ফুটবলের তাত্ত্বিকরা ‘এনরিকে-প্রজেক্টে’র করণ-প্রকরণ নিয়ে অনেক শব্দ ব্যয় করবেন, পিএসজির ঐতিহাসিক ইউরোপ-বিজয় নিয়ে আগামী দিনেও অনেক চর্চা হবে, কিন্তু ফুটবল অনুরাগীদের স্মৃতিতে চিরজায়মান থাকবে একটি ছবি, একটি টিফো… ফুটবলের সেন্টার সার্কেলে গেঁথে যাওয়া পিতৃত্ব ও বাৎসল্যের নিশান!

লুই এনরিকে
শেষ আপডেট: 1 June 2025 16:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেই ছবিটা দেখতে চেয়েছিলেন লুই এনরিকে। সেই ছবি… যেখানে তাঁর হাতে ধরা পতাকা। এদিক-সেদিক ঘুরপাক খেতে খেতে মাঝমাঠে পৌঁছলেন। তারপর গেঁথে দিলেন সেন্টার সার্কেলে। পাশে দাঁড়িয়ে একরত্তি, ফুটফুটে মেয়ে।
আজ থেকে দশ বছর আগে বার্লিন-বিজয়ের পর লুই এনরিকে হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি, এই ছবি তাঁর জীবন এতটা বদলে দেবে! হারাবেন কোলের মেয়েকে। ছাড়বেন প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনার ভরা সংসার। অবসাদে বিরতি নেবেন ফুটবল থেকে। ফিরে আসবেন ঠিকই। কিন্তু জাতীয় দলের কুর্সিতে। তারপর স্পেনের মসনদ ছেড়ে ফরাসি ক্লাব পিএসজির ডাগ আউটে।
ফুটবল এনরিকের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। যে কেরিয়ার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা সাকার হয়নি। যে বার্সেলোনায় সাম্রাজ্য তৈরির খোয়াব দেখিয়েছিলেন, তাও মাঝপথে ছেড়ে আসতে হয়। কোলের মেয়েকে ক্যানসার ছিনিয়ে নেয়।
এতকিছুর পরেও এনরিকে স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। তাই গতকাল চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে নামার আগে জানিয়েছিলেন, তিনি চান বার্সেলোনার হয়ে খেতাবজয়ের স্মরণীয় মুহূর্তের ‘আইকনিক’ ছবিকে নতুন সাজে ফিরে দেখতে। ক্লাব বদলে যায়। মানুষ হাত ছাড়ে। কিন্তু স্মৃতি চিরজীবিত। সেই স্মৃতিকেই ফিরে দেখতে চেয়েছিলেন ‘স্বপ্নের শহর’ প্যারিসের নয়া রূপকার লুই এনরিকে।
গত রাতে ইন্টার মিলানকে ছেলেখেলার ঢঙে পাঁচ গোলে দুরমুশ করার পর মিউনিখের স্টেডিয়ামের একাংশ বেয়ে যখন পতপত করে নেমে এল রঙিন টিফো, একদিক ছেয়ে গেল বাহারি পতাকায়, তখন তীব্র বেরসিক ফুটবল তার্কিকের চোখের কিনারে একচিলতে জল জমেছিল নিশ্চিত!
টিফোয় ধরা এনরিকের অবয়ব। শুধু বদলে গিয়েছে হাতের পতাকা। বার্সেলোনার জার্সির বদলে পিএসজির নীল পতাকা! আর কিছু দূরে দাঁড়ানো মেয়েটি সেই আগের মতোই অপলক চোখে সেন্টার সার্কেলে ফ্ল্যাগ পুঁতে চলা বাবার দিকে তাকিয়ে!
সানা মার্টিনেজ, ন’বছরের বাচ্চা মেয়েকে ক্যানসারে হারিয়েছেন এনরিকে। তারপর যেখানে গিয়েছেন, সমস্ত অর্জনে-সাফল্যে-বৈভবে মেয়ের স্পর্শ অনুভব করেছেন, সানা পাশেই আছে—মনে করে দাঁড়িয়েছেন টাচলাইনে।
গতরাতের সাফল্য আগের সমস্ত উচ্ছ্বাসকে ছাপিয়ে গিয়েছে। এতদিন অর্থের জোরে গড়ে তোলা ক্লাবের দর্শন বদলে দিয়েছেন এনরিকে। তারকাদের নিয়ে অবিন্যস্ত কায়দায় অগোছালো মালা গাঁথেননি। সাজিয়ে তুলেছেন এমন বাহিনী, যারা অটুট, সংঘবদ্ধ, দায়িত্ববান। উইংগার শুধু উইংপ্লে-র ছটা দেখিয়েই উবে যান না, স্ট্রাইকার পড়ে থাকেন না বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। বদলে হাই প্রেসিং চালিয়ে যান। তাড়া করে বেড়ান বিপক্ষের ডিফেন্সিভ হাই লাইন, গোলরক্ষের পায়ে বল থাকলেও প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ প্লে-র পরিকল্পনা দুরমুশ করে দেন।
উসমান ডেম্বলের কথাই ধরা যাক। বার্সেলোনায় থাকাকালীন তাঁর ওয়ার্ক রেট নিয়ে নিয়ত চর্চা চলত। তিনি প্রতিভাবান, কিন্তু পরিশ্রমী নন—ফুটবল মহলে ডেম্বেলেকে নিয়ে এমন চালু মিথ ভেঙে ফেলেছেন এনরিকে। ইন্টারের রক্ষণভাগকে যেভাবে একটানা পায়ে বল না থাকা সত্ত্বেও ধাওয়া করে গেলেন ক্ষিপ্রগতির মিডফিল্ডার—তাতে প্রশ্ন জাগবে: এই ডেম্বলেই কি সেই ডেম্বেলে? জবাব যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তরুণ ফুটবলারের পুনর্জন্ম ঘটেছে!
শুধু ডেম্বেলে নয়। গোটা পিএসজি টিমের নবজন্ম ঘটালেন এনরিকে। মেসি যা পারেননি, নেইমার যা পারেননি, কাভানি, বুফো যা পারেননি—তাকেই সত্যি করেছেন এনরিকে। তিনি চালক, তিনিই বাহক। পিএসজির নবজন্মের রূপকার।
ফুটবলের তাত্ত্বিকরা ‘এনরিকে-প্রজেক্টে’র করণ-প্রকরণ নিয়ে অনেক শব্দ ব্যয় করবেন, পিএসজির ঐতিহাসিক ইউরোপ-বিজয় নিয়ে আগামী দিনেও অনেক চর্চা হবে, কিন্তু ফুটবল অনুরাগীদের স্মৃতিতে চিরজায়মান থাকবে একটি ছবি, একটি টিফো… ফুটবলের সেন্টার সার্কেলে গেঁথে যাওয়া পিতৃত্ব ও বাৎসল্যের নিশান!