প্রথম সুযোগেই যে সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করা যায় না, বারবার ব্যাটিং পজিশন পাল্টালে, পছন্দের জায়গায় খেলার সুযোগ না পেলে আট বছর বাদে দলে ফেরা যে কেউ যে সমস্যায় পড়বেন, তা তিনি যতই প্রতিভাবান হোন না কেন—এই নিপাট সত্য অনেকেই বুঝতে পারেননি!

করুণ নায়ার
শেষ আপডেট: 1 August 2025 11:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা ত্রিশতরান আর তারপর কেটে গিয়েছে আট-আটটা বছর।
সেই পর্বে গ্রাস করেছে অনিশ্চয়তা, ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যমের টুঁটি টিপে ধরতে চেয়েছে হতাশা, বারবার ফিরে আসার স্বপ্নকে কবর দিতে চেয়েছে অবসাদ। বছরের পর বছর ঘুরতে একের পর এক মরশুম কেটেছে আর বঞ্চনার ছোবল, ব্যর্থতার গ্লানি গ্রাস করেছে করুণ নায়ারকে (Karun Nair)।
ক্রিকেটের (পড়ুন ক্রিকেটের দেবতার) কাছে দ্বিতীয় সুযোগ চেয়েছিলেন। সে সুযোগ আইপিএলে সুযোগ পাওয়ার নয়, নয় রঞ্জিতে রেকর্ড গড়ার, ওয়ান ডে কি টি-২০ টিমে জায়গা বানানোর। আর্জি ছিল একটাই: ক্রিকেটের আদিমতম, প্রাচীনতম এবং তর্কাতীতভাবে মহোত্তম সংস্করণে জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামতে চান!
খেলার অধীশ্বর সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের বনিয়াদকে সম্বল করে ইংল্যান্ড সফরে দলে সুযোগ পেয়েছেন করুণ নায়ার। প্রস্তুতি ম্যাচে দ্বিশতরান, আত্মবিশ্বাসী সাক্ষাৎকারে অনুরাগীদের আবেগ আর প্রতীক্ষা দ্বিগুণ বাড়িয়ে তোলেন। বুঝি স্রেফ মাঠে নামার অপেক্ষা! যে পজিশনেই খেলুন না কেন, এতদিনের রুদ্ধ হতাশা ব্যাটের অনবদ্য স্ট্রোক প্লে হয়ে বাউন্ডারির সীমানা পেরবে!
কিন্তু এটা বাস্তব দুনিয়া, কল্পলোক নয়। জানতেন করুণ। বুঝতে পারেননি সমর্থকেরা। তাই প্রথম সুযোগেই যে সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করা যায় না, বারবার ব্যাটিং পজিশন পাল্টালে, পছন্দের জায়গায় খেলার সুযোগ না পেলে আট বছর বাদে দলে ফেরা যে কেউ যে সমস্যায় পড়বেন, তা তিনি যতই প্রতিভাবান হোন না কেন—এই নিপাট সত্য অনেকেই বুঝতে পারেননি!
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে! ভাল শুরু করেও কখনও অবনবদ্য ক্যাচে, কখনও নিজের ভুলে, কখনও মনঃসংযোগ খুইয়ে সাজঘরে ফিরেছেন করুণ। ইংল্যান্ড সফর তাঁর কাছে ‘বিভীষিকা’র না হলেও ওভাল টেস্টের আগে ‘প্রত্যাশামাফিক’ ছিল না। যদিও ওয়ান ডাউন পজিশন, যেখানে সাম্প্রতিক অতীতে যোগ্য ব্যাটসম্যান পেতে টিম ম্যানেজমেন্টের নাকের জলে চোখের জলে হচ্ছে, সেখানে নেমে খুব একটা খারাপ খেলেননি করুণ।
তবু প্রশ্ন উঠবে: তিন নম্বর কি তাঁর আসল জায়গা? ঝলসে ওঠার, নিজের দক্ষতা দেখানোর আদত পজিশন? দীর্ঘ কয়েক বছর বাদে দলে ফিরে এই নিয়ে নালিশ জানানো বা কাঁদুনি গাওয়ার সুযোগ করুণের কাছে নেই বটে। কিন্তু সমালোচকদের ভুলে গেলে চলবে না, ওয়ান ডাউন ক্রিকেটে বরাবর চ্যালেঞ্জিং জায়গা! ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম তিন টেস্টে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে—০, ২০, ৩১, ২৬, ৪০, ১৪। মাঝারি মানের পারফরম্যান্স। না একেবারে ব্যর্থ, না পুরোপুরি আশাপ্রদ। ফলত, ওল্ড ট্রাফোর্ডে বাদ যাওয়া নিয়ে খুব একটা আপত্তির সুযোগ ছিল না।
কিন্তু দলের বেশ কিছু খেলোয়াড়ের চোট (ঋষভ পন্থ) ও স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানো (বুমরাহ) বন্ধ দরজা ওভালে হাট করে খুলে দেয়। খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই! কারণ, এই মুহূর্তে মিডল অর্ডারে হাল ধরার যোগ্য প্রতিনিধির কমতি নেই। প্রতিযোগিতা হাড্ডাহাড্ডি। তবু করুণেই আস্থা রাখলেন গম্ভীর ও তাঁর সহকারীরা।
কিন্তু করুণের নায়ারের জীবনে কোনওকিছুই যেন সহজে হাতে আসার নয়। মাঠে নামার আগে ফের ট্যুইস্ট। বাইশ গজের চরিত্র, যা চলতি সিরিজে হয়ে এসেছে, তা ওভালে পুরোপুরি গেল পাল্টে! ঐতিহাসিকভাবে ব্যাটিং স্বর্গ বলে পরিচিত ময়দান হাজির সবুজ কার্পেট বিছানো উইকেট নিয়ে। আর তাতেই দল পড়ল সমস্যায়। ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant) নেই। শার্দূল ঠাকুরের (Shardul Thakur) ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ভরসা রাখা ঝুঁকির। দরকার ছিল একজন স্পেশালিস্ট ব্যাটারের। সেই ফাঁকেই সুযোগ পেলেন করুণ। এবার প্রমাণ করার পালা—টেস্ট ক্রিকেট তাঁর নাগালের বাইরে নয়!
অথচ প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ামাত্র প্রথম প্রশ্নটাই এল বিদঘুটে ধাঁধার মতো। চলতি সিরিজে যা খুব একটা দেখা যায়নি, তাই ঘটল! করুণ যখন ময়দানে নামলেন, স্কোরবোর্ডে ৮৩-৩। অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill) রান আউট হয়ে ফিরেছেন। জশ টাংয়ের (Josh Tongue) দুরন্ত ডেলিভারিতে সাই সুদর্শন (Sai Sudharsan) আউট। তারপর রাভীন্দ্র জাডেজা (Ravindra Jadeja), যিনি ম্যানচেস্টারে সেঞ্চুরির নায়ক, হুবহু একই ডেলিভারিতে সাজঘরে ফিরলেন। প্রায় চোখের পলকে ১২৩-৫। সিরিজে সমতে ফেরানোর আশা তখন সুদূরপরাহত! অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে ক্ষীণ আলোটুকুর মতো ক্রিজে টিকে রয়েছেন করুণ নায়ার। তিনি আউট হলে প্রথম দিনেই বুঝি ম্যাচের ভবিতব্য লেখা হয়ে যাবে!
কিন্তু বিন্দুমাত্র ভড়কে না গিয়ে এগিয়ে এলেন করুণ। নিজের কেরিয়ার সামলানোই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে তাঁকে সামলাতে হল নবীন সঙ্গী ধ্রুব জুরেলকে। মাথায় রাখলেন, মেনে চললেন মূল মন্ত্র: বল যতই বাঁক খাক না কেন, ব্যাট শরীরের কাছাকাছি রাখতে হবে। খেলতে হবে লাইন মেনে। হাত নিশপিশ করা বিলকুল বন্ধ!
আর এখানে কাজ দিল তাঁর কাউন্টি অভিজ্ঞতা। নর্থহ্যাম্পটনশায়ারের হয়ে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপে দুটি সিজিন কাটিয়ে বুঝি গ্রিন টপে এই কঠিন পরীক্ষার জন্যই তৈরি হয়ে ছিলেন করুণ! মেঘলা আকাশ, বাতাসে সুইং, পিচে সিম মুভমেন্ট, মাঝেমধ্যে অনিয়মিত বাউন্স—সব কিছুর সঙ্গেই আগে থেকে ধাতস্থ। ফলত, কাজে দিল পূর্বতন ‘মাসল মেমোরি’। টেকনিক আর মানসিক দৃঢ়তা কাজে লাগিয়ে অর্ধশতরান হাঁকালেন।
ব্যাট হাতে আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। ব্যাটের মুখ (ফ্রন্ট ফেস) খুলে খেললেন। স্বভাবসিদ্ধ নিখুঁত টাইমিং বারবার ঝলসে উঠল। সুইং বলের বিপদ জেনেও সামনে পা বাড়িয়ে ড্রাইভ মারলেন করুণ। তিনি জানতেন, শুধু টিকে থাকলেই হবে না, রান তুলতে হবে। দল তখল টালমাটাল। একটা টেস্ট, একটা আস্ত সিরিজ আপাতত তাঁর কাঁধে দুলে চলেছে!
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ নাগাদ জ্যাকব বেথেলের (Jacob Bethell) প্রথম বল ফাইন লেগে ঠেলে দুই রান নিলেন করুণ। পূর্ণ করলেন অর্ধশতক। শেষবার যখন তিনি এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন, তা গিয়ে থেমেছিল ট্রিপল সেঞ্চুরিতে। এবার যদি তার এক-তৃতীয়াংশও আসে, প্রত্যাবর্তনের সুর আরও মধুর হবে। এড়ানো যাবে হার, বাঁচবে দল!
ওভালের গ্রিন টপে দলের ব্যাটিং ধসের মধ্যে দাঁড়িয়ে করুণ বুঝিয়ে দিলেন—তিনি নিছক ‘প্ল্যান বি’ নন, লড়াইয়ের বিশ্বস্ত সেনানী! দরকার আস্থা, সময় আর আত্মবিশ্বাস!