'আপিস' ছবির প্রাণপ্রতিমা হাসি। হাসি নাম হলেও তার জীবনে হাসি নেই। বরং সে নিজের হাসি সব গেরস্থ বাড়িতে বিলিয়ে দেয়।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 20 June 2025 20:49
ছবি: আপিস
চরিত্র চিত্রণে: সুদীপ্তা চক্রবর্তী, সন্দীপ্তা সেন, কিঞ্জল নন্দ, তথাগত চৌধুরী
পরিচালনা: সুদেষ্ণা রায় ও অভিজিৎ গুহ
দ্য ওয়াল রেটিং: ৭.৫/১০
দুই নারী হাতে তরবারি ... দুজনের আর্থিক, সামাজিক পরিবেশ আলাদা কিন্তু দুজনেই লড়ছেন নিজের সত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রাখতে। শহরে চলছে নতুন ছবি 'আপিস' (Aapish)। বাণী বসুর কাহিনি অবলম্বনে এই ছবি, পরিচালনায় অভিজিত গুহ (Abhijit Guha) ও সুদেষ্ণা রায় (Sudeshna Roy) পরিচালকদ্বয়। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে দুই নারী, পরিচারিকা হাসি আর তাঁর মালকিন জয়িতা।
'আপিস' ছবির প্রাণপ্রতিমা হাসি। হাসি নাম হলেও তার জীবনে হাসি নেই। বরং সে নিজের হাসি সব গেরস্থ বাড়িতে বিলিয়ে দেয়। জীবনভর তাঁর স্ট্রাগল। যার জীবন কাটে অভাবের উঠোনে। আমাদের সবার বাড়ির বাচ্চা দেখার কিংবা প্রাত্যহিক কাজে সাহায্যকারিনীদের নিয়েই 'আপিস' ছবির গল্প। যাদের ছাড়া আমাদের এক পা চলে না। তারা সকালে আসা মানেই মুশকিল আসান। কিন্তু তাদের অন্তরমহলের খবর কেউ রাখে না।

'আপিস' ছবিটির রাশ টেনে রেখেছেন পর্দায়, হাসি সুদীপ্তা চক্রবর্তী (Sudipta Chakraborty)। রিকশাওয়ালা স্বামীর ছেঁড়া জামা সেলাই, অসহায় শ্বশুরকে বাবার মর্যাদা দিয়ে ঝুপড়ি ঘরে রাখা, সেবা করা বা বস্তিতে বৃষ্টিস্নাত হাসির অভিব্যক্তি ... সুদীপ্তা চোখ টেনে রাখেন পর্দায়। নিজেকে উজাড় করে পরিচারিকা হাসির চরিত্রে অভিনয় করে গেলেন সুদীপ্তা। বডি ল্যাঙ্গোয়েজে যেন আমাদের রোজকার দেখা চরিত্র। তার নিজের যেন ঝুপড়ি ঘরে সেলাই করা সংসার।
তবে এই ধরণের চরিত্রেই তো শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার (National Award) পেয়েছিলেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'বাড়িওয়ালি'র মালতীর পরের সিক্যুয়েল যেন এই সুদেষ্ণা-অভিজিতের 'আপিস'। 'বাড়িওয়ালি' ছবিতে সুদেষ্ণা নায়িকা রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের হেয়ারড্রেসার চরিত্রে অভিনয়ও করেন, আবার ঋতুপর্ণর ছবির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সুদেষ্ণা-অভিজিৎ। সেই মালতী সুদীপ্তাকেই যেন পঁচিশ বছর দেখা গেল। এই মালতী পুরনো বাড়ি ছেড়ে এখন ঝা চকচকে অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করে।
অনবদ্য অভিনেত্রী সুদীপ্তা। তবু কিন্তু যে একটা থেকেই যায়। সুদীপ্তা চক্রবর্তী যেন এই ধরণের প্রান্তিক চরিত্রে টলিউডে টাইপকাস্ট হয়ে গিয়েছেন। তিনি তো এই চরিত্রে মাস্টারক্লাস অভিনয় করবেনই। যিনি মঞ্চে রাজরানির মতো 'নটী বিনোদিনী' করছেন, তিনি কিন্তু মালতীর থেকে মুক্তি পেলেন না। ২৫ বছর পরও ঐ একই ঘেরাটোপে বন্দিনী কমলা। সুদীপ্তাকে পরিচালকরা অন্যধরণের চরিত্রে ব্যবহারও আজকাল আর করেন না। তবু 'আপিস' সুদীপ্তার ছবি।
আর তাঁর রিকশাওয়ালা স্বামীর চরিত্রে যোগ্য সঙ্গত দিলেন তথাগত চৌধুরী। 'বিনোদিনী অপেরা' তে রসরাজ তথাগতর অভিনয় প্রথম দেখে মুগ্ধ হই। আবারও সেই সুদীপ্তা বিনোদিনীর সাথেই তথাগত এলেন মঞ্চ থেকে পর্দায়। দুজনের চরিত্র প্রান্তিক শ্রেণীর কিন্তু কী জীবন্ত অভিনয়।
আরেক নারী সন্দীপ্তা সেন, জয়িতা। যার ছোট্ট ছেলেকে দেখভাল করেন সুদীপ্তা। হাসির ওপর সংসার ফেলে চাকরিতে বেরোতে পারেন জয়িতা। সন্দীপ্তার রূপ রহস্য আর সুদীপ্তার ধারালো উপস্থিতি দুয়ের যুগলবন্দীতে টানটান গল্প। এক অপত্যের বেড়ে ওঠায় দেবকী জন্মদাত্রী আর যশোদা অনামী আয়া দুজনের ভূমিকাই কম নয়। যা এই ছবির মূল বার্তা।
সন্দীপ্তার স্বামীর চরিত্রে বড্ড বাস্তব কিঞ্জল নন্দ। কিঞ্জল-সন্দীপ্তার জুটিটিও বেশ লাগল।
%20(2)-3e737eb0-46a5-11f0-a121-13364469a284.jpg)
তবে নিজের ছবিতে নিজের উপস্থিতিতে নজর কাড়লেন সুদেষ্ণা রায়। আটপৌরে মা নন তিনি। ছেলে-বৌমাকে ফ্ল্যাটে সংসার পেতে দিয়ে, মা চলে গেছেন হোমে। নিজের ইচ্ছে মতো বাঁচতে। শাশুড়ি রূপী সুদেষ্ণা ছেলে-বৌমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাদের বাচ্চা দেখার আয়া না এলে তিনি নাতির ন্যানি হতে পারবেন না। এই ঠাকুমা স্বার্থপর নন কিন্তু তিনি নিজের আইডেন্টিটি বিসর্জন দেন না। ছেলের সংসারে তিনি রাত কাটাবেন না।

পুরুষতন্ত্রের হয়ে আসা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিন নারী সুদেষ্ণা, সন্দীপ্তা, সুদীপ্তা নিজেদের মতো করে লড়ছেন। এখানেই 'আপিস' ছবির জয়। ছোট্ট বুবলাই এর চরিত্রে আর্যদীপ যেমন মিষ্টি, তেমন সাবলীল অভিনয়ে।
সুদেষ্ণা-অভিজিৎ পরিচালক জুটি কোনওকালেই আর্ট ছবি বানাননি। সহজ কথা সহজ ভাবে বলতেই তাঁরা অভ্যস্ত। এই ছবি সবার ছবি। যে বার্তা ছবিটি দিচ্ছে তা খুব সমাজের জন্য দরকারি।
নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মান দরকার হয় যা শেখালো এই ছবি। পদ্মনাভ দাশগুপ্তর চিত্রনাট্য টানটান। সংগীত পরিচালক রণজয় ভট্টাচার্য একখানি গান ছবিতে বারবার ফিরে আসে, যা শ্রুতিমধুর ও যথাযোগ্য। আবহ মন ছোঁয়া। হেমা মুন্সি কেশসজ্জায় সার্থক-সৃজিতা।
সুদীপ্তা চক্রবর্তী আবারও প্রমাণ করলেন চরিত্রের স্টেটাস নয় চরিত্রের গুরুত্ব একজন অভিনেত্রীর কাছে কতটা দরকারি। ছবির শেষ দৃশ্যে সুদীপ্তার সংলাপ মন জিতে নেয়, চোখের কোণে জল আনে।
'আমাদের সবারই একটা আপিস দরকার'...