সারা জীবনে পূজারা ১৬২১৭ বল খেলেছেন, যা ১১৩১ বেশি গাভাসকরের থেকে। টেস্ট ক্রিকেটার ইতিহাসে মাত্র ২৯ জন এর থেকে বেশি খেলেছেন।

চেতেশ্বর পূজারা
শেষ আপডেট: 30 August 2025 16:02
সনাতনী টেস্ট ক্রিকেটের শেষ পূজারি চেতেশ্বর বিদায় নিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু ছিলো সময়, যে সময়কে শুধু আকড়ে ধরে না থেকে তাকে একেবারে নিজের করে নিয়েছিলেন পূজি। সম্প্রতি ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন চেতেশ্বর পূজারা (Cheteswar Pujara’s Retirement), যে খেলাকে তিনি একেবারে ছোটবেলায় ভালবেসেছিলেন এবং যে খেলা তাঁকে ভালবেসেছিল। শেষটা একদম সরল ছিল, যেরকম সরল তাঁর ক্রিকেট দর্শন এবং জীবন। আলোর প্রচারে না থাকা ক্রিকেটের একনিষ্ঠ এক ভক্তের বিদায়। সম্ভ্রম এবং সময়কে মান্যতা দিয়ে নিঃশব্দে বিদায় নিলেন চেতেশ্বর পূজারা। যে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ৯০ মাইল গতির বিষাক্ত ছোবল পাঁজরে দিনের পর দিন সামলে আবার পরের বল খেলতেন সেই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন।
তাঁর রান এবং যে ভাবে রান করলেন তা ক্রিকেটীয় লোকগাথার রূপক। ভারতের অষ্টম সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারক টেস্টের ইতিহাসে (১০৩ টেস্টে ৭১৯৫ রান, গড় ৪৩.৬০, ১৯ শতরান)। তাঁর কেরিয়ারের শেষের দিকের সময়টা খারাপ না গেলে অ্যাভারেজ আরও ভাল দেখাত। কিন্তু রাজকোটের ৩ নং কোঠি গ্রাউন্ডের যে হাড়গিলে ছেলেটা একটি নিম গাছের নীচে তাঁর বাবার ছোড়া ১০০০টি বল রোজ খেলতেন, সে যে ৭,১০৩ রানে শেষ করতে পারবে, এটা জানতে পারলে ছোটবেলায় খুব খুশি হতেন।
পূজারা যে ঐতিহ্য ছেড়ে গেলেন, তা শ্রদ্ধায় বিনম্র করে দেওয়ার মতো। তাঁর থেকে অনেক বেশি প্রতিভাসম্পন্ন ব্যাটার ভারতের ইতিহাসে উদয় হয়েছেন, অনেক বেশি টেকনিক্যাল, ডমিনেটিং পাওয়ার ও স্কিল নিয়ে। কিন্তু চেতেশ্বর পূজারা আর হবে না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতের প্রথম সিরিজ জয়ের প্রধান কাণ্ডারি। ১০০ জন ক্রিকেটার বিগত ৭১ বছর অস্ট্রেলিয়াতে সিরিজ জয় করতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। পূজারার চওড়া কাঁধ এবং বুকে ভর দিয়ে আমরা তা পেরেছিলাম। শুধু এইটুকুই জন্য পূজারা ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরকালীন হয়ে থাকবেন, যদি তাঁর অসামান্য টেস্ট রেকর্ড কেউ ভুলে যান। ওই সিরিজে ১২৫৮ বল খেলে ৫২১ রান করেন, যার ৭৫% তিনি ব্লক করেছিলেন এবং সিরিজে ৩ তিনটি শতরান- ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে সেই মর্যাদা পায় যা ১৯৭১ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে গাভাসকরের ৭৭৪ বা ১৯৭১ ইংল্যান্ড সিরিজে স্পিন ত্রয়ীর ৩৭ উইকেট।
২০১৮/১৯ অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তিনি ছিলেন সেই দেওয়াল, যা অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বোলাররা ভাঙতে পারেননি। পূজারা ওই সিরিজে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, এমন এক দেওয়াল যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল দুর্লঙ্ঘ্য ইটের দ্বারা। পূজারার ব্যাটিং দেখে বিশ্ব বিখ্যাত অফ স্পিনার নাথান লিয়ন বলেই ফেলেছিলেন, “তুমি কি ব্যাটিং করতে ক্লান্ত হও না।” উত্তরে পূজারা হালকা হাসি হেসে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন, যেটা তাঁর ট্রেডমার্ক পরিচিতি। শতরান করে উচ্ছাসহীন অভিব্যক্তি তাঁর বরাবরের পছন্দের তালিকায়। শুধু আলতো করে ব্যাট একবার দর্শকের উদ্দেশে তোলা, ব্যাস।
মহাত্মা গান্ধীর দেশের আরেক ক্রিকেট মহাত্মা
সিডনি তে ওরকম একটা শতরান, যা কিনা অস্ট্রেলিয়ার কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছিল, পূজারা একটু বেশি উচ্ছাস তাঁর নিজের তুলনায় দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। কারণ তিনি জানতেন, এর পরে আবার শতরান করতে হবে। কারণ তিনি জানতেন যে, পাহাড় প্রমাণ রান করতে না পারলে পরের ম্যাচে আবার বাদ পড়তে পারেন। রান, একমাত্র রান তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। এর বাইরে কোনও কিছু তাঁকে কোনওদিন উদ্দীপ্ত করতে পারেনি। এই স্বপ্ন পূজারা ছোটবেলা থেকে দেখেছিলেন তাঁর বাবার সঙ্গে, যিনি কিনা একার হাতে তাঁকে বড় করেছিলেন। কারণ পূজারার মা তাঁর বাল্যকালেই ক্যান্সারে অকালে প্রয়াত হয়েছিলেন।
কিন্তু চলে যাওয়ার আগে পূজারার মা রিনা তাঁর ছেলের মধ্যে নম্রতা এবং একমুখী জেদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন। তিনি ধর্মভীরু ছিলেন এবং রোজ পুজো করতেন। পূজারার পিতা যখন রিনাকে জিজ্ঞেস করতেন, “ছেলেকে কেন এত ধর্মমুখী করছ?” রিনা বলতেন, “ও জীবনে অনেক দুঃখ পাবে, জীবনের ধর্ম তাই, পুজো ওকে কঠিন করে তুলবে।”
পূজারার ব্যাটিং দেখে মনে হতো, তিনি পিচের মাঝে ধ্যান করছেন, যেন আরামকেদারায় বসে এক মুনি ধ্যানে মগ্ন। বোলার বল করার আগে পূজারা যেন স্বপ্ন দেখা এক সন্ন্যাসী, ব্যাট হাতে নিয়ে গ্রিপ ঠিক করা এবং পিচে দু’বার ঠক ঠক করা। বোলার যেই বল করতে দৌড়লেন, পূজারার চোখ-মুখ অত্যন্ত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, মনের ভেতরে যুদ্ধ, এবং বলের গুণ বুঝে বল খেলা। বাউন্ডারি বা ডিফেন্স, পূজারার মুখ হিমশীতল। পূজারা যেন আইস প্যাক, কোহলির আগুনের বিপরীতে। কোহলির যুগ যেন পুজারারও যুগ ছিল।
বিরাটের অধিনায়কত্বে ভারত যত শৃঙ্গ জয় করেছে, পূজারার ছাপ সেখানে রয়েছে। কোহলির প্রথম সিরিজ অধিনায়ক হিসাবে-পূজারার কামব্যাক সিরিজ-কলম্বো সিমিং ট্র্যাকে অনবদ্য শতরান। স্টিভ স্মিথের অস্ট্রেলিয়া যখন ভারত জয় করবে বলছে, তখন বেঙ্গালুরু স্পিনিং ট্র্যাকে পূজারার সেই অনবদ্য ইনিংস। পিকফর্মের পূজারা স্পিন বোলিংয়ের বিরুদ্ধে অনবদ্য। রাঁচিতে পরের টেস্টে কামিন্সের আগুনে বোলিংয়ের বিরুদ্ধে এক রূপকথার দ্বিশতক। ২০২১-এ অস্ট্রেলিয়া সফরে আবার সিডনি এবং ব্রিসবেনে রুদ্ধশ্বাস ব্যাটিং করে এক অলৌকিক সিরিজ জয়ের প্রধান কারিগর।
তাঁর সময়ের বেশির ভাগ গ্রেটদের মতো, পূজারা তাঁর সেরা ব্যাটিং করতেন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। অজিদের বিরুদ্ধে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে সিরিজে পূজারা ৫টি শতক করেন ৪৯.৩৮ গড়ে। তাঁর পূর্বসূরি রাহুল দ্রাবিড় ৩৮.৬৭ গড়ে দুটো শতরান করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ভারত যে সব ম্যাচে বিদেশে জিতেছে সেখানে পূজারার গড় ৪৩.৪৭। কোহলির সেখানে ৪০.৫৭। বিদেশে টেস্ট জয়ে শতরানেও পূজারা কোহলির থেকে এগিয়ে, ৬ /৪। সারা জীবনে পূজারা ১৬২১৭ বল খেলেছেন, যা ১১৩১ বেশি গাভাসকরের থেকে। টেস্ট ক্রিকেটার ইতিহাসে মাত্র ২৯ জন এর থেকে বেশি খেলেছেন। কিন্তু পূজারাকে অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ভাবলে ভুল ভাবা হবে । ৫০ থেকে ১০০ পৌঁছতে পূজারা বেশি দেরি করতেন না। লুজ বল পেলেই সেটা বাউন্ডারি পাঠাতে জুড়ি ছিল না।
পূজারার কেরিয়ার শেষ দিকে ট্র্যাজিক নায়কের মতো হয়ে গেল। অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক জয়ের পর পূজারার গ্রাফ ওপরের দিকে ওঠার পরিবর্তে নীচের দিকে নামতে থাকল। পূজারা নিদারুণ লড়াই করে চেষ্টা করলেন দলে টিকে থাকতে। দল থেকে বাদ পড়ার পর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো রঞ্জি ও ডোমেস্টিক টুর্নামেন্ট খেলে, কাউন্টি খেলে, ঝুড়ি ঝুড়ি রান করে পূজারা অনেক চেষ্টা করে দলে ফিরলেন। যতবার তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে পূজারা প্রায় প্রত্যেক বার প্রত্যাবর্তন করেছেন।
পূজারার বিদায় ভারতীয় এবং বিশ্ব ক্রিকেটের এক বর্ণজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি। এমন এক সময় যখন বাজবলের পাল্লায় পরে টেস্ট ক্রিকেট ৪ দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পূজারার মতো এরকম ধ্রুপদী ব্যাটার আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু ধারাবিবরণীর জগৎ ধনী হবে, আমরা যা দেখলাম সদ্য সমাপ্ত ইংল্যান্ড সিরিজে। কমেন্টেটর পূজারা কিন্তু আমাদের হৃদয়ে দাগ ফেলেছেন। চেতেশ্বর পূজারা ক্রিকেট নিবেদিত এক প্রাণ এবং ক্রিকেট চেতেশ্বর পূজারার জন্য নিবেদিত।