আসল প্রতিযোগিতা ওয়ান ডাউন নিয়ে। একদিকে তিলক বর্মা—প্রতিভাবান হলেও অস্থির। অন্যদিকে শ্রেয়স আইয়ার—ধারাবাহিক, স্পিন মোকাবিলায় দক্ষ আর চাপের খেলায় মানসিকভাবে দৃঢ়।

শ্রেয়স আইয়ার
শেষ আপডেট: 19 August 2025 10:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই শ্রেয়স আইয়ার (Shreyas Iyer) যোগ্যতাপ্রমাণের দৌড়ে ছুটেই চলেছেন। একবার জায়গা পাকা করেন, আবার বাদ পড়েন, তারপর ফের ব্যাট হাতে জোরালো জবাব দিয়ে হারানো আসন ফিরে পান। এই চক্র ঘুরে যাচ্ছে, ঘুরেই যাচ্ছে। থামার নাম নেই!
এশিয়া কাপে (Asia Cup) দল বাছাইয়ের আগে সেই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। শুভমান গিল কেন জায়গা পাবেন না, যশস্বী জয়সওয়ালের খামতি কোথায়-সংক্রান্ত ভিড়ে উঁকি মারছে শ্রেয়সকে ঘিরে অনিশ্চয়তার চেনা ছক! যদিও বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, এবার পাঞ্জাব কিংসের অধিনায়ককে এড়িয়ে যাওয়াটা সহজ হবে না। একেই দলকে দীর্ঘ ১৬ বছর বাদে আইপিএলের ফাইনালে তুলেছেন, উপরন্তু টি২০ ফর্ম্যাটে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ফর্মে। ফলে যুক্তি ও পরিসংখ্যান দু’দিক থেকেই শ্রেয়সের খুঁটি এবার বেশ শক্ত।
তেইশের বিশ্বকাপে তাঁর শর্ট বল খেলায় দুর্বলতা নিয়ে সওয়াল উঠেছিল। ১১ ম্যাচে ৫৩০ রান করে সেই ‘থিওরি’কে মাঠেই ভেঙেচুরে দেন। তারপরও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে বাদ পড়েন। পালটা কী করলেন? না, নেতৃত্ব দিলেন কলকাতা নাইট রাইডার্সকে। আর চব্বিশের আইপিএল জেতালেন। তবু পরের মরসুমে কেকেআর তাঁকে ধরে রাখল না।
কিন্তু প্রতিবারের মতো আবারও দুরন্ত কামব্যাক। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক—পাঁচ ম্যাচে ২৪৩ রান। যে কারণে ক্রিকেট বিশ্লেষক আকাশ চোপড়া সরাসরি বলেছেন, ‘শ্রেয়স আইয়ারকে নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে মাঝের ওভারে ওর থেকে ভালো ব্যাটার ছিল না। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে ইচ্ছেমতো বাউন্ডারি মারছিল, আর অন্য প্রান্তের ব্যাটারকে চাপমুক্ত রাখছিল!’
সেখানেই শেষ নয়। দেশে ফিরে নেমে পড়লেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে দেখালেন আরও বিস্ফোরক রূপ। ৯ ম্যাচে ৩৪৫ রান, স্ট্রাইক রেট ১৮৮.৫২। ইনিংস গড়ার পাশপাশি তিনি যে বিধ্বংসী মেজাজে বিপক্ষ টিমের রণকৌশল ছাড়খার করে দিতেও জানেন, তারই নজির পেশ করেন বাইশ গজে। যার সংহত রূপ, আসল পালাবদল ধরা পড়ল এবারের আইপিএলে। দীর্ঘদিন ধরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের উপযোগী নন বলে সমালোচনা, বিতর্ক চলছিল। সেই তকমা ছিঁড়ে দিলেন মুহূর্তে। পাঞ্জাব কিংসের অধিনায়ক হয়ে ১৭ ম্যাচে ৬০৪ রান তুললেন, স্ট্রাইক রেট ১৭৫.০৭। হাঁকালেন ছ’টি অর্ধশতক। ট্রফি হাতে না তুললেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের নিরিখে এটাই তাঁর সেরা আইপিএল।
আর একেই সামনে টেনে আকাশের সাফাই, ‘আমরা বারবার দেখেছি, টি-টোয়েন্টি দলে আইপিএল পারফরম্যান্সই চূড়ান্ত মাপকাঠি হয়ে থাকে। রিঙ্কু সিং, অভিষেক শর্মা, বরুণ চক্রবর্তী—উদাহরণ অজস্র। সেই যুক্তিতে শ্রেয়সেরও দলে থাকা উচিত!’
এশিয়া কাপ বসছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে। ধীর পিচ, স্পিনের বাড়তি সহায়তা—সেখানে আইয়ারের ব্যাটিংশৈলী ভারতের সম্পদ হতে পারে। পরিসংখ্যানও তাঁর পক্ষে। যেমন, আইপিএলে স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর রান ১৭১। গড় ৮৫.৫, স্ট্রাইক রেট ১৫৪.০৫। তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বী তিলক বর্মা সংগ্রহ করেছেন ২৪৬ রান। মাঝের ওভারে তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৩১.৫৫। কিন্তু স্পিনারদের বিরুদ্ধে তা নেমেছে ১২১.৮৪-তে। এখানে আইয়ার অনেকটাই এগিয়ে।
যদিও শ্রেয়সের সবচেয়ে বড় গুণ হল চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় খেলা। যিনি চেন্নাইয়ে সিএসকের বিরুদ্ধে ৪১ বলে অপরাজিত ৭২ রানে দলকে জেতান, তিনিই আবার কোয়ালিফায়ারে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৮৭ রান করে দলকে ফাইনালে তোলেন। দু’টি ইনিংসই প্রমাণ করে শ্রেয়সের রেঞ্জ! শুধু আগ্রাসন নয়, চাপ সামলে ম্যাচ ফিনিশ করার ক্ষমতাও রাখেন তিনি।
মিডল অর্ডারে সূর্যকুমার যাদবের জায়গা এখন অনেকটাই নির্দিষ্ট। চার নম্বর তাঁর দখলে। তাই আসল প্রতিযোগিতা ওয়ান ডাউন নিয়ে। একদিকে তিলক বর্মা—প্রতিভাবান হলেও অস্থির। অন্যদিকে শ্রেয়স আইয়ার—ধারাবাহিক, স্পিন মোকাবিলায় দক্ষ আর চাপের খেলায় মানসিকভাবে দৃঢ়। সব মিলিয়ে তিনিই তিন নম্বর পজিশনের প্রধান দাবিদার।
আর কত অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে? আর কতবার ‘কালো ঘোড়া’র তকমা বয়ে বেড়াতে হবে? শুরুর একাদশে জায়গা হোক বা না হোক, এশিয়া কাপে ভারতীয় দলে শ্রেয়সের অন্তর্ভুক্তি যে যুক্তিসঙ্গত, তা প্রমাণ করার জন্য আবেগ নয়, পরিসংখ্যান ও পারফরম্যান্সই যথেষ্ট।