গতকাল হেডিংলে টেস্টে যে কায়দায় সেঞ্চুরি সম্পূর্ণ করলেন, লাফিয়ে, হেলমেট খুলে উচ্ছ্বাস দেখালেন, তারপর বিরতি শেষে খাতায় এক রান যোগ করে আউট হলেও যে কায়দায় উন্নতশিরে ময়দান ছাড়লেন, তাতে ‘কোনি’ উপন্যাস পড়েছে এমন যে কেউ অনুমান করতেই পারেন, বছর তেইশের এই তরুণ ওপেনারের সাফল্যের আড়ালে ক্ষিদ্দার মতো প্রশিক্ষক আছেন। অবশ্যই আছেন।

যশস্বী জয়সওয়াল
শেষ আপডেট: 21 June 2025 11:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘…মার খেয়ে ইস্পাত হয়ে উঠতে হবে। যন্ত্রণাকে বোঝ, ওটাকে কাজে লাগাতে শেখ, ওটাকে হারিয়ে দে। …কাম অন কোনি, জোর লাগা, আরো জোরে…’
কোনির ক্ষিদ্দা ছিল। যিনি কমদিঘির প্র্যাকটিসে ছাত্রীকে কাতরাতে দেখেও নিস্পৃহ, কিছুটা নিষ্ঠুরভাবে অনুশীলন চালিয়ে যান। পায়ে টান ধরে কোনির। কষ্টে ছটফট করতে থাকে। কিন্তু সুইমিং পুল থেকে উঠে আসতে পারে না। বাঁশের লগি হাতে তাড়া করে চলেন ক্ষিতীশ। আর বলে যান, ‘যন্ত্রণা আর সময়ই তো তোর অপনেন্ট রে! ফাইট কোনি ফাইট!’
যশস্বী জয়সওয়ালের (Yashasvi Jaiswal) কোনও ‘ক্ষিদ্দা’ রয়েছেন কি না, জানা নেই। কিন্তু গতকাল হেডিংলে টেস্টে যে কায়দায় সেঞ্চুরি সম্পূর্ণ করলেন, লাফিয়ে, হেলমেট খুলে উচ্ছ্বাস দেখালেন, তারপর বিরতি শেষে খাতায় এক রান যোগ করে আউট হলেও যে কায়দায় উন্নতশিরে ময়দান ছাড়লেন, তাতে ‘কোনি’ উপন্যাস পড়েছে এমন যে কেউ অনুমান করতেই পারেন, বছর তেইশের এই তরুণ ওপেনারের সাফল্যের আড়ালে ক্ষিদ্দার মতো প্রশিক্ষক আছেন। অবশ্যই আছেন।
নয়তো কী করে হাতের টানকে হারিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম আর সংযমকে মূলধন করে এই সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন যশস্বী! গতকাল প্রতিপক্ষ বোলারদের তালিকায় ছিল ক্রিস ওকস (Chris Woakes), বেন স্টোকসের (Ben Stokes) মতো ভারী ভারী নাম। আর ইনিংসের শেষ দিকে দেখা দেয় আরও এক ‘অপোনেন্ট’—যন্ত্রণা। অকথ্য যন্ত্রণা। দুই হাতের পেশিতে টান। নাড়াতে পর্যন্ত পারছেন না। বারবার চিকিৎসক ডাকতে হচ্ছে। তবু মাঠ ছাড়েননি। জানতেন, তিনি চলে গেলেই দল ছন্দ হারাতে পারে। আর টেস্টে ব্যাটিং বস্তুটা পেন্ডুলামের মতো এদিক-সেদিক ঘুরপাক খায়। পরপর দু’উইকেট পড়া আচমকা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই কষ্ট সামলে ক্রিজে টিকে থাকেন। ঝুঁকি নেন। টার্গেট করেন ব্রাইডন কার্সেকে। হাঁকান তিনটে চার। আশির কোঠা থেকে মুহূর্তে ৯৯। তারপর পয়েন্টে বল ঠেলে শতরান সম্পূর্ণ করেন যশস্বী।
ইংল্যান্ডে প্রথম টেস্টে শতরানের এলিট লিস্টে নাম তোলা—নজির।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাটিং গড়ে ডন ব্র্যাডম্যানকে ছাপিয়ে যাওয়া—রেকর্ড।
কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এই ইনিংস যশস্বীর কাছে আজীবন স্পেশাল হয়ে থাকবে। তার কারণ, শতকের মুকুট মাথায় পরেছেন যন্ত্রণাকে বশ করে। দিনের শেষে সাংবাদিকদের সামনে লুকিয়ে-ছুপিয়ে নয়, সাফ সাফ বলেও দেন, ‘আমার এক হাত নয়, দু’হাতেই টান লেগেছিল!’ কিন্তু এই কষ্টকে জয়ের ফর্মুলাও যে আয়ত্ত করে ফেলেছেন তিনি, রাগের মাথায় ‘মুম্বইয়ে খেলব না, এবার থেকে গোয়ার হয়ে খেলব’ বলা ছেলেটা যে কয়েক মাসে অনেক পরিণত, তার প্রমাণ ঠিক পরের বাক্যে। যখন বুক ঠুকে বলে দেন, ‘ঠিক আছে, এমনটা হয়েই থাকে।’ বলামাত্র ঠোঁটের কোণে খেলে যায় দুষ্টুমিষ্টি হাসিও!
বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা-উত্তর ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাটিং লাইন আপ যখন একটা পর্বান্তরের সাক্ষী হতে চলেছে, তখন অনেকে আগামিদিনের স্থায়ী ওপেনার পদে যশস্বীকেই নিজেদের বাজি ধরেছেন। তাঁদের স্বীকৃতি মাথা মেতে নিয়েছেন তরুণ ব্যাটার। আগের চাইতে অনেক বেশি শান্ত, স্থিতধী যশস্বী। তাঁর কথায়, ‘চাপের মুখে খেলার সময় মানসিক পালাবদল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভাল পরিবেশে থাকাটাই আসল চাবিকাঠি।’
হেডিংলের চ্যালেঞ্জ কেমন ছিল? যশস্বীর জবাব, সবকিছুর ভিত প্রস্তুতি ম্যাচ। বেকেনহ্যামের ওয়ার্ম আপ লড়াই, মাঠ, পরিবেশ, আবহাওয়া—সবকিছু ভালো ছিল। যার দৌলতে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে নামার চ্যালেঞ্জ পেরনো সম্ভব হয়েছে। এই সেঞ্চুরি তারই ফসল। জানিয়ে দেন প্রথম দিনের নায়ক।