চোখের জলে ভেজা তাঁর স্বীকারোক্তিই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—খেলা শুধু প্রতিভা নয়, কখনও কখনও তা আত্মসম্মান বাঁচানোর একমাত্র ভাষা।

মারুফা আখতার
শেষ আপডেট: 15 October 2025 12:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাইশ গজে তিনি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের (Bangladesh) গর্ব। বল হাতে তাঁর আগুনে স্পেল কাঁপিয়ে দিচ্ছে ব্যাটারদের মনোবল। তবু আলো-ঝলমলে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে অনাহার, উপেক্ষা আর অসম্ভব লড়াইয়ের না-বলা কাহিনি। মেয়েদের বিশ্বকাপে (Women’s World Cup 2025) অভিষেক ম্যাচেই পাক বাহিনীকে (Pakistan) কার্যত একা হাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া পেসার মারুফা আখতার (Marufa Akter) এবার মুখ খুললেন নিজের শৈশবের অন্ধকার নিয়ে। আর কথার বলতে বসে ট্রমার আঘাতে দুমড়েমুচড়ে ভেঙে পড়লেন কান্নায়।
বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই স্বপ্নের সূচনা। মাত্র ২০ বছর বয়সে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’! ৭ ওভারে ৩১ রান দিয়ে ২ উইকেট তুলে পাকিস্তানের ইনিংসকে আটকে রাখলেন ১২৯ রানে। প্রথম স্পেলে তুলে নিলেন ওপেনার ওমাইমা সোহেল (Omaima Sohail) ও ভয়ঙ্কর সিদরা আমিনকে (Sidra Amin)। তারপর বাকি কাজ সারলেন দলের ব্যাটাররা। বাংলাদেশের জয় এল সাত উইকেটে। ম্যাচ শেষে যখন ঘোষিত হল মারুফার নাম, তখন গর্জে উঠল স্টেডিয়াম। কিন্তু মঞ্চের হাসির আড়ালে বুকের গভীরে লুকিয়ে ছিল বহু বছরের তিক্ত স্মৃতি।
সাক্ষাৎকারে অতীতের কবর খুঁড়ে মারুফার স্মৃতিচারণ, ‘আমাদের বিয়েতে, দাওয়াতে কেউ ডাকত না। বলত, ভাল জামা নেই। আমরা গেলে ওদের সম্মান যাবে!’ এতটুকু বলেই ভিজে গেল চোখ। তারপর নিজেকে কোনওমতে সামলে যোগ করলেন, ‘একসময় ইদেও নতুন জামা পরার অবস্থা ছিল না। বাবা কৃষক। তাতেই সংসার চলত। গ্রামের লোকজনও খুব একটা পাশে দাঁড়াননি!’
Every player has a story!
Cricket, like life, doesn’t just make champions. It makes believers — those who never stopped chasing, even when the pitch of life turned rough.
Good Luck to Marufa Akter! Hope the game will take of her.pic.twitter.com/OVv7yYH9G8— Rehan Mazhar (@rehanch04) October 14, 2025
নীলফামারির (Nilphamari) গ্রাম থেকে উঠে আসা এই মেয়ে এখন আস্ত বাংলাদেশের প্রেরণা। ছোটবেলায় যাঁদের চোখে ‘অবাঞ্ছিত’, আজ সেই সমাজই তাঁকে টেলিভিশনে দেখে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলে—‘ও আমাদের মেয়ে!’ মারুফা নিজেও ঘুরে দাঁড়াতে, এগিয়ে যেতে মরিয়া। তাঁর কথায়, ‘এখন নিজের উপার্জনে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারছি—এটাই আমার শান্তি! অনেক ছেলেও হয়তো এতটা করতে পারে না। ছোটবেলায় ভাবতাম, কবে মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে বলবে—‘ওদেরও কিছু হয়েছে!’ এখন যখন নিজেকে টিভিতে দেখি… লজ্জা পাই, হাসিও পায়!’
বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই তাঁকে উপমহাদেশের সেরা তরুণ পেসিং প্রতিভা বলে ঘোষণা করেছেন। ধারালো সুইং আর ভরপুর নিয়ন্ত্রণের মারুফা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে নিজের নাম পাকাপাকিভাবে খোদাই করেছেন। ‘মারুফা আপা’-র উত্থানের গল্পটা শুধু এক ক্রিকেটারের জার্নি নয়। বরং, এক অবহেলিত মেয়ের জাতির প্রতীক হয়ে ওঠার গল্প। চোখের জলে ভেজা তাঁর স্বীকারোক্তিই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—খেলা শুধু প্রতিভা নয়, কখনও কখনও তা আত্মসম্মান বাঁচানোর একমাত্র ভাষা।