গায়িকা, নায়িকা, নৃত্যশিল্পী ত্রিধারার মিলনে যেন রুমাকে গড়েছিলেন ঈশ্বর। প্রথাবর্হিভূত নায়িকা হয়েই তিনি নিজের জাত বুঝিয়ে দেন।

রুমা-লীনা। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 June 2025 19:55
'একসঙ্গে থাকা সম্ভব হয়নি বলেই আলাদা হয়েছিলাম। বন্ধুত্ব অমলিন রয়ে গেছে। আমার সঙ্গে অরূপের বিয়ে হওয়ার পরও কিশোর আমাদের কলকাতার বাড়িতে এসেছে।'
রুমা গুহঠাকুরতা (Ruma Guhathakurata), তাঁর পরিচয় শুধু কিশোর কুমারের (Kishore Kumar) বউ নয়। গায়িকা, নায়িকা, নৃত্যশিল্পী ত্রিধারার মিলনে যেন রুমাকে গড়েছিলেন ঈশ্বর। প্রথাবর্হিভূত নায়িকা হয়েই তিনি নিজের জাত বুঝিয়ে দেন। তবু রুমা গুহঠাকুরতা, কিশোর কুমারের প্রথম প্রাক্তন স্ত্রী এই পরিচয় বারবার উঠে এসছে চর্চায়। বিয়ে ভেঙে গেছে, দু'জনেই আবার বিয়ে করেছেন কিন্তু কিশোর-রুমার সম্পর্কে কখনও তিক্ততা আসেনি। আসলে দুই প্রাক্তনের মধ্যে সেতুবন্ধ করে রেখেছিলেন পুত্র অমিত কুমার।

তাঁর আসল নাম রুমা ঘোষ। জন্ম ২১ নভেম্বর ১৯৩৪। মা সতী ঘোষ দেবী ছিলেন ক্লাসিক্যাল গায়িকা, তাঁর কাছেই গানের তালিম নেন রুমা। এর পর আলমোড়াতে উদয় শঙ্কর অ্যাকাডেমিতে ছোট্ট রুমাকে পাঠানো হয় নৃত্যশিক্ষার জন্য। এছাড়াও বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শিশুশিল্পীর রোল করেছেন 'জোয়ার ভাটা' ছবিতে, যে ছবি ছিল দিলীপ কুমারের প্রথম ছবি।
'পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট' বাংলা ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে বিদুষী নায়িকার চরিত্র করে তুমুল জনপ্রিয়তা পান রুমা। এরপর 'ক্ষণিকের অতিথি', 'গঙ্গা', 'বেনারসি', 'পলাতক', 'নির্জন সৈকতে', 'বাঘিনী', 'আশিতে আসিও না', 'পঞ্চশর','আরোগ্য নিকেতন','যদি জানতেম' এমন অনেক ছবিতে রুমার অভিনয় স্মরণীয়।
আশির দশকের রঙিন বাংলা ছবিতে মায়ের চরিত্রে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন স্নেহশীলা রুমা।
তবে অভিনয়ে আসার প্রথম যুগেই রুমা-কিশোরের প্রথম সংসার ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল। মাত্র আট বছরের বিবাহিত জীবন ছিল তাঁদের। স্বপ্ন মধুর মোহে দ্বৈত জীবন কাটেনি।

১৯৫০ সালে কিশোরকে বিয়ে করে মুম্বই চলে যান রুমা। ১৯৫২ সালে তাঁদের কোল আলো করে আসে পুত্র অমিত কুমার। কিন্তু তারপর থেকেই ইগোর লড়াই শুরু হয় এই তারকা দম্পতির। কিশোর কুমার চেয়েছিলেন স্ত্রী বাড়িতে বসে ঘরকন্না করবেন, ছেলেকে বড় করবেন। কিন্তু রুমা নিজের এতদিনের গড়ে তোলা কেরিয়ার ছাড়তে চাননি। আর ঠিক সেসময় 'ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার'কে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন রুমা। কিশোর কুমার এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি বলেছিলেন 'আমাকে আপনারা বলতেই পারেন গ্রাম্য মানসিকতার। রুমা চেয়েছিল নিজের কেরিয়ার আর কয়্যার গড়ে তুলতে। আমি চেয়েছিলাম রুমা সংসার গড়ে তুলুক। আমি একদমই বিশ্বাসী নই সংসার ছেড়ে মেয়েদের কেরিয়ার গড়ার বিষয়ে। আগে তাঁদের সংসার কী ভাবে করতে হয় শেখা উচিত। আমরা কী ভাবে একসঙ্গে পথ চলতাম? তাই দু'জনের দুটি পথ আলাদা হয়ে গেল।'
রুমা কিন্তু ১৯৬০ সালে কলকাতা ফিরে অরূপ গুহঠাকুরতাকে দ্বিতীয় বিবাহ করার পর সুন্দর সংসার গুছিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি বিখ্যাত গুহঠাকুরতা পরিবারের বড় বউ। দুই সন্তান অয়ন আর শ্রমণার মা। কিন্তু গুহঠাকুরতা পরিবারে এসে 'ক্যালকাটা ইউথ কয়্যার' কে প্রস্ফূটিত করতে পারলেন রুমা।,যা কিশোরের সংসারে হত না।

ওদিকে যত বছর এগিয়েছে কিশোর বারবার সম্পর্কে জড়িয়েছেন আর বিয়ে করেছেন। পরের তিন স্ত্রীও নায়িকা। স্বপ্নসুন্দরী মধুবালা, যোগিতা বালি আর সবশেষে লীনা চন্দ্রাভারকর। লীনার সঙ্গে কিশোরের বয়সের তফাত ছিল একুশ। প্রায় পিতা-পুত্রী জুটি ছিলেন তাঁরা। লীনা তখন এক অসহায় বিধবা। কিশোর কুমার বলছেন 'আমিও তখন তিনবার বিয়ে ভেঙে শান্তি খুঁজছি, লীনাও স্বামীকে হারিয়ে আমার সঙ্গে দ্বিতীয় সংসারে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করত। আঘাত আমরা দুজনেই আগের সম্পর্কর থেকে পেয়েছিলাম তাই থিতু হতে চাইছিলাম।"
লীনা তখন উঠতি নায়িকা। কিশোরকে বিয়ে করে ঘোর সংসারী হয়ে যান লীনা। পুরুষত্বের দাপটে কোনও স্ত্রকে অভিনয় জগতে থাকতে দিতে চাননি কিশোর। এই কারণেই রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে সংসার ভাঙে কিশোরের। পরবর্তী স্ত্রীদেরও একই ভাবে ইন্ডাস্ট্রির বাইরে আনতে চেয়েছিলেন কিশোর। ঘরের বউ হয়েই থাকবে তাঁরা।
![]()
প্রেমের সূত্রপাত কালিম্পঙে! লীনা গেছিলেন 'মন কী বাত' ছবির শ্যুটিংয়ে। কিশোর গেছিলেন জওয়ানদের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে। কিশোর কুমারের মতো কিংবদন্তি গাইবেন শুনে নতুন নায়িকা লীনা গিয়েছিলেন গান শুনতে। তখন কিশোরকে দেখে মুগ্ধ হন লীনা। কিন্তু প্রেম জাগেনি। লীনা তখন সদ্য স্বামীহারা। লীনার বাবা খুব ধূমধাম করে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে লীনার বিয়ে দেন। স্বামীর মৃত্যুর স্মৃতি ভুলতেই লীনা ফিরে এসেছিলেন অভিনয় জগতে। কিশোরের কিন্তু লীনার লাবণ্যে চোখ আটকে যায়। বয়সে কী আসে যায়!
বয়সের বিশাল তফাত মুছে গেল কিশোর কুমার ওজনদার নাম আর গ্ল্যামারের আড়ালে। ১৯৮০ র ১৪ মার্চ চতুর্থ বার লীনাকে বিয়ে করলেন কিশোর। এই বিয়েতে কিশোরের দাদামণি অশোক কুমারের মত ছিল না। পরিবারের কেউ মেনে নেয়নি লীনাকে প্রথমে। কিশোরের উদ্ভট বহুগামিতায় সবাই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। আরেক ভাই অনুপ কুমার মানেননি এই বিয়ে। ছোট ছেলে সুমিত হবার আগে আনুষ্ঠানিক বিয়ে কিশোর লীনা করেছিলেন। কিন্ত সুন্দর মুখশ্রীর লীনা নিজের নায়িকা সত্ত্বা বিসর্জন দিয়ে দেন কিশোরের পায়ে।
কিশোর কুমারের প্রয়াণের পর বড় ছেলে অমিত কুমারের সঙ্গে লীনার সুসম্পর্ক বজায় ছিল। একই বাড়িতে দীর্ঘদিন তাঁরা থাকেন। রুমা গুহঠাকুরতার শেষ জীবনে বার্ধক্যেজনিত অসুস্থতা বেড়ে যাওয়াতে ছেলে অমিত কিশোর কুমারের 'গৌরীকুঞ্জ' বাড়িতে রুমাকে নিয়ে গিয়ে শেষদিন অবধি রেখেছিলেন। একই বাড়িতে ছোট বৌ লীনা আর বড় বৌ রুমা একসঙ্গেই থাকতেন। খুব মজা করেই থাকতেন তাঁরা। রুমা আর লীনা সম্পর্ক সতীনের নয়, দিদি-বোন বা মা-মেয়ের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। শেষদিকে রুমার দীর্ঘ অসুস্থতায় সমস্ত সেবা নিজ হাতে লীনা করেছিলেন। লীনার এই ভালবাসায় ঋণী ছিলেন রুমার তিন পুত্র কন্যা অমিত,অয়ন, শ্রমণা। শয্যাশায়ী রুমাকে বসিয়ে হাত ধরে জন্মদিনের কেকও কাটিয়েছেন লীনা। সতীন কাটা মিথ মিথ্যে করে দিয়েছিলেন রুমা-লীনা।

রুমার একদম শেষদিকে আবার কলকাতা ফিরে আসেন নিজের সংসারে। তবে তিনি লীনার সেবা ভোলেননি। ৩ জুন ২০১৯ সালে ৮৪ বছর বয়সে বালিগঞ্জে গুহঠাকুরতা হাউজে প্রয়াত হন রুমা গুহঠাকুরতা।
'যূথীগন্ধ অশান্ত সমীরে
ধায় উতলা উচ্ছ্বাসে,
তেমনি চিত্ত উদাসী রে
নিদারুণ বিচ্ছেদের নিশীথে।
বাজে করুণ সুরে হায় দূরে।'