দ্রাবিড়ের প্রশংসা প্রাপ্য। তাঁর ছত্রচ্ছায়াতেই ভারতীয় ক্রিকেট শিখেছিল সংযম আর স্থিরতা। কিন্তু একইসঙ্গে, গম্ভীরেরও সম্মান প্রাপ্য—যাঁর কোচিংয়ে ভারত ট্রফি হাতে তুলেছে।

দ্রাবিড়-গম্ভীর-রোহিত
শেষ আপডেট: 9 October 2025 12:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনিই ছিলেন দলের প্রধান কোচ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি (Champions Trophy 2025) হাতে তুলেছিল ভারত (Team India)। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir)। কিন্তু রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) যখন খেতাবজয়ের কয়েক মাস বাদে পুরস্কার মঞ্চে উঠে সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, মুখে শুধু একটাই নাম—রাহুল দ্রাবিড় (Rahul Dravid)… দলের প্রাক্তন কোচ!
এতটাই সরাসরি, এতটাই স্পষ্ট, এতটাই ‘অসম্পূর্ণ’!
আর তাতেই ফের মাথাচাড়া দিয়েছে বিতর্ক—রোহিত-গম্ভীর দূরত্ব কি ক্রমশ চওড়া হচ্ছে?
এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ঘটনার সূত্রপাত। সেখানে রোহিতকে সম্মান জানানো হয় ভারতের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের (Champions Trophy Triumph) নেপথ্য নায়ক হিসেবে। বক্তৃতায় তিনি ফিরে দেখেন টিম ইন্ডিয়ার গত কয়েক বছরের সাফল্যগাথা—বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এশিয়া কাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্ত। আর সেই কথার মধ্যেই তিনি বলে বসেন, ‘এই দলের সাফল্য কোনও এক বছরের কাজ নয়, এটা বহু বছরের প্রস্তুতি ও মানসিকতার ফল। আমরা সেটা গড়ে তুলেছিলাম দ্রাবিড়ের সময় থেকেই!’
শব্দগুলো নির্বিষ। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা না-বলা বার্তাই আলোড়ন তুলেছে। কারণ রোহিতের মুখে একবারও শোনা যায়নি গম্ভীরের নাম। অথচ এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সময়ই ভারতীয় দলের প্রধান কোচ ছিলেন তিনিই!
VIDEO | Former India captain Rohit Sharma (@ImRo45) was felicitated at the CEAT Cricket Rating Awards in Mumbai for making the team victorious in Champions Trophy.
He said, "I love that team, I love playing with them, it's a journey of many years. We have come so close to… pic.twitter.com/J083T7qWmN— Press Trust of India (@PTI_News) October 7, 2025
বিস্ময় এখানেই। রোহিতের সঙ্গে দ্রাবিড়ের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তাঁদের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, এবং ‘ক্রিকেট-দর্শনের মিল’নিয়ে অসংখ্য গল্প ইতিমধ্যেই চাউর। গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর দ্রাবিড় যখন কোচের পদ ছাড়েন, রোহিত তখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন: ‘তুমি আমার কোচ নও, আমার আত্মার সঙ্গী। মাঠে আমরা দু’জন একে অপরের মতোই ভাবতাম!’ এই সম্পর্কের উষ্ণতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই।
কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতার সময় দলের হাল ধরেন গৌতম গম্ভীর। দ্রাবিড় তখন অনেক দূরে—স্মৃতি ও শ্রদ্ধায় আচ্ছন্ন এক অধ্যায় মাত্র। তবু রোহিত তাঁর ট্রফি-উৎসর্গে সেই অধ্যায়ের কথাই মনে রাখলেন, নয়া জমানার কোচের নাম অনুচ্চারিত রইল। আর এখানেই দানা বেঁধেছে প্রশ্ন!
কেন এই বাদ পড়া?
প্রথম ব্যাখ্যাটা, একেবারেই সাদামাটা। রোহিত হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, ভারতের এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয় দ্রাবিড়ের আমলেই। যে প্রক্রিয়া, যে মনোভাব—‘ভয়কে দূরে সরিয়ে খেলো’, ‘নিজের জায়গা নিরাপদ ভেবে ঝুঁকি নাও’—এহেন মানসিক রূপান্তর দ্রাবিড়ের হাত ধরেই এসেছিল। তাঁর শাসনে ভারতীয় দল বদলে যায় —হয়ে ওঠে নির্ভীক, আত্মবিশ্বাসী এবং নিরপেক্ষ চিন্তায় বড় হয়ে ওঠা এক টিম। রোহিত সেই কাঠামোর উত্তরাধিকারী। গম্ভীর হয়তো শুধু সেই রূপান্তরের ফলাফলকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। অর্থাৎ, রোহিতের প্রশংসা মূলত ‘প্রক্রিয়া’ নিয়ে। ব্যক্তি সেখানে তুচ্ছ। আর সেই প্রক্রিয়ার সূচনা যেহেতু দ্রাবিড়ের যুগে, তাই কৃতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দিকেই গিয়েছে।
কিন্তু এখানেই সমস্যা! শুনতে যতই সরল লাগুক, ভারতীয় ক্রিকেটে কিছুই আর নিছক সরল থাকে না। রোহিতকে সদ্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে (Captaincy Change)। নতুন নেতা শুভমান গিল (Shubman Gill)। এই বদলের পেছনে গম্ভীরের সক্রিয় ভূমিকা আছে কি না, তা নিয়েই ক্রিকেট মহলে জোর গুঞ্জন। এরই মধ্যে রোহিতের এমন এক বক্তৃতা—যেখানে দ্রাবিড়ের প্রশংসা গম্ভীরকে সম্পূর্ণ ছায়ায় ঢেকে দিল—তা তো স্বাভাবিকভাবে আরও সন্দেহ উসকে দেবেই!
কেউ বলছেন, এটা নিছক কাকতালীয়। আবার অনেকের মতে, রোহিতের এই ‘নীরব প্রত্যাখ্যান’ আসলে এক ধরনের বার্তা—একটা অসন্তোষের ইঙ্গিত, একপ্রকার ‘অহিংস প্রতিরোধ’!
ঘটনার রাজনৈতিক দিকও অনেকে তুলে ধরছেন। ভারতীয় ক্রিকেটে রোহিত ও গম্ভীর দুই মেরুর প্রতীক। রোহিত শান্ত, সংযত, ধৈর্যশীল; গম্ভীর তীব্র, সংঘাতপ্রবণ, আক্রমণাত্মক। এক জনের দর্শন ‘ধীরস্থির শৃঙ্খলা’, অন্যজনের মন্ত্র ‘প্রবল আগ্রাসন’। দু’জনই সফল। কিন্তু একই ড্রেসিংরুমে তাঁদের ছায়া একসঙ্গে পড়লে বিদ্যুৎ খেলে যাবে—এটা আর গোপন নয়। বিশেষ করে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর থেকে, রোহিতকে ঘিরে যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তা বেশ স্পর্শকাতর!
অধিনায়কত্ব হারানো, নতুন কোচের আগমন, দলীয় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে ভূতপূর্ব অধিনায়ক এখন এক অজানা সন্ধিক্ষণে। ফলে তাঁর প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি উচ্চারণ হয়ে উঠছে ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’। এমন অবস্থায়, কোচের নাম বাদ দিয়ে দ্রাবিড়ের কথা বলা যেন অনেকটা নীরব বার্তা পাঠানোর মতো—‘আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের প্রতি, যাঁরা আমায় বুঝেছিলেন!’
তবে এটাও ঠিক, গম্ভীরের প্রতি অবিচার করা সহজ নয়। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তাঁর কৌশলগত দিকনির্দেশনা ছিল স্পষ্ট। সীমিত ওভার ক্রিকেটে ঝুঁকি নেওয়া, আগ্রাসী ব্যাটিং অর্ডার, ওভার থ্রো কমানো—এই প্রতিটি খুঁটিনাটিতে কোচের হাত সাফ সাফ ফুটে উঠেছে। ভারত মাত্র ছ’টি ওয়ানডে খেলেছিল তাঁর তত্ত্বাবধানে। তবু সেই স্বল্প সময়ে দল থিতু হয় এক নতুন ছকে—যেখানে গতি আর নিয়ন্ত্রণ, দুইয়েরই নিখুঁত ভারসাম্য বজায় থাকে। সেই টিম ইন্ডিয়াই ট্রফি জিতেছিল।
তাহলে নামটা বাদ পড়ল কেন? সম্ভবত, রোহিতের বক্তব্য ছিল ‘বস্তুত’ দ্রাবিড়, কিন্তু ‘অবচেতনে’ গম্ভীরকে ঘিরে। অর্থাৎ, মুখে যাঁর প্রশংসা করছেন, তাঁর ছায়াতেই হয়তো জায়গা খুঁজে নিয়েছেন গম্ভীর।
আরেকটা দিক—সময়ের প্রেক্ষাপট। রোহিতের বক্তৃতা আসে ঠিক কয়েক দিন পরেই, যখন তাঁকে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে সরানো হয়েছে। মানসিকভাবে কঠিন সময়। আবেগপ্রবণ রোহিত হয়তো ফিরে গেছেন অতীতে—সেই দিনগুলিতে, যখন দ্রাবিড়ের সঙ্গে তিনি কাজ করতেন নির্ভাবনায়। হয়তো সেখানেই তাঁর মন এখনও থমকে। তাঁর কথাগুলো অনেকটাই নস্টালজিক এবং সেই আবেগের অন্দরেই গম্ভীরের নামটি অনিচ্ছাকৃতভাবে হারিয়ে গিয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেটে এখন ‘অপটিক্সে’র (optics) গুরুত্ব প্রবল। জনসমক্ষে কে কাকে প্রশংসা করছে, কার নাম বাদ দিচ্ছে—সবই ব্যাখ্যা করা হয় সংকেত হিসেবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিতের মন্তব্য নিছক ‘বিস্মরণ’ নয়, বরং জনমতের এক সূক্ষ্ম প্রভাবক। তাঁর এক বাক্যই সামাজিক মাধ্যমে তৈরি করেছে হাজার হাজার আলোচনা: ‘গম্ভীরকে ইচ্ছে করে উপেক্ষা করলেন কি রোহিত?’ এবং এই বিতর্কই প্রমাণ করছে, আধুনিক ক্রিকেট ‘অর্থের আড়ালও অর্থবহ’। প্রত্যেক বাক্য, প্রত্যেক নীরবতা, প্রত্যেক প্রশংসাই কোনও না কোনও দিক নির্দেশ করে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো এর উত্তর একটাই—রোহিতের মন্তব্য একাধারে সঠিক ও অসম্পূর্ণ। দ্রাবিড়ের প্রশংসা প্রাপ্য। তাঁর ছত্রচ্ছায়াতেই ভারতীয় ক্রিকেট শিখেছিল সংযম আর স্থিরতা। কিন্তু একইসঙ্গে, গম্ভীরেরও সম্মান প্রাপ্য—যাঁর কোচিংয়ে ভারত ট্রফি হাতে তুলেছে। একটি ছোট বাক্য—‘… এবং অবশ্যই গম্ভীর ও তাঁর কোচিং টিমকে ধন্যবাদ, যাঁরা আমাদের শেষ লাইন পেরোতে সাহায্য করেছেন’—বললেই হয়তো এই বিতর্ক জন্মাত না। কিন্তু এখন, যখন ভারতীয় ক্রিকেট উত্তপ্ত, তখন প্রতিটি চুপ থাকাও হয়ে উঠছে অনিবার্য ‘বিবৃতি’!
রোহিতের যখন কিছু বলেন না, তখনও তাঁর নীরবতাই সবচেয়ে জোরে শোনা যায়।