নতুন শহরে ম্যাচ গেলে নতুন দর্শক তৈরি হয়। টিভির বাইরে স্টেডিয়ামে বসে টেস্ট দেখার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই ‘বিস্তারে’র চাপে কি ‘ঐতিহ্য’ কোণঠাসা হচ্ছে না?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 27 March 2026 17:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা স্ক্রিনশট গত দু'দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। সেখানে লেখা: কলকাতার ইডেন গার্ডেনস শেষবার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করেছিল ২০০১-এ। এরপর যতবার বর্ডার-গাভাসকর ট্রফি খেলা হয়েছে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কলকাতার দিকে ফিরে পর্যন্ত তাকায়নি। একই হাল মুম্বইয়েরও। বদলে শিরোমণি খেতাব জুটেছে আকারে-প্রকারে বড় (কিন্তু ঐতিহ্য ও ইতিহাসে ঢের পিছিয়ে থাকা) আমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপ ফাইনাল থেকে যে কোনও ছোট-সেজ-মেজ দ্বিপাক্ষিক সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ লড়াই—সবাই জানে, ভেন্যু আগে থাকতেই মোটামুটি নিশ্চিত!

গতকাল বিসিসিআই আসছে বছরের যে সূচি প্রকাশ করেছে, তার আয়োজক ময়দানের লিস্টি দেখে তামাম ক্রিকেট অনুরাগীদের চোখ কপালে উঠেছে! অস্ট্রেলিয়া ভারতে আসছে পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলতে। এমনিতেই স্মরণীয়, জনপ্রিয় এই সফর। তার উপর কোহলিকে ছাড়া স্মরণযোগ্য সময়ে এই টুর্নামেন্টে নামেনি টিম ইন্ডিয়া। এবার তার অন্যথা হতে চলেছে। অথচ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা বর্ডার-গাভাসকর ট্রফির আয়োজকের বরাত না কলকাতা, না মুম্বই… কারও কপালে জোটেনি! জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে দুধভাত ওয়ান ডে ছাড়া ইডেনের ঝুলি আপাতত ফাঁকা। ওয়াংখেড়েও একই রকম রিক্ত।

এই পালাবদলের কারণ কী? কেন এই দুই আইকনিক ভেন্যুকে ছাপিয়ে সামনের সারিতে চলে আসছে রাঁচি, ঝাড়খণ্ড, নাগপুর? কোন জাদুবলে? আইসিসি চেয়ারম্যান আর বিসিসিআই সচিবের জন্মভিটে বলেই কি আমদাবাদ-অসমের এত বোলবোলাও? হেতু এতটাই লঘু? নাকি আড়ালে লুকিয়ে অন্যবিধ গূঢ় রহস্য?
‘ক্রিকেট ছড়িয়ে দাও’: বোর্ডের নতুন দর্শন
অনেকের চোখে, বিসিসিআই (BCCI) আজকাল ক্রিকেটকে দেশের প্রতিটি কোণে নিয়ে যাওয়ার মন্ত্রে বিশ্বাসী। আগে টেস্ট মানেই ছিল নির্দিষ্ট কয়েকটা শহর—কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু। এখন সেই ধারণা বদলেছে। প্রকাশিত নতুন সূচিতে দেখা যাচ্ছে নাগপুর, রাঁচি, গুয়াহাটি—এই শহরগুলোকে বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বোর্ডের যুক্তি স্পষ্ট—ভারত এত বড় দেশ, সব জায়গায় পরিকাঠামো তৈরি, তাহলে কেন শুধু পুরনো কেন্দ্রেই খেলা আটকে থাকবে?
এই ভাবনার পেছনে বাস্তব যুক্তি আছে ঠিকই। নতুন শহরে ম্যাচ গেলে নতুন দর্শক তৈরি হয়। টিভির বাইরে স্টেডিয়ামে বসে টেস্ট দেখার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই ‘বিস্তারে’র চাপে কি ‘ঐতিহ্য’ কোণঠাসা হচ্ছে না?
ইডেন-ওয়াংখেড়ে: শুধু মাঠ নয়, ইতিহাসের সাক্ষী
কলকাতার ইডেন গার্ডেনস (Eden Gardens) বা মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম (Wankhede Stadium)—এগুলো শুধু স্টেডিয়াম নয়, ক্রিকেটের জ্যান্ত আবেগ! ২০০১ সালের সেই টেস্ট—ভিভিএস লক্ষ্মণ (VVS Laxman) আর রাহুল দ্রাবিড়ের (Rahul Dravid) ঐতিহাসিক জুটি—আজও ভারতীয় ক্রিকেটের চর্চিত গল্পগুলোর একটি। একইভাবে মুম্বই—সচিন তেন্ডুলকরের (Sachin Tendulkar) শহর। ফ্লাডলাইটে সেজে ওঠা ওয়াংখেড়ের গ্যালারি আলাদা আবহ ঘনিয়ে তোলে। এই দুই ময়দানে খেলা মানেই টিম ইন্ডিয়ার আলাদা মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা। বিদেশি দল শুধু ১১ জন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে মাঠে নামে না—তাদের ইতিহাসের বিরুদ্ধে, গ্যালারির শব্দের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়। যে কারণে অনেকের নজরে এমন ময়দানকে ভেন্যু থেকে বাদ দেওয়ার অর্থ ‘হোম অ্যাডভান্টেজ’ নিজে থেকে জেনেবুঝে কমানো।
গুয়াহাটির ধাঁধা, নতুন ভেন্যুর বাস্তবতা
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে গুয়াহাটি (Guwahati)। নতুন মঞ্চ হিসেবে একে আজকাল সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব একটু আলাদা। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) বিরুদ্ধে এখানে টেস্টে ভারত পরাস্ত হয় বড় ব্যবধানে। আলো সমস্যা, অদ্ভুত টাইমিং—চা বিরতি আগে, লাঞ্চ পরে—এই সব কারণে ম্যাচের ছন্দই যায় বদলে। যে কারণে রবিচন্দ্রন অশ্বিন (R Ashwin) সরাসরি বলেছিলেন, ‘ভারতের মধ্যে থেকেও এটা আমাদের কাছে অ্যাওয়ে ম্যাচের মতো।’অর্থাৎ, সার কথা দাঁড়াল এই, নতুন ভেন্যু মানেই সবসময় বাড়তি সুবিধা নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের খেলোয়াড়রাই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না।
তবু অসম ক্রিকেট সংস্থা (Assam Cricket Association) সুযোগপ্রাপ্তির ফায়দা তুলতে উৎসুক। উত্তর-পূর্ব ভারতে ক্রিকেটের প্রসার—এই যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাজনীতির প্রভাব নাকি নিছক সমাপতন?
সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নটা এখানেই। আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের (Jay Shah) শেকড় আমদাবাদে। বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া (Devajit Saikia) অসমের মানুষ। তাই অনেকের চোখে এই সূচির পেছনে ‘প্রভাব’ কাজ করার সন্দেহ জমেছে। আমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম (Narendra Modi Stadium) আজকাল প্রায় প্রতিটি বড় ম্যাচের ভেন্যু—এটাও সেই সন্দেহকে অনেকটা উসকে দিয়েছে। বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনও সরাসরি স্বীকারোক্তি নেই। তারা অবশ্য একে পরিকল্পিত বিস্তার বলেই দেখাতে চাইছে।
সবশেষে সওয়াল—বিস্তার না পরিচয়ের ক্ষয়… কোনটা নিয়ে তর্ক জমা উচিত? ক্রিকেটের শুধু ছড়িয়ে পড়াই যথেষ্ট, নাকি তার নিজস্ব চরিত্রও ধরে রাখাও জরুরি? ইংল্যান্ডে লর্ডস (Lord’s), অস্ট্রেলিয়ায় এমসিজি (MCG)—এই মাঠগুলো শুধু ভেন্যু নয়, ঐতিহ্যের প্রতীক। ভারতে সেই জায়গাটা বহুদিন ধরে রেখেছিল ইডেন আর ওয়াংখেড়ে। এখন যদি সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়, তাহলে হয়তো নতুন দর্শক আসবে, কিন্তু বহমান আবেগ? সেটা কতদূর টিকবে? সিদ্ধান্ত একচ্ছত্র বোর্ড নিতে পারে, জবাব দেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের জানা।