২০২২ সালে মহিলাদের ম্যাচ ফি পুরুষদের সমান বলে ঘোষিত হল। আর এই সাম্যের ঘোষণা পূরণ করল এক অসমাপ্ত বৃত্ত!

মহিলা ক্রিকেট দল
শেষ আপডেট: 18 July 2025 17:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পালাবদলটা দেয়ালেই লেখা ছিল। যতটুকু অস্পষ্টতা ছিল, মুছে দিয়েছে ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবারের জন্য টি-২০ সিরিজ জয়। সামনের বছর বিশ্বকাপ। দেশের মাটিতে। সেটা জিতলে আধুনিক ভারতের ক্রিকেটচর্চায় পালাবদলের নিশান গেঁথে দেবে মহিলা দল (Indian Women's Cricket Team)। আর তার আগে মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা আইপিএলের (IPL) প্রবল ঝড়কেও আগামী দিনে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
যদিও এই ঝলমলে চেহারা রাতারাতি তৈরি হয়নি। আঁধার মুছে আলো জেগেছে ঠিকই। কিন্তু সময় লেগেছে। আর সেই অন্ধকার সময়ের সাক্ষী মিতালি রাজ (Mithali Raj)। স্বীকার করেছেন, ‘আমি তো বাবার পকেট খালি করে খেলতাম। ক্রিকেটে রোজগারের উপায়ই ছিল না। নিজের কিট নিজে কিনতাম। ট্রেনিংয়ের জন্য মাঠ খুঁজে বেড়াতাম। ম্যাটিং উইকেটে প্র্যাকটিস চলত। ম্যাচের আগের সপ্তাহে টার্ফের মুখ দেখতাম।’
১৬ বছর বয়সে ভারতের জার্সি গায়ে পথচলা শুরু। তখন বিসিসিআইয়ের (BCCI) সঙ্গে মহিলাদের ক্রিকেটের কোনও সম্পর্কই ছিল না। সংযুক্তির গল্প অনেক পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে পকেটে ঢুকতে শুরু করে ম্যাচ ফি, খুলে যায় ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির দরজা। প্রশিক্ষিত ট্রেনার থেকে ফিজিও—আধুনিক পরিকাঠামোর সমস্ত স্তর আগাপাশতলা সেজে ওঠে।
কিন্তু লড়াইটা তো শুধু ময়দানে নয়, ছিল সমাজের বিরুদ্ধেও। গ্রামের মেয়ে খেলবে? টাকা না রোজগার করে ক্রিকেট খেলা কোন দেশি ভদ্রতা? মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্দরমহলে উঠতে শুরু করে প্রশ্ন। ছেলেদের মতো জার্সি গায়ে, পায়ে প্যাড পরে ক্রিকেট খেলা তখন রীতিমতো কুসংস্কার! ফলে বাধ্য হয়ে অন্নসংস্থানের জন্য স্থায়ী রোজগার, মাস গেলে থোক টাকার খোঁজ করতেন মহিলা ক্রিকেটারদের অনেকে। রেলে চাকরি ছিল সবচাইতে নিরাপদ অপশন!
ছবিটা বদলে যায় ২০১৫ সালে। যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয় বিসিসিআই। প্রথম ১১ জন জাতীয় মহিলা ক্রিকেটারকে দেওয়া হয় রিটেনার কনট্রাক্ট। মিতালি রাজের বয়স তখন ৩৩! ফর্মের তুঙ্গ পেরিয়ে কেরিয়ারের প্রান্তবেলা! কৈশোর-যৌবনে যে স্বীকৃতির খোঁজ করেছেন, তিরিশ পেরিয়ে তা হাতে এলেও খুশি হন মিতালি। তাঁর কথায়, ‘চুক্তি মানে একটা সুরক্ষা। নিশ্চিতভাবে জানতাম, খেললে রোজগার হবে। আগে এই নিশ্চয়তা ছিল না!’
এর দু’বছর বাদে ছবিটা আরও একটু স্পষ্ট হল। ২০১৭ সালে ভারতের মেয়েরা লর্ডসে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলল। হেরে গেলেও দেশজুড়ে তৈরি হল আলোড়ন। আইসিসির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জানাল: ১০ কোটি ভিডিও ভিউ! ফাইনালের দিন টিভির পর্দায় ফুটে উঠল ১৯.৫৩ মিলিয়নের পরিসংখ্যান! দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনও দিন মহিলাদের খেলা এত বেশি সংখ্যক দর্শক দেখেনি।
আর এই ডিজিটাল সিলমোহরের সৌজন্যে তড়িৎগতিতে বেড়ে গেল পারিশ্রমিক—এক লাফে ১৫ লক্ষ থেকে লক্ষ টাকা! তিন বছর বাদে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের ম্যাচ সম্প্রচারিত হল পাঁচ-পাঁচটি আলাদা ভাষায়। ফাইনালে ফের হার, অস্ট্রেলিয়ার কাছে! কিন্তু সমর্থকদের চোখ স্ক্রিনছাড়া হল কই? ৯.০২ মিলিয়ন—শুধু ‘ভিউয়ারশিপে’র নিরিখে নয়, দেশের ক্রিকেটের সংস্কৃতিবদলের নিদর্শনও বটে!
একদা সামান্য স্বীকৃতির জন্য, ন্যূনতম মান্যতার জন্য মাথা ঠুকেছিলেন মিতালিরা। তাঁদের পরের প্রজন্ম শুধু বোর্ডের তালিকায় নামটুকু লেখাল না, ২০২২ সালে মহিলাদের ম্যাচ ফি পুরুষদের সমান বলে ঘোষিত হল। আর এই সাম্যের ঘোষণা পূরণ করল এক অসমাপ্ত বৃত্ত!
দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে, সেটা বিসিসিআইয়ের একের পর এক ঘোষণা, ডিজিটাল স্বীকৃতি, দর্শকদের উন্মাদনায় স্পষ্ট হলেও বাকি ছিল অর্থনীতির মঞ্চে জয়পতাকা ওড়ানো। শুধু ম্যাচ ফি-র সমতা নয়, ক্রিকেটের বাণিজ্যেও থাবা বসায় মেয়েরা। আইপিএলের ধাঁচে ২০২৩ সালে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগ (WPL)। শুরুতেই পাঁচটা দল কেনা হল ৪৬৫ মিলিয়ন পাউন্ডে! মিডিয়া রাইটস বিক্রির দর ছুঁল ৯৬ মিলিয়ন। স্মৃতি মন্ধানা অর্জন করলেন সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি!
মুম্বই ইন্ডিয়ান্স ২০২৩-এ এই লিগ জেতে, ২০২৫-এ আবার চ্যাম্পিয়ন। ২০২৩-২৪ সিজনে বোর্ডের মোট রেভিনিউর ৩.৯% আসে মেয়েদের প্রিমিয়ার লিগ থেকে। আইপিএল ৫৯.১ শতাংশ এনে টক্কর দিলেও সেদিন সুদূরপরাহত নয়, যেদিন বিপুল মুনাফা ঘরে আনার অঙ্কেও মেয়েরা ছেলেদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলবে!
শুধু বোর্ডের রাজস্বে ভাঁড়ার ভরাট করা নয়, খেলোয়াড়দের হেঁসেল ঠেলার সুযোগ গড়ে দিয়েছে ডব্লুপিএল! কিন্তু সেটা তো স্রেফ ৯০ জন ক্রিকেটারের! যাঁদের অন্তত ৩০ জন বিদেশি। কিন্তু বাকিদের হাল কেমন? তাঁদের জন্য নেই কোনও চুক্তি, নেই কোনও আর্থিক নিরাপত্তা। কেউ ব্যক্তিগত স্পনসর খোঁজেন, কেউ আবার চাকরির ভরসায়— ঠিক সেই অন্ধকার যুগ, মিতালি তাঁর কৈশোরে যে দুর্যোগের ঝাপট পেরিয়ে এসেছেন! ২০২৪-২৫ সালে রিটেনার কনট্রাক্ট পেয়েছেন মাত্র ১৬ জন মহিলা। পুরুষদের জন্য সংখ্যাটা ৩৪। অর্থাৎ, ব্যবধান এখনও রয়েছে। পুরোপুরি ঘোচেনি।
কিন্তু সমাজ বদলেছে। পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। একসময় যারা মেয়েদের ক্রিকেট খেলতে দিত না, আজ তারাই কোচিং ক্যাম্পে মেয়েকে ভর্তি করতে ভিড় জমাচ্ছে। মিতালির কথায়, ‘এখন আর মহিলাদের ক্রিকেটকে কেউ বাঁকা চোখে দেখে না। এটা পেশা। খেলাধুলো। সবাই চায় মেয়েরা খেলুক। এ এক বিশাল পরিবর্তন!’
তবু জেলার মেয়েরা এখনও তিনবেলা খেতে পায় না, আক্ষেপ মিতালির। তিনি নিজে অন্ধ্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত। দেখেছেন, সব জায়গায় এখনও খেলাধুলার আধুনিক পরিকাঠামো নেই। পথ এখনও পিচ্ছিল। তবু দিশা আছে: ক্লাব, জেলা, রাজ্য, জোন, ইন্ডিয়া ‘এ’ বেয়ে জাতীয় দলে ওঠার রাস্তা খোলা। কিন্তু তার জন্য পরিকল্পনায় আধুনিকীকরণ জরুরি। মিতালির প্রস্তাব পরিষ্কার, ‘প্রিমিয়ার লিগে আরও দু’টো দল দরকার। কারণ অনেক প্রতিভাবান মেয়ে সুযোগের অভাবে বাদ পড়ে যাচ্ছে!’ বড় লক্ষ্য স্রেফ ইংল্যান্ড নিধন কিংবা বিশ্বকাপ জয়ও নয়… সব কিছুর ঊর্ধ্বে চোখ এখন একটিমাত্র স্বপ্নে গাঁথা--লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেটে সোনার পদক জিতে আনা!
একসময় ফাঁকা পকেটে আর খালি পেটে মাঠে নামা মেয়ে ক্রিকেটাররা আজ কোটি টাকার চুক্তিতে খেলেন, অলিম্পিক স্বপ্নে বুক বাঁধেন। এই উত্থান শুধু খেলাধুলোর নয়—সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি—সবকিছুর পর্বান্তরের স্মরক। মিতালি রাজও স্রেফ ক্রিকেটার নন, এই পালাবদলের অন্যতম সূত্রধর।