সামনে লম্বা কেরিয়ার। সদ্য দলের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব জুটেছে। আইপিএলের দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে তিনি আলোর সন্ধানী। শুধু কেরিয়ারঘাতী নয়, রীতিমতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে ময়দানে ফিরেছেন কয়েক বছর হল।

ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 25 July 2025 11:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: না নামলেও চলত। না নামাটাই ছিল বিচক্ষণতা।
সামনে লম্বা কেরিয়ার। সদ্য দলের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব জুটেছে। আইপিএলের দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে তিনি আলোর সন্ধানী। শুধু কেরিয়ারঘাতী নয়, রীতিমতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে ময়দানে ফিরেছেন কয়েক বছর হল। তার মধ্যে লর্ডসে আঙুলে চোট। আর গতকাল, ম্যাঞ্চেস্টারে, পায়ের পাতায়। মেটাটারসালে চিড় ধরেছে। শচিন চোট পেয়ে টেনিস এলবোকে জাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর আঘাতে চর্চায় ‘মেটাটারসাল ফ্র্যাকচার’।
ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে, শুধু এই টেস্ট কেন, বাকি সিরিজেও মাঠে নামতে পারবেন না ঋষভ পন্থ। কতদিন? ঠিক নেই। হতে পারে ছয় সপ্তাহ। কিংবা আট। সার্জারি লাগবে? সেটাও বলা মুশকিল। ফিরবেন যবে, স্বাভাবিক ছন্দেই ফিরবেন? জবাব এবারও অধরা!
একগুচ্ছ সংশয়, ধোঁয়াশা আর উৎকণ্ঠা যখন ম্যাঞ্চেস্টারের চিমনির ধোঁয়াপাকানো বাতাসে পাক মেরে উঠছে, ঠিক তখনই, সবাইকে চমকে দিয়ে বিসিসিআইয়ের একটি ট্যুইট ভেসে ওঠে। আশার বুদ্বুদে ঠিকরে পড়া অবিশ্বাসের কিরণ। যার গায়ে লেখা, ‘যদি প্রয়োজন পড়ে, ঋষভ পন্থ ব্যাট হাতে নামলেও নামতে পারেন!’
‘যদি প্রয়োজন’ শব্দবন্ধটা বেশ গোলমেলে। কার প্রয়োজন? দলের? কিন্তু সেই নিবেদন মেটাতে গেলে তো একজনের কেরিয়ারের বারোটা বেজে যাওয়ার চূড়ান্ত সম্ভাবনা! এমন হাড়ে চিড় ধরেছে, যেটা কিনা হাঁটাচলার মেকানিজমের জন্য একান্ত জরুরি। সেখানে ঠোক্কর খাওয়ার অর্থ বিছানায় শুয়ে থাকা, নিয়ত শুশ্রূষা, প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার। কাল শেষবেলায় যিনি বাইশ গজে চিত হয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন… স্বভাবে সিংহহৃদয় এক তরুণ ক্রিকেটার হাঁটতে পর্যন্ত পারছেন … তাঁকে ড্রেসিং রুমে নিয়ে যেতে গলফের গাড়ি ডেকে আনতে হচ্ছে… অকথ্য যন্ত্রণায় ধুঁকতে ধুঁকতে যিনি মাঠ ছাড়েন… মাথা আনত, মুখে আঁধার নেমে এসেছে… তিনি নিজের প্রয়োজন না দেখে আর কার প্রয়োজনে মাঠে নামবেন? দলের? অফ ফর্মে যে দল দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল? চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে স্থান পর্যন্ত জোটেনি… তাদের স্বার্থে কীভাবে মাঠে নামবেন? কেন নামবেন? বিসিসিআই রসিকতা করছে না তো? মেডিক্যাল বুলেটিনের রিপোর্ট আসার কথা যখন, তখন এ আবার কেমনতর ট্যুইট?
চিন্তার কামারশালায় যখন হাতুড়ির ঘা নেমে আসছে, ঠিক তখনই উইকেটপতন। শার্দুল ঠাকুর আউট হয়ে ড্রেসিং রুমের পথে। গোটা স্টেডিয়াম গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। ভারতের ইনিংসের নটে গাছটি মুড়োনো স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। একে একে বোলাররা নামবেন। আর পটাপট উইকেট তুলে ম্যাচের রাশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
হিসেবমতো নামার কথা ছিল ওয়াশিংটন সুন্দরের। কিন্তু ক্যামেরা ড্রেসিং রুমে তাক করা মাত্র হৃষ্টপুষ্ট, বেঁটেখাটো কাউকে নামতে দেখা গেল। বগলদাবা ব্যাট। হাতের গ্লাভস ঠিক করছেন। তারপর হেলমেট।
নামছেন। কিন্তু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। চলছেন। কিন্তু থমকে থমকে। সাজঘর থেকে বাইশ গজ। ৫০ মিটারের দূরত্ব পেরতে অন্যদিনের চাইতে অনেক বেশি সময় নিলেন ঋষভ। কিন্তু এই বাড়তি মিনিট তাঁর প্রয়োজন ছিল। দর্শকদের উল্লাস-বিস্ময়-উৎকন্ঠাকে মশলার মতো পিষে ‘অনুপ্রেরণা’ ও ‘আত্মবিশ্বাস’ নামক দুটো সঞ্জীবনী তৈরিতে এই সময় লাগত ঋষভের।
সাকুল্যে ৫৯ মিনিট ক্রিজে ছিলেন। গতকালের থমকে থাকা ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন স্বাভাবিক কায়দায়। স্লোয়ার বলে হাঁকিয়ে চার, বাউন্সারে সমীহ… কখনও কভার ড্রাইভ, কখনও লং অফকে নিশানা করলেন। বেন স্টোকস তাঁর আহত পা-কে লক্ষ্য করে ইয়র্কারের পর ইয়র্কার ছুড়লেন। বিক্ষত প্রতিদ্বন্দ্বীকে এতটুকু সমীহ দেখালেন না।
কিন্তু ঋষভের পা ভেঙেছে। তিনি তো মচকাননি। তাই জোফ্রা আর্চারের বলে স্ট্যাম্প ছিটকে গেলেও ঋষভের ইনিংস ক্রিকেটের চিরন্তন ইতিহাসের প্রত্নপ্রতিমা হয়ে রইল!
মার্ভে ডিলনের বাউন্সারে চোয়াল ভাঙার পরেও অ্যান্টিগায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১৪ ওভার বল করেছিলেন অনিল কুম্বলে। আউট করেছিলেন ব্রায়ান লারাকে। ঋষভের ৫৪ সেই অমর কিংবদন্তির পাশে জায়গা করে নেবে। এই হাফসেঞ্চুরি অনেক সেঞ্চুরির চেয়েও পূর্ণতর। ‘যদি প্রয়োজন পড়ে…’-র কেজো ঘোষণার অসম্ভাব্যতাকে যা ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয়!