একদিকে স্ত্রীর মৃত্যু, অন্যদিকে ছেলে সঞ্জয় দত্তের নেশার বশবর্তী হয়ে জেল হওয়া, দীর্ঘ জীবনে বহু শোক পেয়েছিলেন সুনীল দত্ত। তবু নিজের কাজ তিনি নানা ভাবে করে গিয়েছেন।

সুনীল দত্ত । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 6 June 2025 15:05
আসল নাম বলরাজ দত্ত। জন্ম ৬ জুন, ১৯৩০ পাঞ্জাবে ঝিলম জেলার খুর্দ গ্রামে মোহাল ব্রাহ্মণ পরিবারে। এটি বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তগর্ত। তবে দেশভাগের পর হরিয়ানার যমুনা নদীর তীরে যমুনানগর জেলার মান্ডলি গ্রামে তাঁর ছেলেবেলা কাটে। পাকিস্তান থেকে চলে আসার সময় তাঁরা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে আর্থিক অনটনেই কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। কিন্তু মনে ছিল রুপোলি পর্দার প্রতি টান, যা তাঁকে একদিন রিল পর্দার সুপারস্টার বানিয়ে দেয়। তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা সুনীল দত্ত। আজ তাঁর জন্মদিন।
মুম্বই আসার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য জয়হিন্দ কলেজে ভর্তি হন। সঙ্গে সঙ্গে রেডিও শিলনে ঘোষক হিসেবেও যোগ দেন। এই সময় তাঁর 'লিপটন কি মেহফিল' অনুষ্ঠান খুবই জনপ্রিয় হয়। এই সুবাদে তিনি দিলীপ কুমার, শাম্মি কাপুরের মতো বেশ কিছু স্বনামধন্য ফিল্মি ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সুনীল দত্ত ছিলেন নার্গিসের ভক্ত। মজার ব্যাপার হল, একবার তিনি নার্গিসের সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে নার্গিস সেই প্রস্তাব চার বার প্রত্যাখান করেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি সুনীল দত্ত। শেষমেশ নার্গিসের স্টারডম হার মানে সুনীল দত্তের সাধনার কাছে। তখন নায়িকা নার্গিস নিজেই জানতেন না, একদিন তাঁর স্বামী হবেন এই সুনীল দত্ত।

এইসময় সুনীল দত্তর রাশভারী কণ্ঠস্বর ও আর্কষণীয় ব্যক্তিত্ব বিখ্যাত পরিচালক রমেশ সায়গলকে মুগ্ধ করে। তাঁর হাত ধরেই বলিউডে প্রবেশ বলরাজের। সায়গলের পরামর্শেই তিনি বলরাজ দত্ত থেকে হয়ে যান সুনীল দত্ত। সেই প্রথম ছবি ছিল 'রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম'।
সুনীল দত্তের স্বপ্ন সত্যি হয় যখন তিনি 'মাদার ইন্ডিয়া' ছবিতে নার্গিসের সঙ্গে অভিনয় করেন। নার্গিসের বদরাগী ছেলের চরিত্রে ছিলেন সুনীল দত্ত। 'মাদার ইন্ডিয়া' শ্যুটিংয়ের সময় সেটে আগুন লেগে গিয়েছিল। সেই সময় অগ্নিকাণ্ড থেকে নার্গিসকে বাঁচিয়েছিলেন সুনীল দত্ত। এরপর থেকেই নার্গিসের হৃদয় জয় করে নেন সুনীল দত্ত। যখন 'মাদার ইন্ডিয়া' রিলিজ করে তখনই ১৯৫৮ সালের ১১ মার্চ নার্গিস বিয়ে করেন সুনীলকে। তাঁদের এক ছেলে সঞ্জয় দত্ত ও দুই মেয়ে প্রিয়া দত্ত ও নম্রতা দত্ত।

সুনীল দত্তের উল্লেখযোগ্য ছবি 'এক হি রাস্তা', 'মাদার ইন্ডিয়া', 'এক ফুল চার কাঁটে', 'ম্যায় চুপ রহুঙ্গি', 'গুমরাহ', 'আজ অউর কাল', 'ওয়াক্ত', 'মেরা সায়া', 'পড়োশন', 'রেশমা অউর শেরা', 'জখমি', 'শান', 'রকি', 'পরম্পরা', 'ক্ষত্রিয়', 'মুন্নাভাই এমবিবিএস', 'ওম শান্তি ওম'।
শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার 'মুঝে জিনে দো' ও 'খানদান' ছবির জন্য পান সুনীল দত্ত। বাংলা থেকেও 'মিলন' ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার বিএফজেএ পুরস্কার প্রদান করা হয় তাঁকে। ১৯৬৮ সালে পান পদ্মশ্রী পুরস্কার। বহুবার লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি, ফিল্মফেয়ার, স্টারস্ক্রিন, আনন্দলোক, জি সিনের তরফ থেকে। ১৯৮২ সালে তিনি বম্বের শেরিফ হন। ২০০৫ সালে পান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। এছাড়াও আই আই এফ এস লন্ডন থেকে 'গ্লোরি অফ ইন্ডিয়া' পুরস্কার পান।
নার্গিস মারা যান ১৯৮১ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে ক্যানসারে। লন্ডনে নিয়ে গিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়েছিলেন সুনীল দত্ত কিন্তু তবু নার্গিসকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।

একদিকে স্ত্রীর মৃত্যু শোক, অন্যদিকে ছেলে সঞ্জয় দত্তের নেশার বশবর্তী হয়ে জেল হওয়া, দীর্ঘ জীবনে বহু শোক পেয়েছিলেন সুনীল দত্ত। তবু নিজের কাজ তিনি নানা ভাবে করে গিয়েছেন।
১৯৮৪ সালে লোকসভা ভোটে সুনীল দত্ত প্রথম মুম্বই উত্তর পশ্চিম কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হন। সেই থেকে যতবার তিনি ঐ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হন ততবারই জয়লাভ করেন। সিনেমার মতো রাজনীতির ময়দানেও তিনি কংগ্রেসের এম পি হিসেবে বিশাল জনপ্রিয়তা পান। তিনি পাঁচ বার সাংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

২৫ মে ২০০৫ সালে মুম্বইয়ের বান্দ্রার বাড়িতে ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মহাপ্রস্থানের পথে পাড়ি দেন ৭৫ বছরের সুনীল দত্ত। তবে 'মুন্নাভাই এমবিবিএস' জীবনের শেষ ছবিতে ছেলে সঞ্জয়ের সঙ্গে বাবার ভূমিকাতেই অভিনয় করেন সুনীল দত্ত। দেখে যান ছেলের সফল কামব্যাক।