৯ ফেব্রুয়ারি নাটকের শেষ অধ্যায়। সহযোগী দেশগুলির আর্থিক ক্ষতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে এমিরেটস বোর্ড। এমনকি বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলতে অনুরোধ জানায়—‘বিশ্ব ক্রিকেটের স্বার্থে’।

ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 10 February 2026 10:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যা হওয়ার ছিল, শেষ পর্যন্ত তাই হল। ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ বয়কটের হুমকি দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ তৈরির চেষ্টা করেছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু টি-২০ বিশ্বকাপের (T20 World Cup 2026) মতো মেগা ইভেন্টে সেই অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে রাখা যে প্রায় অসম্ভব, সেটা জানত খোদ পাকিস্তানও। শেষ ফল? সরকারি নির্দেশে ইউ-টার্ন। ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে নামছে পাকিস্তান। প্রশ্ন একটাই—কীভাবে এই পিছু হটানো সম্ভব হল?
শুরুটা কোথায়: ‘নৈতিক অবস্থান’ না কৌশলগত চাপ?
নাটকের সূত্রপাত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (International Cricket Council) যখন বাংলাদেশের গ্রুপ ম্যাচ ভারতের বাইরে সরাতে রাজি হয়নি, তখনই ক্ষোভ প্রকাশ করে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (Pakistan Cricket Board)। চেয়ারম্যান মহসিন নকভি (Mohsin Naqvi) ইঙ্গিত দেন ‘কঠোর সিদ্ধান্তে’র। ১ ফেব্রুয়ারি সেই ইঙ্গিত বাস্তব রূপ নেয়। পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে—বিশ্বকাপে দল যাবে, কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে না।
এই ঘোষণার পর আইসিসি স্পষ্ট করে দেয়, ম্যাচ না খেললে পয়েন্ট কাটা ও আর্থিক জরিমানার সম্ভাবনা রয়েছে। তবু ইসলামাবাদ নড়েনি। তখনও মনে হচ্ছিল, বিষয়টা রাজনৈতিক অঙ্গুলিহেলনেই চালানো হচ্ছে।
আইসিসির চাপ: টাকার অঙ্ক আর বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতা
৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা (Imran Khwaja) এবং এমিরেটস ক্রিকেট বোর্ডের (Emirates Cricket Board) কর্তা মুবাশির উসমানি (Mubashir Usmani) নকভির সঙ্গে একের পর এক বৈঠকে বসেন। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল সম্প্রচারস্বত্ব আর রাজস্ব। ভারত-পাক ম্যাচ মানে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ‘রেভিনিউ ড্রাইভার’। এই ম্যাচ বাতিল হলে দুর্ভোগ শুধু আয়োজকদের নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হত সহযোগী দেশগুলিও, যারা আইসিসির রেভিনিউ-শেয়ারিং মডেলের উপর নির্ভরশীল।
এই পর্যায়ে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের (Sri Lanka Cricket) সভাপতি শাম্মি সিলভা (Shammi Silva) সরাসরি চিঠি লেখেন পিসিবিকে। কলম্বো ম্যাচ বাতিল হলে যে আর্থিক ধাক্কা শ্রীলঙ্কার কাঁধে পড়বে, তা ‘বিধ্বংসী’ হতে পারে—এই সতর্কবার্তাও পৌঁছে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, একসময় আন্তর্জাতিক নির্বাসনের সময়ে পাকিস্তানের পাশে তাঁরাই দাঁড়িয়েছিল।
কেন শেষ পর্যন্ত পিছু হটল পাকিস্তান?
৭ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচ জেতার পর পিসিবি আইসিসির কাছে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ধারা প্রয়োগের আবেদন করে। যুক্তি—সরকারি নির্দেশের কারণে ভারতের বিরুদ্ধে খেলা সম্ভব নয়। কিন্তু আইসিসি সেই আবেদন খারিজ করে জানায়, সব বিকল্প চেষ্টা না করে এমন দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি লাহোরে পাঁচ ঘণ্টার বৈঠক। হাজির ছিলেন ইমরান খাজা ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (Bangladesh Cricket Board) সভাপতি আমিনুল ইসলাম (Aminul Islam)। এখানেই প্রথম বোঝা যায়, পাকিস্তান পুরোপুরি সংঘাতে যেতে চাইছে না। বরং সম্মান বাঁচিয়ে বেরনোর রাস্তা খুঁজছে।
৯ ফেব্রুয়ারি নাটকের শেষ অধ্যায়। সহযোগী দেশগুলির আর্থিক ক্ষতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে এমিরেটস বোর্ড। এমনকি বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলতে অনুরোধ জানায়—‘বিশ্ব ক্রিকেটের স্বার্থে’। এরপর রাতেই প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (Shehbaz Sharif) নির্দেশ, দল মাঠে নামবে।
সব মিলিয়ে, আইসিসির কৌশল সোজাসাপটা—রাজনীতি নয়, অর্থনীতি আর সিস্টেমের বাস্তবতা সামনে রাখা। পাকিস্তানের বয়কট-হুমকি শেষ পর্যন্ত ধাক্কা খেল সেই জায়গাতেই, যেখানে আধুনিক ক্রিকেট সবচেয়ে বেশি জটিল—টাকার অঙ্ক। হুঙ্কার দিয়ে শুরু হলেও শেষটা হল পর্বতের মূষিক-প্রসবেই।