়েছে। তিনটি পিসিবির তরফে, তিনটি আইসিসির পক্ষ থেকে। প্রতিবারই এক উত্তর—পাইক্রফটকে সরানো হবে না।
আইসিসির অবস্থান ছিল একেবারেই স্পষ্ট। তারা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালায়। রিপোর্টে দেখা যায়, পাইক্রফট কোনও নিয়ম ভাঙেননি। বরং, টুর্নামেন্ট আয়োজকদের কাছ থেকে যে নির্দেশ পেয়েছিলেন, সেটাই দুই অধিনায়ককে জানিয়েছেন মাত্র। উদ্দেশ্য ছিল টসের মর্যাদা রক্ষা করা এবং যাবতীয় বিভ্রান্তি এড়ানো। ফলে তাঁকে সরানোর কোনও ভিত্তি নেই। প্রোটোকল দেখা রেফারির কাজ নয়, আয়োজনকারীদের দায়িত্ব।
পাকিস্তান বোর্ড এরপরও নাছোড়বান্দা। তখন আইসিসির ভেতরে আলোচনা হয়, অন্তত এক ম্যাচের জন্য হলেও পাইক্রফটকে সরানো যায় কি না, যাতে পাকিস্তান কিছুটা ‘মুখরক্ষা’ করতে পারে। কিন্তু এখানেও শেষ কথা বলেন সংযোগ। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনওরকম আপস করা যাবে না। প্রমাণ ছাড়া এমন নজির তৈরি হলে ভবিষ্যতে যে কোনও দেশ একইভাবে চাপ সৃষ্টি করবে। এতে ম্যাচ অফিসিয়ালদের কর্তৃত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এইভাবে পাইক্রফট ইস্যুতে পিসিবির দাবি একেবারে পত্রপাঠ খারিজ হয়ে যায়। শেষমেশ নাটক মেটে। পাকিস্তানের মাঠে নামে। ততক্ষণে পরিষ্কার—আইসিসির নতুন ভারতীয় সিইও কঠিন ঠাঁই। তাঁকে টলানো সম্ভব নয়। মেয়াদের শুরুতেই পাকিস্তানকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, অকারণ চাপ খাটিয়ে ফল মিলবে না।
কিন্তু কে এই সংযোগ গুপ্ত? কেন তাঁর নাম এখন এত আলোচনায়?
ভারতের ক্রীড়া–মিডিয়ার সঙ্গে সংযোগের যোগ নিবিড় ও বহু পুরনো। ২০১০ সালে স্টার ইন্ডিয়ায় যোগ দিয়ে অল্প সময়েই উঠে আসেন শীর্ষে। ২০২০ সালে ডিজনি স্টারের প্রধান ক্রীড়া সম্পাদক। তাঁর হাত ধরে চালু হয় বহুভাষিক সম্প্রচার, ডিজিটাল–ফার্স্ট কাভারেজ, মহিলাদের খেলাধুলায় বাড়তি নজর। আইপিএল, আইসিসি ইভেন্ট, আইএসএল বা প্রো কাবাডি—সবকিছুকেই তিনি ভারতীয় দর্শকের কাছে নতুনভাবে হাজির করেছিলেন।
২০২৪ সালে ভায়াকম১৮ ও ডিজনি স্টারের মিশ্রণে তৈরি জিওস্টারের (JioStar) সিইও হন গুপ্ত। সেখানেও কনটেন্ট কৌশল ও বাণিজ্যিক বৃদ্ধির সমন্বয়ে হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী মুখ। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে আইসিসি বোর্ড তাঁকে সিইও হিসেবে বেছে নেয়। ২৫টি দেশের ২৫০০ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে সংযোগ গুপ্ত সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন। লক্ষ্য স্পষ্ট—বিশ্ব ক্রিকেটকে নতুন বাজারে পৌঁছে দেওয়া, ডিজিটাল উদ্ভাবনে নতুনত্ব আমদানি এবং ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেটের স্থানপ্রাপ্তি।
ইতিমধ্যে সংযোগের পাকিস্তান-সংক্রান্ত কঠোর কিন্তু ন্যায়সঙ্গত ভূমিকার প্রশংসা করছে ক্রিকেট মহল। দৃঢ় অবস্থান বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক চাপ বা হুমকিতে তিনি নতজানু হবেন না। বরং প্রক্রিয়া মেনে, নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন। এশিয়া কাপের পাইক্রফট–বিতর্কই হয়ে থাকল মেয়াদের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ জিতে সংযোগ কলার তুলতেই পারেন!