পিৎজার দোকান থেকে বিশ্বকাপের আলো—গল্পটা শুধু বাইশ গজের নয়… নাছোড়বান্দা এক তরুণের কামব্যাকের কাহিনিও বটে। প্রতিভা, পরিশ্রম আর ধৈর্য মিললে ছোট দেশও বড় মঞ্চে নিজেদের গৌরব-পতাকা ওড়াতে পারে—এই সহজ সত্যিটা আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছেন কৃষাণ কালুগামাগে।

কৃষাণ কালুগামাগে
শেষ আপডেট: 15 February 2026 15:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কয়েক মাস আগেও পিৎজার দোকানে কাজ করতেন। সপ্তাহান্তে সময় বের করে খেলতেন ক্লাব ক্রিকেট। আজ সেই কৃষাণ কালুগামাগে (Crishan Kalugamage) টি-২০ বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম জয়ের অন্যতম নায়ক। শ্রীলঙ্কায় জন্ম, বড় হওয়া ইতালিতে। আর এই মুহূর্তে আজুরিদের জাতীয় দলের ভরসা-জাগানো লেগ স্পিনার।
ইতালির (Italy) ক্রিকেট টিম এ বছর প্রথমবার টি-২০ বিশ্বকাপে খেলছে। মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে (Wankhede Stadium) নেপালকে (Nepal) ১০ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে তারা। সেই ম্যাচে চার ওভারে ৩/১৮ তুলে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছেন কালুগামাগে।
ঐতিহাসিক জয়, স্বপ্নের মঞ্চ
লড়াই খুব কঠিন কিছু ছিল না। নেপালকে ১২৩ রানে অলআউট করার পর ইতালির ওপেনার অ্যান্থনি মোসকা (Anthony Mosca) ৬২* এবং জাস্টিন মোসকা (Justin Mosca) ৬০* রান করে মাত্র ১২.৪ ওভারে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলেন। কিন্তু সেই জয়ের নীরব নায়ক কালুগামাগে। মাঝের ওভারে তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিং নেপালের ইনিংস রুখে দেয়। ম্যাচ শেষে যিনি নিজেই জানান, দেশের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ে ম্যাচসেরা হওয়া তাঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। ওয়াংখেড়ের মতো আইকনিক মাঠে খেলাটা অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। টেলিভিশনে অসংখ্য আইপিএল ম্যাচ দেখেছেন। এবার নিজে সেই ময়দানে নেমে দলকে জেতানো—এক কথায় স্বপ্নপূরণ!
প্রথম খেলায় স্কটল্যান্ডের (Scotland) কাছে হারার পর দলের মনোবল খানিকটা নড়ে গিয়েছিল। অধিনায়ক ওয়েন ম্যাডসেন (Wayne Madsen) যদিও পিছিয়ে পড়ার বান্দা নন। সাফ বলে দেন, ‘নিজেদের শক্তিতে বিশ্বাস রাখতে হবে!’ নেপালকে হারানোর পর সেই ম্যাডসেনের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য, ‘আমরা ভাগ্যবান নই, প্রতিভাবান।’অধিনায়কের কথা যে ফেলনা নয়, বাস্তবোচিত, বুঝিয়ে দিল দলগত সংহতি। বিশেষ করে কৃষাণের লড়াই।
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের ফিরে আসা
২০০৭ সালে পরিবার নিয়ে শ্রীলঙ্কা থেকে ইতালির লুক্কা শহরে চলে যান কালুগামাগে। বাবা কাজ পান একটি রং কারখানায়। মা গৃহবধূ। সংসার চালাতে গিয়ে ক্রিকেটকে কেরিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়ার স্বপ্ন প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল। ঢুকে যান পিৎজার দোকানে। টাকা রোজগারের আশায়।
কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও ক্রিকেট ছাড়েননি। সপ্তাহান্তে রোমে গিয়ে ক্লাব ম্যাচ খেলতেন… স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতেন। যদিও বিশ্বকাপের প্রস্তুতির কথা ভেবে নেন বড় সিদ্ধান্ত। টুর্নামেন্ট শুরুর চার-পাঁচ মাস আগে ছেড়ে দেন চাকরি। লক্ষ্য একটাই: পুরো সময় ক্রিকেটে ঢেলে দেওয়া।
এমনিতে ইতালিতে বেশিরভাগ পিচ অ্যাস্ট্রোটার্ফ। তাই বিশ্বকাপের আগে আজুরি শিবির চলে আসে শ্রীলঙ্কায়। সেখানকার প্রাকৃতিক উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতা অনেক সাহায্য করেছে। বোলিং কোচ অনুষা সমরনায়েকে (Anusha Samaranayake) এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সহায়তার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন কালুগামাগে। যিনি শ্রীলঙ্কায় ফিরতেই ছোটবেলার স্মৃতি ভিড় করে আসে। মনে পড়ে টিভি না থাকলে দাদুর সঙ্গে রেডিওতে ধারাভাষ্য শোনার কথা। দাদু আজ বেঁচে নেই। নাতির বিশ্বকাপ খেলাই কি তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছেপূরণ?
কোহলি অনুপ্রেরণা, হার্দিকের আগুন
কালুগামাগে ছোটবেলায় শ্রীলঙ্কার সনৎ জয়সূর্য (Sanath Jayasuriya) ও অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়ার্নের (Shane Warne) বোলিং দেখে বড় হয়েছেন। পরে আফগানিস্তানের রশিদ খানের (Rashid Khan) থেকে শিখেছেন টেকনিকের খুঁটিনাটি। কিন্তু সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা যিনি, তাঁর নাম বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। কালুগামাগের কথায়, ভারতীয় তারকার শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম আর মানসিকতা তাঁকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করে। চলতি টুর্নামেন্টে হার্দিক পান্ডিয়ার (Hardik Pandya) আগ্রাসী মনোভাবও নজর কেড়েছে।
ফোনে এখন শুভেচ্ছার বন্যা। মা কেঁদেই চলেছেন, আত্মীয়-বন্ধুরা মুহূর্মুহু অভিনন্দন জানাচ্ছেন। সবটাই নতুন। এত ভালোবাসা, সমাদর আগে পাননি কালুগামাগে।
ইংল্যান্ডে ভয় নেই!
ক্রিকেটযাত্রা সহজ ছিল না। ২০১৬ সালে ইতালি ‘এ’ দলে ফাস্ট বোলার হিসেবে শুরু। চোটে থেমে যায় জার্নি। পরে নিজেকে বদলে লেগ স্পিনার হিসেবে ফিরে আসেন। সেই পরিবর্তনই এখন তাঁর বড় শক্তি। পরের ম্যাচ ইংল্যান্ডের (England) বিরুদ্ধে, কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে (Eden Gardens)। কিন্তু কালুগামাগে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, তাঁরা এতটুকু চাপে নেই। ‘ওরা বড় দল। আমাদের হারানোর কিছু নেই!’—মন্তব্যে স্পষ্ট ইতালি শুধু ময়দানে লড়তে নয়, চোখে চোখ রেখে মাইন্ড-গেম খেলতেও শিখে গিয়েছে।
ভবিষ্যতে ভারত-ইতালি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ দেখতে চান কৃষাণ কালুগামাগে। এমনকি ইতালির ক্রিকেটাররা একদিন আইপিএলে খেলছে—সমানে বুনে চলেন এই স্বপ্নও। তাঁর বিশ্বাস, স্রেফ সুযোগ দরকার। সেটা একবার হাতে এলে আজুরিদের ক্রিকেটের নকশা বদলে যাবে।
পিৎজার দোকান থেকে বিশ্বকাপের আলো—গল্পটা শুধু বাইশ গজের নয়… নাছোড়বান্দা এক তরুণের কামব্যাকের কাহিনিও বটে। প্রতিভা, পরিশ্রম আর ধৈর্য মিললে ছোট দেশও বড় মঞ্চে নিজেদের গৌরব-পতাকা ওড়াতে পারে—এই সহজ সত্যিটা আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছেন কৃষাণ কালুগামাগে।